নগর ও গ্রামের অধিবাসীবৃন্দ, আর মজুর ও শিল্পকর্মীরা, জাতিবর্ণ-নির্বিশেষে আপনাদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে, হিজ ম্যাজেস্ট্রি সম্রাট ও নৃপতির এই পিতৃসুলভ মনোবাঞ্ছকে আপনারা পূর্ণ করুন, জন কল্যাণের কাজে তার সঙ্গে সহযোগিতা করুন। তার পদপ্রান্তে রাখুন আপনাদের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস, আমাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হতে বিলম্ব করবেন না!
সেনাদল ও জনসাধারণের মনোবলকে বাড়িয়ে তুলবার জন্য মাঝে মাঝেই অবস্থার পর্যালোচনা করে পুরস্কার বিতরণ করা হতে লাগল। অধিবাসীদের সান্ত্বনা দেবার জন্য সম্রাট স্বয়ং অশ্বারোহণে রাজপথ পরিক্রমা করতে লাগল এবং প্রচুর রাজকার্য থাকা সত্ত্বেও তার হুকুমে প্রতিষ্ঠিত থিয়েটারগুলিতে পদার্পণ করতে লাগল।
মুকুটধারীদের শ্রেষ্ঠ ধর্ম মানবপ্রীতির ক্ষেত্রেও নেপোলিয়ন সাধ্যায়ত্ত সবকিছুই করল। সমস্ত দাঁতব্য প্রতিষ্ঠানের মাথায় Maisonde ma mere শব্দগুলি খোদাই করিয়ে গভীর পুত্রস্নেহের সঙ্গে রাজকীয় মহানুভবতাকে মিশিয়ে প্রকাশ করল। অনাথ হাসপাতালটি পরিদর্শন করে অনাথ শিশুদের দিকে নিজের হাতে বাড়িয়ে দিত চুম্বনের জন্য, তুলেমিনের সঙ্গে সদয়ভাবে কথাবার্তাও বলত। তারপর, থিয়ের্সের বর্ণনা অনুসারে নিজের তৈরি জাল রুশ টাকায় সৈন্যদের বেতন দেবার হুকুম করল : নিজের এবং ফরাসি বাহিনীর যোগ্য উপায়ে এইভাবে টাকার ব্যবস্থা করে যাদের সর্বস্ব পুড়ে গেছে তাদেরও সাহায্য দেবার বন্দোবস্ত করল। কিন্তু যেহেতু তখন খাদ্য এতই দুর্মূল্য যে তা বিদেশীদের দেওয়া চলে না, আর বিদেশীরা তো অধিকাংশই শত্রু, তাই বাইরে থেকে খাদ্য কেনবার জন্য তাদের টাকা দেওয়াটাই নেপোলিয়ন বাঞ্ছনীয় মনে করল এবং তাদের মধ্যে কাগজের রুবল বিতরণের ব্যবস্থা করল।
সেনাদলের মধ্যে কঠোর শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অনবরত হুকুম জারি করা হতে লাগল যে যারা সামরিক কর্তব্য পালন না করবে তাদের কঠোর শাস্তি দেয়া হবে এবং কঠোর হাতে ডাকাতি বন্ধ করতে হবে।
.
