জনসাধারণ ও সৈন্যদের মনোরঞ্জনের জন্য যেসব থিয়েটারের ব্যবস্থা করা হল তাতেও কোনো সুফল পাওয়া গেল না। খাঁটি এবং মেজি কাগজের টাকায় তখন মস্কো ছেয়ে গেছে, তার দামও পড়ে গেছে। লুণ্ঠনকারী ফরাসিদের একমাত্র লক্ষ্য সোনার দিকে। শুধু যে নেপোলিয়নের দেয়া কাগজের টাকাই মূল্যহীন হয়ে পড়ল তাই নয়, সোনার তুলনায় রুপোর দামও পড়ে গেল।
কিন্তু সেসময়ে কর্তৃপক্ষ যেসব হুকুম জারি করেছিল তার মধ্যে বিফলতার সবচাইতে বিস্ময়কর উদাহরণ হল লুটতরাজ বন্ধ করতেও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নেপোলিয়নের প্রচেষ্টা।
সামরিক কর্তৃপক্ষকের কাছ থেকে এই সব প্রতিবেদনই পাওয়া গেল : নির্দেশনামা সত্ত্বেও শহরে লুটতরাজ অবাধে চলেছে। এখনো শৃঙ্খলা ফিরে আসে নি এবং একটি ব্যবসায়ীও বিধিসম্মতভাবে ব্যবসাপত্র চালাচ্ছে না। সেনাদলের সঙ্গের ব্যবসায়ীরাই শুধু ব্যবসাপত্র চালাতে সাহস করছে, আর তারা তো বেচছে শুধু চোরাই মাল।
আমার ওয়ার্ডের আশেপাশে তৃতীয় কোরের সেনাদল লুটতরাজ চালাচ্ছে, যেসব হতভাগ্য অধিবাসী যৎসামান্য যা কিছু এখনো হাতে আছে তাই নিয়ে মাটির নিচে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিয়েও সন্তুষ্ট না হয়ে সৈনিকরা নিষ্ঠুরভাবে তাদের তরবারি দিয়ে আঘাত করছে, এরকম ঘটনা বারবার আমার চোখে পড়েছে।
সৈন্যরা ডাকাতি করছে, লুট করছে, এছাড়া নতুন কিছু নেই–৯ই অক্টোবর।
ডাকাতি ও লুট সমানে চলেছে। আমাদের অঞ্চলে একটা চোরের দল গড়ে উঠেছে, শক্তিশালী সেনাদল পাঠিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা উচিত-১১ই অক্টোবর।
সম্রাট অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়েছেন এই কারণে যে লুটতরাজ বন্ধ করার কড়া নির্দেশ সত্ত্বেও লুটেরা রক্ষীবাহিনীদের দলে দলে ক্রেমলিনে ফিরতে দেখা যাচ্ছে। পুরনো রক্ষীদলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও লুটতরাজ তীব্র আকারে নতুন করে দেখা দিয়েছে গতকাল সন্ধ্যায়, রাতে ও আজ। সম্রাট অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন, তার দেহরক্ষী হিসেবে নিযুক্ত যেসব বাছাই সৈনিকদের উচিত শৃঙ্খলার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা তারাই এতদূর অবাধ্য হয়ে উঠেছে যে সামরিক রসদের ঘাঁটি ও গুদামে পর্যন্ত তারা হানা দিয়েছে। অন্যরা আবার শান্ত্রী ও অফিসারদের অমান্য করে, এমন কি তাদের গালাগালি ও মারধোর করে নিজেদেরই অসম্মান ডেকে এনেছে।
শাসনকর্তা লিখেছে, রাজপ্রাসাদের গ্র্যান্ড মার্শাল তিক্ত ভাষায় অভিযোগ করেছে, বারবার হুকুম দেওয়া সত্ত্বেও সৈন্যরা সারা উঠানে, এমন কি সম্রাটের জানালার নিচেও মলমূত্র ত্যাগ করছে।
