.
অধ্যায়–১১
৬ই অক্টোবর খুব সকালে পিয়ের চালাঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, ফিরে এসে দরজার পাশে থেমে বাঁকা-পা, নীল-ধূসর ছোট কুকুরটার সঙ্গে খেলা করতে শুরু করল। কুকুরটা তার চারপাশে লাফাতে লাফাতে লাগল। ছোট কুকুরটা তাদের চালাতেই থাকে, রাত্তিরে কারায়েভের পাশে ঘুমোয়, মাঝে মাঝে শহরে চলে যায়, কিন্তু ঠিক ফিরে আসে। হয় তো কোনোদিনই কুকুরটার কোনো মালিক ছিল না, এখনো নেই, তাই ওর কোনো নামও নেই। ফরাসিরা ওকে ডাকত আজোর বলে, গল্প-বলিয়ে সৈনিকটি ওকে ডাকে ফেমগালকা, কারাতায়েভ ও অন্যরা ডাকে গ্রে, কখনো বা ফ্ল্যাবি। কোনো মনিব নেই, নাম নেই, জাতি-বর্ণ নেই, কিন্তু তাতে নীল-ধূসর কুকুরটার কোনো সুখ-দুঃখ নেই। লোমশ লেজটাকে পালকের মতো উচ্চে তুলে নাচায়, প্রায়ই পিছনের একটা পা তুলে তিন পায়ে এমন সুন্দর দৌড়ায় যেন চারটে পা ব্যবহার করাটাই অতি বাজে কাজ। সবকিছুতেই ও খুশি। কখনো গড়াগড়ি দিতে দিতে আনন্দে ঘেউ-ঘেউ করে, কখনো গম্ভীর মুখে রোদ পোয়ায়, আবার কখনো একটুকরো কাঠ বা খড় নিয়েই মনের সুখে খেলা করে।
এতদিনে পিয়েরের পোশাক বলতে দাঁড়িয়েছে একটা ময়লা ছেঁড়া শার্ট, একজোড়া সৈনিকদের ট্রাউজার-কারায়েভের পরামর্শে শরীরটা গরম রাখবার জন্যে সেটাকে সে গোড়ালির কাছে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়েছে–আর চাষীদের কোট ও টুপি। এই সময়ের মধ্যে তার শরীরের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। এখন আর তাকে শক্ত-সমর্থ বলা যায় না, তবে তাকে দেখলে তার বংশানুক্রমিক শক্তি-সামর্থ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। গোঁফ-দাড়িতে মুখের নিচটা ঢেকে গেছে, উকুন-ভরা জট-পাকানো চুল মাথাটাকে ঢেকে রেখেছে টুপির মতো। চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে একটা দৃঢ়, শান্ত ও সোসাহ সতর্কতার ভাব। তার চোখে আগে যে অলস গতি দেখা যেত তার জায়গায় এখন দেখা দিয়েছে একটা সোৎসাহ বিরোধিতা ও কাজের মনোভাব।
পিয়ের প্রথমে মাঠের উপর দিয়ে তাকিয়ে গাড়ি-ঘোড়া ও অশ্বারোহীদের দেখল, তারপর দৃষ্টি ফেরাল নদীর ওপারে, তারপর কুকুরটার দিকে, এবং শেষে নিজের পায়ের নোংরা, মোটা, বড় বড় আঙুলগুলোকে নানা ভঙ্গিতে নেড়েচেড়ে সেইদিকেই তাকাল। যতবার খোলা পা দুটোর দিকে তাকাচ্ছে ততবারই আত্মতুষ্টিভরা হাসিতে মুখটা ভরে উঠছে। পা দুটোর দিকে তাকালেই তার মনে পড়ে যায় এই কয়েক সপ্তাহের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার কথা, আর সে স্মৃতি তার কাছে মধুর।
কয়েকদিন ধরেই আবহাওয়া বেশ শান্ত ও পরিষ্কার, সকালবেলা কিছুটা নীহার পড়ে–একেই বলে বুড়িবৌদের গ্রীষ্মকাল।
বাতাস রৌদ্রতপ্ত, সকালবেলাকার নীহারের সতেজ স্পর্শে সেই আতপ্ত বাতাস আরো মনোরম লাগছে।
