আরো কিছুক্ষণ কথা বলে কর্পোরাল চলে গেল। (যে ঘটনার কথা সে উল্লেখ করল সেটা কয়েকদিন আগে ঘটেছে-বন্দি ও ফরাসি সৈন্যদের মধ্যে একটা লড়াই বেধে গেলে পিয়ের তার বন্ধুদের শান্ত করেছিল।) পিয়রকে কর্পোরালের সঙ্গে কথা বলতে শুনে কয়েকজন বন্দি ব্যাপারটা জানতে চাইল। পিয়ের যখন ফরাসি সৈন্যদের মস্কো ছেড়ে চলে যাবার কথা বলছিল, তখন ছিন্নবস্ত্র পরিহিত একটি ফরাসি সৈন্য বিবর্ণ মুখে চালাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। অভিবাদনের ভঙ্গিতে তাড়াতাড়ি কপালে আঙুল ঠেকিয়ে সে পিয়েরকে জিজ্ঞাসা করল, প্রাতোচ নামক যে সৈন্যটিকে সে একটি শার্ট দিয়ে গেছে সেলাই করতে সে চালাঘরে আছে কি না।
এক সপ্তাহ আগে ফরাসি সৈন্যদের জুতোর চামড়া ও কাপড় দেয়া হয়েছে, তারা আবার সেগুলো বন্দিদের দিয়েছে বুট ও শার্ট তৈরি করে দেয়ার জন্য।
পরিষ্কার ভাঁজ-করা একটি শার্ট নিয়ে এসে কারাতায়েভ বলল, তৈরি, একেবারে তৈরি ভাই!
গরম আবহাওয়ায় কাজের সুবিধার জন্য কারাতায়েভ পরেছে শুধু ট্রাউজার আর ঝুল-কালির মতো কালো একটা ঘেঁড়া শার্ট। লেবুগাছের বাকল দিয়ে তৈরি একটা টুকরো দিয়ে চুলটাকে গোল করে বেঁধেছে, ফলে তার গোল মুখটাকে আরো গোল এবং আরো সুন্দর দেখাচ্ছে।
নিজের হাতে সেলাই করা শার্টটাকে মেলে ধরে প্লান হেসে বলল, কথা যখন দিয়েছি তখন কাজ হাসিল হবেই। বলেছিলাম শুক্রবার, এই নাও শার্ট তৈরি।
ফরাসি সৈনিকটি অস্বস্তির সঙ্গে চারদিকে তাকাল, তারপর ইতস্তত ভাবটা কাটিয়ে তাড়াতাড়ি ইউনিফর্মটা খুলে ফেলে শার্টটা পরে ফেলল। তার শুকনো, বিবর্ণ শরীরে শুধু একটা তেল-চিটচিটে লম্বা সিল্কের ওয়েস্টকোট পরা ছিল, শার্ট ছিল না। নিশ্চয়ই তার মনে ভয় ছিল যে বন্দিরা তাকে দেখে হাসবে, তাই সে খুব তাড়াতাড়ি শার্টের মধ্যে মাথাটা গলিয়ে দিল। কিন্তু বন্দিরা একটা কথাও বলল না।
শার্টটাকে টেনে দিয়ে প্লাতন বারবার বলতে লাগল, দেখ, কী সুন্দর মাপমতো হয়েছে।
চোখ না তুলেই মাথা ও হাত শার্টের মধ্যে গলিয়ে দিয়ে ফরাসিটি শার্টের সেলাইটার পরীক্ষা করতে লাগল।
নিজের কাজে নিজেই খুশি হয়ে একগাল হেসে প্লাতন বলল, কথা যখন দিয়েছি তখন কাজ হাসিল হবেই। বলেছিলাম শুক্রবার, এই নাও শার্ট তৈরি।
ফরাসি সৈনিকটি অস্বস্তির সঙ্গে চারদিকে তাকাল, তারপর ইতস্তত ভাবটা কাটিয়ে তাড়াতাড়ি ইউনিফর্মটা খুলে ফেলে শার্টটা পরে ফেলল। তার শুকনো বিবর্ণ শরীরে শুধু একটা তেল-চিটচিটে লম্বা সিল্কের ওয়েস্টকোট পরা ছিল, শার্ট ছিল না। নিশ্চয়ই তার মনে ভয় ছিল যে বন্দিরা তাকে দেখে হাসবে, তাই সে খুব তাড়াতাড়ি শার্টের মধ্যে মাথাটা গলিয়ে দিল। কিন্তু বন্দিরা একটা কথাও বলল না।
