পিয়ের কোমরে একটা দড়ি জড়িয়েছে, জনৈক ফরাসি সৈন্যের দেওয়া চামড়া থেকে কারাতায়েভ তাকে যে জুতো জোড়া বানিয়ে দিয়েছে সেটাই পরেছে। রুগ্ন লোকটির কাছে গিয়ে পিয়ের তার পাশেই বসে পড়ল।
বলল, জান সকলভ, ওরা সকলে যাচ্ছে না। এখানে ওদের একটা হাসপাতাল আছে। আমাদের চাইতে তুমি হয় তো ভালোই থাকবে।
লোকটি জোরগলায় আর্তনাদ করে উঠল, হে প্রভু! আঃ, এবার আমি মরব! হে প্রভু!
উঠে দরজার দিকে যেতে যেতে পিয়ের বলল, আমি আবার গিয়ে সরাসরি ওদের বলব।
পিয়ের দরজার কাছে পৌঁছতেই আগের দিনের সেই পাইপওয়ালা কর্পোরাল দুজন সৈন্য সঙ্গে নিয়ে এসে হাজির হল। কর্পোরাল ও সৈন্যদের পরিধানে পথযাত্রার পোশাক, ভ্রমণ-গাঠরি ও শাকো, তাতে ধাতুর পাত আঁটা। সেই পোশাকে পরিচিত মুখগুলোই যেন বদলে গেছে। হুকুমমতো কর্পোরাল এসেছে দরজা বন্ধ করতে। বাইরে বের হবার আগে বন্দিদের গুণতি করা হবে। পিয়ের বলল, কর্পোরাল, এই রুগ্ন লোকটিকে নিয়ে কি করা যাবে…
কিন্তু সেইমুহূর্তে কর্পোরালের হাব-ভাব দেখে পিয়েরের মনে সন্দেহ জাগল, এই লোকটি তার পরিচিত সেই কর্পোরাল, না অপরিচিত কেউ। তার উপর, পিয়ের কথা বলতে শুরু করতেই হঠাৎ দুপাশ থেকে দমাদম ঢাক বেজে উঠল। পিয়েরের কথা শুনে কর্পোরাল ভুরু কুঁচকে অর্থহীন কিছু কথা বলে সশন্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল। চালাটা আধা অন্ধকার হয়ে গেল, আর দু-দিকে ঢাকের শব্দের মধ্যে রুগ্ন লোকটির আর্তনাদ ডুবে গেল।
সেই একই জিনিস!…আবারও!… পিয়ের আপন মনেই বলে উঠল, তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শিহরণ নেমে গেল। কর্পোরোলের পরিবর্তিত মুখ, তার কণ্ঠস্বর, ঢাকের কাঠ-ফাটানো আওয়াজ–সবকিছুর ভিতর দিয়ে সেই রহস্যময় নির্বিকার শক্তিকেই যেন সে নতুন করে চিনতে পারল যা মানুষকে বাধ্য করেছে পরস্পরকে হত্যা করতে-যে শক্তির ফলকেই সে দেখেছে নানা প্রাণদণ্ডের মধ্যে। সে শক্তিকে ভয় করা অথবা তার কাছ থেকে পালাবার চেষ্টা করা, সে শক্তির যন্ত্র হিসেবে যা কাজ করে তাদের কাছে কাকুতি-মিনতি জানানো-সব বৃথা। এসবই পিয়ের জানে। শুধু অপেক্ষা করা এবং সহ্য করা ছাড়া অন্য গতি নেই। পিয়ের রুগ্ন লোকটির কাছে আর ফিরে গেল না, তার দিকে ফিরেও তাকাল না, ভুরু কুঁচকে কুটিরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।
দরজা খোলা হল। বন্দিরা ভেড়ার পালের মতো গাদাগাদি করে দরজার কাছে ভিড় করল। পিয়ের তাদের : ঠেলে জোর করে পথ করে নিয়ে সেই ক্যাপ্টেনটির দিকেই এগিয়ে গেল যে কর্পোরাল হিসেবে তাকে কথা দিয়েছিল সে তার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত। ক্যাপ্টেনের পরিধানেও অভিযানের পোশাক, তার নিস্পৃহ মুখে সেই একই জিনিস দেখা গেল যা পিয়ের দেখেছে কর্পোরালের কথায় আর ঢাকের বাজনায়।
ভিড়-করা বন্দিদের দিকে তাকিয়ে কঠোরভাবে ভঙ্গি করে ক্যাপ্টেন বারবার বলতে লাগল, এগিয়ে যাও, এগিয়ে যাও!
