.
অধ্যায়-১২
পিয়েরকে বন্দি করার পরে চার সপ্তাহ কেটে গেছে, ফরাসিরা তাকে সাধারণ কয়েদিদের কাছ থেকে সরিয়ে অফিসারদের চালায় নিয়ে যেতে চেয়েছে, কিন্তু যে চালায় তাকে প্রথম রাখা হয়েছিল পিয়ের সেখানেই রয়ে গেছে।
একটি মানুষের পক্ষে যত রকম দুঃখকষ্ট সহ্য করা সম্ভব, দগ্ধ ও বিধ্বস্ত মস্কোতে তারই অভিজ্ঞতা পিয়েরের হয়েছে, কিন্তু তার শরীরিক শক্তি ও স্বাস্থ্যকে ধন্যবাদ, বিশেষ করে ধন্যবাদ এই সত্যকে যে এত সব দুঃখকষ্ট এমন ধীরে ধীরে এসেছে যে কবে তার শুরু হয়েছে তাই সে বলতে পারে না, এই পরিস্থিতিকে সে যে শুধু হেলায় সহ্য করেছে তাই নয়, সহ্য করেছে আনন্দের সঙ্গে। আর ঠিক এই সময়েই মনের সেই শান্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য সে পেয়েছে যার জন্য এতদিন সে বৃথাই চেষ্টা করে এসেছে। এতকাল নানাভাবে মনের এই শান্তির সন্ধানে সে ফিরেছে। শান্তি খুঁজেছে বিশ্ব-মানব-প্রীতির মধ্যে, ভ্রাতৃসংঘের কর্মধারার মধ্যে, শহর-জীবনের ভোগ সুখের মধ্যে, মদ্যপানে, আত্মত্যাগের বীরত্বপূর্ণ কাজকর্মের মধ্যে এবং নাতাশার প্রতি রোম্যান্টিক ভালোবাসার মধ্যে। কিন্তু হায়, সেসব সন্ধান ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু আজ কোনোরকম চিন্তা-ভাবনা না করেই সেই শান্তি ও অন্তরের মিল সে খুঁজে পেয়েছে মৃত্যুর ভয়াবহতা, দুঃখকষ্ট ও কারায়েভের অন্তর-সম্পদের মধ্যে।
রাশিয়া, যুদ্ধ, রাজনীতি, বা নেপোলিয়নের চিন্তা এখন আর তার মনে আসে না। সে এখন পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে, এগুলো তার কাজ নয়, এসব ব্যাপারে তার মতামত কেউ চায় না, আর তাই তার দিক থেকে মতামত দেবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। রাশিয়া আর গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া একসূত্রে গাঁথা নয়, কারায়েভের এই কথাগুলি সে মনে মনে আওড়াল। কথাগুলি তাকে আশ্চর্য রকমের সান্ত্বনা এনে দেয়। নেপোলিয়নকে হত্যা করার বাসনা এখন তার কাছে অর্থহীন, এমন কি হাস্যকর মনে হয়। স্ত্রীর প্রতি ক্রোধ এবং তার সঙ্গে জড়িত হয়ে নিজের নামকে কলংকিত করার দুশ্চিন্তা এখন তার কাছে শুধু তুচ্ছ নয়, একটা মজার ব্যাপার বলে মনে হয়। সেই নারী কোথায় কি রকম জীবন যাপন করছে, তাতে তার কি যায় আসে? তাদের বন্দির নাম যে কাউন্ট বেজুখভ এ-কথা তারা জানুক বা না জানুক তাতে কার কি, আর তার নিজেরই বা কি?