দূরে ও নিকটে সবকিছুর উপরেই লেগেছে সেই হঠাৎ আলোর ঝলকানি যা শুধু হেমন্তের এই সময়টাতেই দেখা যায়। দূরে দেখা যাচ্ছে চাতক পাহাড়, তার গ্রাম, গির্জা ও সাদা বড় বাড়িটা সমেত। পাতা-জরা গাছগুলি, বালি, ইট ও বাড়িগুলির ছাদ, গির্জার সবুজ চূড়া, আর দূরের সাদা বাড়ির কোণগুলি-স্বচ্ছ বাতাসে সবকিছুই ফুটে উঠেছে সূক্ষ্ম রেখায় ও অস্বাভাবিক স্পষ্টতায়। কাছেই দেখা যাচ্ছে ফরাসিদের দ্বারা দখল-করা অর্ধদগ্ধ প্রাসাদটার ধ্বংসাবশেষ, বেড়ার ধারে গাঢ় সবুজ রঙের লিলাক ফুলের ঝোঁপগুলোও চোখে পড়ছে। যে ধসে-পড়া বাড়িটাকে খারাপ আবহাওয়ায় অত্যন্ত কুৎসিত দেখায়, এখনকার নিশ্চল পরিষ্কার উজ্জ্বলতায় তাকেও কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে।
জনৈক ফরাসি কর্পোরাল ঘরোয়াভাবে কোটের বোম খুলে মাথায় একটা খুলি-টুপি পরে এবং মুখে একটা ছোট পাইপ গুঁজে চালার কোণ থেকে বেরিয়ে এসে বন্ধুর মতো চোখ টিপে পিয়েরের দিকে এগিয়ে গেল।
কী একখানা রোদ মঁসিয় কিরিল! (পিয়েরকে তারা ওই নামেই ডাকে।) কি বলেন? ঠিক যেন বসন্তকাল।
দরজায় হেলান দিয়ে কর্পোরাল পাইপটা পিয়েরের দিকে এগিয়ে দিল, যদিও সে যতবার পাইপটা এগিয়ে দিয়েছে ততবারই পিয়ের সেটা ফিরিয়ে দিয়েছে।
এই আবহাওয়ায় পথে বের হওয়া… লোকটি বলতে শুরু করল। পথে বের হবার কথায় পিয়ের ব্যাপারটা জানতে চাইলে কর্পোরাল বলল যে প্রায় সব সৈন্যই তো চলে যাচ্ছে, আর ওইদিনই বন্দিদের সম্পর্কে একটা আদেশ প্রচার করা হবে। সকলভ নামক এই চালারই পিয়েরের একজন সঙ্গীর মুমূর্ষ অবস্থা, পিয়ের কর্পোরালকে জানাল যে তার সম্পর্কে একটা কিছু করা দরকার। জবাবে কর্পোরাল পিয়েরকে বলল, পিয়েরের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই, তাদের একটা অ্যাম্বুলেন্স ও একটা স্থায়ী হাসপাতাল আছে, রোগীদের যথাযথ ব্যবস্থা অবশ্যই করা হবে, আর কর্তৃপক্ষ সম্ভাবিত সব ঘটনার কথা আগে থেকেই জানেন।
তাছাড়া, আপনি তো জানেন মঁসিয় কিরিল, আপনি শুধু ক্যাপ্টেনকে মুখের কথাটি বললেই সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তিনি কখনই কোনো কিছু ভুলে যান না। তিনি রোদে বের হলে তাঁর সঙ্গে কথা বলুন, আপনার জন্য তিনি সবকিছু করবেন।
(কর্পোরাল যে ক্যাপ্টেনটির কথা বলল তার সঙ্গে পিয়েরের প্রায়ই দীর্ঘ গাল-গল্প হয়, সে লোকটি তাকে অনেক সুযোগ-সুবিধা করে দিয়েছে।)
এই তো সেদিন তিনি আমাকে বললেন, কি জান সেন্ট মাস, সিয় কিরিল একজন লেখাপড়া-জানা লোক, ফরাসি বলতে পারেন। তিনি একজন দুর্দশাগ্রস্ত সিনর, কিন্তু একজন মানুষের মতো মানুষ। তিনি সব জানেন, বোঝেন…তিনি যদি আমার কাছে কিছু চান, আমি তাকে ফিরিয়ে দেব না। কি জান, লেখাপড়া শিখলেই মানুষ শিক্ষার কদর ও ভদ্রলোকের দাম বোঝে। আপনার সুবিধার জন্যই কথাটা বললাম মঁসিয় কিরিল। সেদিন যদি আপনি না থাকতেন তাহলে তো অবস্থা বেশ খারাপই হত।