শার্টটাকে টেনে দিয়ে প্লাতন বারবার বলতে লাগল, দেখ, কী সুন্দর মাপমতো হয়েছে।
চোখ না তুলেই মাথা ও হাত শার্টের মধ্যে গলিয়ে দিয়ে ফরাসিটি শার্টের সেলাইটাই পরীক্ষা করতে লাগল।
নিজের কাজে নিজেই খুশি হয়ে একগাল হেসে প্লাতন বলল, দেখ ভাই, এটা তো সেলাইয়ের দোকান নয়, আর ঠিকমতো যন্ত্রপাতিও আমার কাছে নেই, কথায় বলে, একটা উকুন মারতেও যন্ত্র থাকা চাই।
সৈনিকটি ফরাসিতে বলল, ভালো হয়েছে, খুব ভালো হয়েছে, তোমাকে ধন্যবাদ। কিন্তু কিছুটা কাপড় তো বাড়তি হবার কথা।
কারাতায়েভ তবু নিজের কাজের প্রশংসা করেই বলতে লাগল, শরীরের সঙ্গে বসে গেলে মাপে আরো ঠিক হবে। পরতে খুব ভালো লাগবে, আরাম পাবে…
ফরাসিটি পুনরায় হেসে বলল, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ বুড়ো।…কিন্তু বাড়তি কাপড়টা? এক রুবলের নোটটা বের করে কারাতায়েভকে দিল। কিন্তু বাড়তি কাপড়টা আমাকে দিয়ে দাও।
পিয়ের বুঝল, প্লন ফরাসিটির কথাগুলো বুঝতে পারছে না, কিন্তু কিছু বলল না। টাকাটা পেয়ে কারাতায়েভ ফরাসি সৈনিকটিকে ধন্যবাদ দিয়ে আবার নিজের কাজের প্রশংসায় মেতে উঠল। কিন্তু ফরাসিটির বাড়তি কাপড়টুকু চাই-ই, তাই সে পিয়েরকে বলল তার কথাগুলি ভাষান্তরিত করে দিতে।
কারাতায়েভ তখন বলল, ওটুকু কাপড় কিসের জন্য চাইছ? ও দিয়ে আমাদের জন্য পায়ের পট্টি হত। ঠিক আছে, কিছু মনে করো না। হঠাৎ কারায়েভের মুখের ভাবটা বদলে গেল, বিষণ্ণ মুখে নিজের শার্টের ভিতর দিয়ে এক বান্ডিল কাটা কাপড় বের করে ফরাসিটিকে দিল। ভাইরে! বলেই কারাতায়েভ তার দিকে না তাকিয়েই চলে গেল। ফরাসিটি কাপড়ের দিকে তাকাল, একমুহূর্ত কি যেন ভাবল, জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে পিয়েরের দিকে তাকাল, আর তারপরেই যেন পিয়েরের চাউনিই তাকে কিছু বলে দিয়েছে এমনিভাবে হঠাৎ সে মুখটা লাল করে ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে বলল, পাতোচ! হেই প্লাতোচ! এগুলো তুমিই রেখে দাও! টুকরো কাপড়গুলো ফিরিয়ে দিয়েই মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল।
মাথাটা নেড়ে নেড়ে কারাতায়েভ বলল, এই তো, চেয়ে দেখ। সকলে বলে, ওরা খৃস্টান নয়, ওদেরও মন আছে। তাই তো বুড়োরা বলে : যে হাত ঘামে সেই হাতই খোলা, আর শুকনো হাতই মুঠো করা। লোকটির পোশাক নেই, তবু সে এগুলো ফিরিয়ে দিয়ে গেল।
কারাতায়েভ চিন্তিতভাবে হেসে কাপড়ের টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু এ দিয়ে চমৎকার পায়ের পট্টি তৈরি হবে, এই কথা বলে সে চালাঘরে ঢুকে গেল।