এখন পিয়েরের দিনমানের একমাত্র স্বপ্ন, কবে সে মুক্তি পাবে। অথচ পরবর্তীকালে সারা জীবন ভর মহা উৎসাহের সঙ্গে সে চিন্তা করেছে ও কথা বলেছে এই একটি মাসের বন্দি-জীবনের কথা, সেই আনন্দঘন অনুভূতির কথা এবং মনের সেই পরিপূর্ণ শান্তি ও অন্তর-মুক্তির কথা যার অভিজ্ঞতা সে পেয়েছিল শুধু সেই কয়টি সপ্তাহে।
প্রথম দিনটিতেই খুব ভোরে উঠে চালাঘর থেকে বেরিয়ে সে যখন প্রথম দেখেছিল আধো অন্ধকারে ঢাকা কুমারী মাতার নব কনভেন্টের গম্বুজ ও ক্রুশ, ধুলিমলিন ঘাসের উপর সাদা শিশিরকণাগুলি, চাতক পাহাড়, বহুদূরে বিলীয়মান আঁকাবাঁকা নদীটির তরুছায়া-ঢাকা তীর, প্রথম যখন শ্বাস নিয়েছিল তাজা বাতাসে আর মস্কো থেকে উড়ে আসা কাকদের ডাক শুনেছিল মাঠের উপরে, একটু পরে যখন পূর্বদিকটা আলোয় ভরে গেল, মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল সূর্যের রশ্মি, আর সঙ্গে সঙ্গে গম্বুজ ও ক্রুশ, সাদা শিশিরকণা, দূরবর্তী নদী, সবকিছু সেই আলোয় ঝলমল করে উঠল–তখন এক অজ্ঞাতপূর্ব নতুন আনন্দ ও জীবনীশক্তির স্বাদ পেয়েছিল পিয়ের। সেই আনন্দ ও শক্তি গোটা বন্দিজীবনে তাকে ঘিরে রইল, শুধু তাই নয়, জীবনের দুঃখকষ্ট যত বাড়তে লাগল সেই আনন্দ ও শক্তিও তত বেড়ে চলল।
তাছাড়া, এই চালাঘরে আসার পর থেকে সহ-বন্দিরা তার সম্পর্কে যে উচ্চ ধারণা পোষণ করছে তাতেও তার এই অনুভূতি আরো তীব্র হয়েছে। তার বহু ভাষার জ্ঞান, তার প্রতি ফরাসিদের শ্রদ্ধা, তার সরলতা, তার দানশীলতা, তার শক্তিমত্তা, সঙ্গীদের প্রতি সদয় ব্যবহার, কোনো কিছু না করে চুপচাপ বসে থাকা ও চিন্তা করার ক্ষমতা (অন্য সকলের কাছে ব্যাপারটা দুর্বোধ্য)-সবকিছু মিলিয়ে সকলের চোখে সে হয়ে উঠেছে একটি রহস্যময় উচ্চ কোটির মানুষ। শক্তিমত্তা, জীবন-সম্ভোগের প্রতি বিতৃষ্ণা, অন্যমনস্কতা ও সরলতা–এই যেসব গুণ এতকাল তার নিজস্ব জগতে চলার পথে ছিল প্রতিবন্ধকস্বরূপ, সেইসব গুণই এই মানুষদের চোখে তাকে এনে দিয়েছে নায়কের মর্যাদা। পিয়ের বোঝে, তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গিই তার উপর চাপিয়েছে নতুন দায়িত্বভার।
.
অধ্যায়-১৩
৬ই ও ৭ই অক্টোবর রাত থেকেই ফরাসিদের ফিরতি যাত্রা শুরু হল, রান্নাঘর ও চালাগুলো ভেঙে দেয়া হল, গাড়ি বোঝাই হল, সৈন্যদল ও মালগাড়ি যাত্রা শুরু করল।
সকাল সাতটায় অভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়ে একটি ফরাসি রক্ষীদল চালাগুলির সামনে এসে দাঁড়াল। পরনে শাকো, হাতে বন্দুক, পিঠে ভ্রমণ-গাঠরি ও বড় বড় বস্তা। সকলের মুখে ফরাসি ভাষায় উত্তেজিত আলোচনা ও খিস্তি-খেউড়ের খই ফুটতে লাগল।
চালার মধ্যে সকলেই পোশাক পরে, কোমরবন্ধ এঁটে তৈরি, শুধু আদেশের অপেক্ষা। কেবল রুগ্ন সৈনিক সকল খালি পায়ে আসনে বসে আছে, পোশাক পরেনি, তার বিবর্ণ মুখে চোখের চারদিকে কালি পড়েছে। মুখটা শুকিয়ে যাওয়ার ফলে চোখ দুটো আরো বড় দেখাচ্ছে, সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে সে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কেউ তার দিকে নজর দিচ্ছে না দেখে সে নিজের মনেই গোঙাচ্ছে।