সব চেষ্টা বিফল হবে জেনেও পিয়ের তার দিকে এগিয়ে গেল।
যেন পিয়েরকে চিনতেই পারে নি এমনি নির্বিকার দৃষ্টিতে তাকিয় অফিসার শুধাল, কি চাই?
পিয়ের রুগ্ন লোকটির কথা বলল।
যেমন করেই হোক সে হেঁটেই যাবে! শয়তান ভরসা! বলেই ক্যাপ্টেন আর একবার তাড়া লাগাল, এগিয়ে যাও, এগিয়ে যাও!
কিন্তু লোকটি যে মরতে বসেছে, পিয়ের তবু বলল।
সক্রোধে ভুরু কুঁচকে ক্যাপ্টেন চেঁচিয়ে উঠল, তাহলে তো ভালোই হয়…
দ্রাম–দাদা-দাম, দাম-দাম… ঢাক বেজে উঠল। পিয়ের বুঝল, সেই রহস্যময় শক্তি লোকগুলিকে পুরোপুরি কজা করে ফেলেছে, এখন এদের কোনো কথা বলা,বৃথা।
অফিসার-বন্দিদের সৈনিক-বন্দিদের থেকে আলাদা করে তাদের সামনে যেতে বলা হল। পিয়েরকে নিয়ে অফিসারের সংখ্যা ত্রিশ, আর সৈনিক শো তিনেক।
অন্য চালা থেকে আগত অফিসাররা সকলেই পিয়েরের অপরিচিত, তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ ও তার চাইতে ভালো। তারা পিয়েরের দিকে, তার জুতোর দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল, যেন সে একজন বিদেশী। তার অনতিদূরেই একজন মোটাসোটা মেজর হেঁটে চলেছে, তার ফ্যাকাসে মুখটা ফোলা ফোলা, রাগী-রাগী দেখতে, পরনের কাজান ড্রেসিং-গাউনটাকে একটা তোয়ালে দিয়ে বেঁধেছে, স্পষ্টতই অন্য বন্দিরা তাকে বেশ সমীহ করে চলছে। তার এক হাতে তামাকের থলে, সে হাতটা সে ঢুকিয়ে রেখেছে ড্রেসিং গাউনের ভিতরে, অন্য হাতে ধরে আছে পাইপের গোড়াটা। হাঁফাতে হাঁফাতে আর জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে সে সকলের সঙ্গেই ঝগড়া করছে, তার ধারণা সকলেই তাকে ধাক্কা মারছে, অথচ ধাক্কাধাক্তি করে এগোবার কোনো কারণই তো নেই। অপর একজন ছোটখাট অফিসার সকলের সঙ্গেই কথা বলছে, তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সারাদিনে কতটা পথ পাওয়া যাবে-এই নিয়ে আলোচনা করছে, ফেল্ট বুট ও কমিসারিয়েট ইউনিফর্ম পরা আর একজন অফিসার এদিক-ওদিক ছুটে যাচ্ছে, মস্কোর ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকাচ্ছে, আর যা দেখছে তার বিবরণ শোনাচ্ছে উচ্চকণ্ঠে। একজন তৃতীয় অফিসার কমিসারিয়েট অফিসারের কথার প্রতিবাদ করল। কথা শুনলেই বোঝা যায় লোকটি পোল। সে বারবার বলতে লাগল যে কমিসারিয়েট-অফিসার স্থানগুলির ভুল বিবরণ শোনাচ্ছে।
মেজর রেগে বলল, আপনার আপত্তিটা কোথায়? এটা সেন্ট নিকলাস না সেন্ট ব্লসিয়াস তাতে কি যায় আসে? দেখছেন তো সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, বাস। খতম…আহা, তোমরা ঠেলছ কেন? রাস্তাটা কি যথেষ্ট চাওড়া নয়? বলেই সে পিছনের লোকটির দিকে তাকাল। সে কিন্তু মোটেই ঠেলছিল না।