লাগামছাড়া গরু-ঘোড়ার মতো বেপরোয়াভাবে ইতস্তত ছুটাছুটি করে যে ফসল তাদের অনাহারে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারত তাকেই পায়ের নিচে মাড়িয়ে সৈন্যরা মস্কোতে থেকে দিনের পর দিন মরতে লাগল। কিন্তু তবু তারা মস্কো ছেড়ে গেল না।
তবু সেইদিন থেকে তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পালাতে শুরু করল যেদিন স্মোলেনস্ক রোডে মালবাহী ট্রেনটা আটক করা হল এবং তারুতিনোতে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। একটা সেনাদল পরিদর্শনের সময় অপ্রত্যাশিতভাবে তারুতিনো যুদ্ধের সংবাদ পেয়েই রুশদের শাস্তি দেবার ইচ্ছা জাগল নেপোলিয়নের মনে (থিয়ের্স তাই লিখছে), আর সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর দাবি মেনে নিয়ে তাদের প্রত্যাবর্তনের আদেশ দিল।
মস্কো থেকে পালাবার সময় সৈন্যরা যে যা চুরি করেছিল সব সঙ্গে নিয়ে চলল। নেপোলিয়নও তার ব্যক্তিগত সব সম্পত্তি সঙ্গে নিয়েই চলল, কিন্তু একটা মাল-ট্রেন সেনাবাহিনীর গতিরোধ করায় খুব আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ল (থিয়ের্সের কথা)! তবু যুদ্ধের অভিজ্ঞতার দরুন বাড়তি যানবাহনগুলো পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দিল না। সৈন্যরা যেসব কালিচে-গাড়ি ও অন্য বড় বড় গাড়িতে করে যাচ্ছিল সেদিকে তাকিয়ে থেকে নেপোলিয়ন বলল, এ তো ভালোই হয়েছে, রসদ এবং রুগ্ন ও আহতদের বয়ে নেবার জন্য এই গাড়িগুলি ব্যবহার করা যাবে।
গোটা সেনাবাহিনীর অবস্থা দাঁড়াল সেই আহত জন্তুটির মতো যে বুঝতে পারছে যে একটু একটু করে সে মরতে চলেছে অথচ কি করছে তা নিজেই জানে না। মস্কোতে প্রবেশের মুহূর্ত থেকে তার ধ্বংস পর্যন্ত নেপোলিয়ন ও তার সেনাবাহিনীর সমর-কৌশল ও লক্ষ্যকে পর্যালোচনা করা আর একটি মারাত্মকভাবে আহত জন্তুর মৃত্যুকালীন লাফঝাঁপ ও থরো থরো কাঁপন লক্ষ্য করা একই কথা। প্রায়ই দেখা যায় আহত জন্তুটি খসখস শব্দ শুনলেই সোজা শিকারির বন্দুকের দিকে ছুটে যায়, একবার এগিয়ে যায় আবার পিছিয়ে আসে এবং নিজের মৃত্যুকেই ত্বরান্বিত করে। তারুতিনো যুদ্ধের খসখসানি জন্তুটিকে ভয় পাইয়ে দিল, সে ধেয়ে গেল শিকারির বন্দুকের দিকে, তার কাছে পৌঁছে গেল, ফিরে এল এবং শেষপর্যন্ত-যে-কোনো বন্য পশুর মতোই–সেই একান্ত অসুবিধাজনক ও বিপজ্জনক পথ ধরেই পিছন দিকে ছুটতে লাগল যেখানকার গন্ধ তার পরিচিত।
একটি অসভ্য মানুষ যেমন ভাবে যে, জাহাজের সম্মুখস্থ প্রতিমূর্তিটাই বুঝি জাহাজটাকে চালায়, তেমনই আমরাও মনে করি যে নেপোলিয়নই এত সব গতিবিধির নেতা, কিন্তু এই সময়টাতে নেপোলিয়ন যেন সেই ছোট ছেলেটির মতোই আচরণ করতে লাগল যে গাড়ির ভিতরে বসে একজোড়া দড়ি হাতে নিয়ে ভাবে যে গাড়িটাকে সেই চালাচ্ছে।