অধ্যায়-১০
কিন্তু আশ্চর্যের কথা, এইসব বিধান, প্রচেষ্টা ও পরিকল্পনা অনুরূপ পরিস্থিতিতে প্রচারিত অন্য সব বিধি ব্যবস্থার চাইতে কোনো অংশে খারাপ না হলেও সমস্যার একেবারে মূলে পৌঁছতে পারল না, মূল মন্ত্র থেকে বিচ্যুত ঘড়ির কাঁটার মতো উদ্দেশ্যবিহীন এলোমেলোভাবে দুলতে লাগল যেন।
সামরিক দিক থেকে বলা যায়, অভিযানের যে পরিকল্পনা সম্পর্কে থিয়ের্স মন্তব্য করেছে এর চাইতে গভীরতর, কুশলতর, বা আশ্চর্যতর কোনো পরিকল্পনা তার (নেপোলিয়নের) প্রতিভার পক্ষেও সম্ভব হয়নি, সেটাকে কিন্তু মোটেই কার্যকর করা যায় নি, বা কখনো যেতও না, কারণ সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলির সঙ্গে সে পরিকল্পনার কোনো যোগই ছিল না। ক্রেমলিনের যে সুরক্ষা-ব্যবস্থার জন্য লা মঞ্জু (স্বর্গীয় আশীর্বাদধন্য বাসিল গির্জাকে নেপোলিয়ন এই নামেই উল্লেখ করত) গির্জাকে ধূলিসাৎ করতে হত সেটা একেবারেই বৃথা প্রমাণিত হল। ক্রেমলিনে সুরঙ্গ খোঁড়ার ফলে নেপোলিয়নের এই মনোবাসনা পূর্ণ করারই সহায়ক হল যে সে মস্কো ছেড়ে চলে যাবার পরেই যেন ক্রেমলিনকে উড়িয়ে দেওয়া হয়–যেমন ছোট ছেলে চায় যে মেঝের যে জায়গাটাতে সে আঘাত পেয়েছে, কেউ এসে সেই জায়গাটাতে আঘাত করুক। রুশ বাহিনীর পিছু নেবার ব্যাপারে নেপোলিয়নের খুবই উৎসাহ ছিল, আর তার ফলও হল অশ্রুতপূর্ব। ষাট হাজার সৈন্যের রুশ বাহিনী ফরাসি সেনাপতিদের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল, আর-থিয়ের্সের মতে-যেভাবে একটা হারানো পিন খুঁজে পাওয়া যায় সেইভাবে ঘটনাক্রমেই তাদের দেখা মিলল মুরাতের কৌশল ও প্রতিভার দৌলতে।
কূটনীতির ব্যাপারে, তুতোলমিন ও ইয়াকভলেভের কাছে নিজের মহানুভবতা ও ন্যায়পরায়ণতার যেসব বুলি নেপোলিয়ন আউড়েছিল সেসবই বৃথা হয়ে গেল : নেপোলিয়ন এই দূতদের সঙ্গে দেখা করল না এবং তাদের দৌত্যের কোনো জবাবও দিল না।
আইনঘটিত ব্যাপারে, তথাকথিত অগ্নিপ্রদানকারীদের মৃত্যুদণ্ডের পরেও মস্কোর বাকি অংশটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল।
শাসন-পরিচালনার ব্যাপারে, পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ফলে লুটতরাজ বন্ধ হল না, শুধু যাদের নিয়ে পৌরসভা গঠিত হল তারাই শৃঙ্খলা রক্ষার নামে মস্কোতে লুটতরাজ চালাল, আর না হয় তো লুটতরাজের হাত থেকে কেবলমাত্র নিজেদের ধন-সম্পত্তি বাঁচাবার চেষ্টা করল।
ধর্মের ব্যাপারেও বিশেষ কোনো সুফল দেখা গেল না। মস্কোতে যে দু-তিনজন পুরোহিতকে পাওয়া গেল তারা নেপোলিয়নের ইচ্ছা পালন করতে চেষ্টা করল, কিন্তু প্রার্থনা-অনুষ্ঠান চালাবার সময় জনৈক ফরাসি সৈনিক তাদের একজনের মুখে চড় মেরে বসল, এবং অপরজনের সম্পর্কে জনৈক ফরাসি অফিসার মন্তব্য করল : আমি যে পুরোহিতটিকে খুঁজে এনে ধর্মানুষ্ঠানের কাজ করতে বললাম সে গির্জাটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে তালা লাগিয়ে দিল। কিন্তু সেই রাতেই আবার দরজা ভাঙা হল, তালাগুলো চূর্ণবিচূর্ণ করা হল, পুঁথিগুলো নষ্ট করা হল এবং অন্য সবরকম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করা হল।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে শিল্প-শ্রমিক ও চাষীদের প্রতি যে ঘোষণা প্রচার করা হল তাতে কোনোরকম সাড়া মিলল না। শিল্প-শ্রমিকদের পাত্তাই পাওয়া গেল না, আর যেসব কমিসাররা ঘোষণাপত্র নিয়ে শহর ছেড়ে অনেক বেশি দূরে গেল, চাষীরা তাদের ধরে ধরে খুন করল।
