*
অধ্যায়-২৫
প্রিন্স নিকলাস আন্দ্রিভিচ বলকনস্কির জমিদারী বন্ড হিলসে তরুণ প্রিন্স আন্দ্রু ও স্ত্রীর আগমন প্রতিদিনই আশা করা হচ্ছিল, কিন্তু সেই আশার ফলে বৃদ্ধ প্রিন্সের গৃহস্থালির নিয়মিত কাৰ্যসূচীর কোনোরকম পরিবর্তন ঘটে নি। সম্রাট পল যেদিন তাকে তার গ্রামের জমিদারীতে নির্বাসিত করেছিল সেদিন থেকেই প্রধান সেনাপতি প্রিন্স নিকলাস আন্দ্রিভিচ (সমাজে তার ডাক নাম প্রাশিয়ার রাজা) মেয়ে প্রিন্সেস মারি ও তার সখী মাদময়জেল বুরিয়েকে নিয়ে সেখানেই একটানা বাস করে চলেছে। যদিও নতুন শাসন-ব্যবস্থায় সে ইচ্ছা করলেই রাজধানীতে ফিরে যেতে পারে, তবু সে এখনো গ্রামেই বাস করছে। তার বক্তব্য : কেউ যদি তার সঙ্গে দেখা করতে চায় তা হলে সে তো একশ মাইল পেরিয়ে মস্কো থেকে বন্ড হিলস-এই আসতে পারে; তার নিজের কাউকেই দরকার নেই, কোনো জিনিসেরও দরকার নেই। সে বলে, মানুষের পাপের উৎস দুটি–আলস্য আর কুসংস্কার, আবার সৎগুণও দুটি-কর্ম ও বুদ্ধি। মেয়ের শিক্ষার ভার সে নিজেই নিয়েছে; তার অন্তরে এই দুটি প্রধান গুণকে গড়ে তোলার জন্য তার বিশ বছর বয়স পর্যন্ত প্রিন্স তাকে বীজগণিত ও জ্যামিতি শিক্ষা দিয়েছে এবং এমনভাবে মেয়ের জীবনকে গড়ে তুলেছে যাতে সে সব সময়ই কর্মব্যস্ত থাকতে পারে। প্রিন্স নিজেও সব সময়ই কর্মব্যস্ত : স্মৃতি-কথা লেখা, উচ্চতর গণিতের সমস্যাসমূহের মীমাংসা, যন্ত্রের সাহায্যে নস্যি-দান প্রস্তুত, বাগানে কাজ, আর জমিদারীতে সর্বদাই যে সব বাড়ি তৈরি করা হয় তার তদারকি। যেহেতু নিয়মানুবর্তিতাই কর্ম-সাধনের প্রধান শর্ত, তাই তার গৃহস্থালিতে নিয়মানুবর্তিতাকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয়ে থাকে। ঠিক একই অবস্থায় সে সব সময় টেবিলে এসে বসে; শুধু একই ঘণ্টায় নয়, একই মিনিট গুণে। মেয়ে থেকে আরম্ভ করে ভূমিদাস পর্যন্ত যারা তাকে ঘিরে থাকে তাদের প্রতি সে বড়ই কঠোর ও অনমনীয়। তাদের প্রতি কঠোর-হৃদয় না হয়েও সে তাদের মনে যুগপৎ ভয় ও শ্রদ্ধা জাগাতে সক্ষম হয়েছে। যদিও এখন সে অবসর জীবন যাপন করছে এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে তার কোনো প্রভাব কর্মচারীই তার সঙ্গে এসে সাক্ষাৎ করাটাকে তাদের কর্তব্য বলে মনে করে, এবং পূর্বনির্ধারিত যথাসময়ে প্রিন্স স্বয়ং উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত স্থপতি, মালী, অথবা প্রিন্সেস মারির মতোই মস্ত বড় দরবার-কক্ষে অপেক্ষা করে থাকে। পড়ার ঘরের অত্যন্ত উঁচু দরজাটা খুলে একটি বৃদ্ধ মানুষের ছোটখাট মূর্তি যখন পাউডার-মাখা পরচুলা, ছোট দুখানি শীর্ণ হাত ও ঘন পাকা ভুরু নিয়ে হাজির হয়, এবং সেই ভুরু দুটি কুঞ্চিত হয়ে তার তীক্ষ্ণ, যুবকোচিত উজ্জ্বল চোখের জলকানিকে কখনো কখনো ঢেকে দেয়, তখন সেই দরবার-কক্ষে সমাসীন প্রতিটি মানুষের মনেই সেই একই শ্রদ্ধা, এমন ভীতির সঞ্চার হয়।
নবদম্পতির যেদিন আসার কথা সেদিন সকালে প্রিন্সেস মারি দুরু দুরু বুকে ক্রুশ-চিহ্ন এঁকে নীরবে প্রার্থনা করতে করতে যথারীতি নির্ধারিত সময়ে প্রাতঃকালীন সাক্ষাৎকারের জন্য দরবার-ঘরে ঢুকল। প্রতিদিন সকালেই সে এইভাবে আসে এবং প্রতিদিন সকালেই প্রার্থনা জানায় যাতে সাক্ষাৎকার-পর্বটি ভালোভাবে সমাধা হয়।
যে বুড়ো চাকরটি সেখানে বসেছিল সে উঠে ফিসফিস করে বলল, দয়া করে ভিতরে আসুন।
একটা লেদ-যন্ত্রের গুনগুন শব্দ দরজা দিয়ে ভেসে আসছে। প্রিন্সেস ভয়ে ভয়ে দরজাটা খুলল। একটু থামল। প্রিন্স লেদে বসে কাজ করছিল; একবার চারদিক দেখে নিয়ে আবার কাজ করতে লাগল।
ঘরটা নানা জিনিসপত্রে ঠাসা। সবগুলিই সব সময় ব্যবহার করা হয়। বড় টেবিলটায় বই ও নক্সা ছড়ানো, চাবিসুদ্ধ কাঁচ-লাগানো উঁচু বুক-কেস, দাঁড়িয়ে লেখার জন্য উঁচু ডেঙ্কটায় একখানা খাতা খোলা পড়ে আছে, যন্ত্রপাতিসহ একটা লেদ-যন্ত্র, দাড়ি কামাবার সরঞ্জাম–সবকিছুতেই নানাবিধ অবিশ্রাম ও সুশৃঙ্খল কাজকর্মের চিহ্ন পরিস্ফুট। রুপোর কাজ-করা তাতার বুট-পরা ছোট পায়ের কর্মচাঞ্চল্য এবং পেশীবহুল সরু হাতের দৃঢ় চাপ দেখলেই বোঝা যায় এই বৃদ্ধ বয়সেও প্রিন্স তার কাজের ধৈর্য ও উৎসাহ অক্ষুণ্ণ রেখেছে। লেদটাকে আরো কয়েক পাক ঘুরিয়ে সে লেদের পা-দান থেকে পাটা তুলে নিল, বাটালিটাকে মুছে চামড়ার থলেটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিল, তারপর টেবিলের দিকে পা বাড়িয়ে মেয়েকে ডাকল। সে কখনো ছেলে-মেয়েদের আশীর্বাদ করে না; শুধু দাড়িসমেত গালটা (এখনো দাড়ি কামানো হয় নি) এগিয়ে দিয়ে সস্নেহে তার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল :
ভালো আছ তো? ঠিক আছে, তাহলে বস। নিজের লেখা জ্যামিতির পাঠের অনুশীলন খাতাটা হাতে নিয়ে প্রিন্স পা দিয়ে একটা চেয়ার টেনে নিল।
তাড়াতাড়ি পৃষ্ঠাটা বের করে শক্ত নখ দিয়ে এক প্যারাগ্রাফ থেকে অন্য প্যারাগ্রাফ পর্যন্ত দাগ টেনে বলল, কালকের জন্য!
প্রিন্সেস টেবিলের উপরে অনুশীলন-খাতার উপর ঝুঁকে বসল।
একটু দাঁড়াও, তোমার একটা চিঠি আছে, হঠাৎ টেবিলের উপর দিকে ঝোলানো থলে থেকে মেয়েলি হাতে ঠিকানা লেখা একটি চিঠি বের করে প্রিন্স বলল।
চিঠিটা দেখেই প্রিন্সেসের গালে লালের ছোপ লাগল। তাড়াতাড়ি চিঠিটা নিয়ে তাতে মুখ গুঁজল।
