শাসনকার্যসংক্রান্ত ব্যাপারে মস্কোর জন্য একটা গঠনতন্ত্র মঞ্জুর করা হল। একটা পৌরসভা স্থাপন করে নিম্নলিখিত ঘোষণা জারি করা হল : মস্কোর অধিবাসীগণ!
আমাদের দুর্ভাগ্য বড়ই নিষ্ঠুর, কিন্তু আপনাদের সম্রাট ও নৃপতি হিজ ম্যাজেস্ট্রি সে দুর্ভাগ্যের গতিকে রোধ করতে চান। অবাধ্যতা ও অপরাধের শাস্তি তিনি কীভাবে দিয়ে থাকেন অনেক ভয়ংকর দৃষ্টান্তের ভিতর দিয়ে সে শিক্ষা আপনারা পেয়েছেন। বিশৃঙ্খলার অবসান করে জনগণের নিরাপত্তাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে কঠোর ব্যবস্থার নেয়া হয়েছে। আপনাদের ভিতর থেকেই মনোনীত একটি পিতৃতুল্য শাসক-কর্তৃপক্ষ আপনাদের পৌরসভা ও নগরসরকার গড়ে তুলবে। তারাই আপনাদের দেখাশোনা করবেন, আপনাদের প্রয়োজন ও কল্যাণের ব্যবস্থা করবেন। এই প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা কাঁধের উপর দিয়ে কোনোকুনিভাবে একটা লাল ফিতে পরবেন, আর পৌরপিতা তাছাড়াও একটি সাদা কোমরবন্ধ পরবে। কিন্তু তারা যখন কর্তব্যরত অবস্থায় থাকবেন না তখন শুধু বাম বাহুতে একটা লাল ফিতে জড়িয়ে রাখবেন।
নগর-পুলিশকে পুরনো ব্যবস্থামতোই গড়ে তোলা হয়েছে, তাদের কার্যকলাপে ইতিমধ্যেই ভালো ফলও পাওয়া গেছে। সরকার দুজন কমিসারি-জেনারেল বা পুলিশ-প্রধান নিয়োগ করেছেন, নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের জন্য ওয়ার্ড-ক্যাপ্টেনও নিয়োগ করা হয়েছে। বাম বাহুতে সাদা ফিতে দেখেই আপনারা তাদের চিনতে পারবেন। ছোট-বড় মিলিয়ে বেশ কয়েকটি গির্জা খোলা হয়েছে, সেখানে নির্বিঘ্নে ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলছে। আপনাদের প্রতিবেশী নাগরিকরা প্রতিদিনই নিজ নিজ গৃহে ফিরে আসছে, দুর্ভাগ্যের দরুন যে সাহায্য ও আশ্রয় তাদের প্রয়োজন তা যাতে তারা পান তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং আপনাদের অবস্থার উন্নতি করতে এইসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্য এটাও প্রয়োজন যে আপনারাও এ ব্যাপারে সর্বশক্তি নিয়োগ করবেন, যে দুর্ভাগ্যের শিকার আপনারা হয়েছেন যথাসম্ভব তাকে ভুলে যাবেন, এই আশা পোষণ করবেন যে আপনাদের ভাগ্য এত বেশি নিষ্ঠুর নয়, একটা বিষয়ে নিশ্চিত থাকুন যে আপনাদের শরীরের উপর এবং অবশিষ্ট সম্পত্তির উপর যারা হাত দিতে চেষ্টা করবে তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে অনিবার্য ও লজ্জাকর মৃত্যু এবং আপনাদের সর্বপ্রকার নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনোরকম সন্দেহ পোষণ করবেন না, কারণ যিনি সব নৃপতির সেরা এবং সর্বাপেক্ষা ন্যায়বান এটাই তার ইচ্ছা। সৈনিকগণ ও নাগরিকগণ, আপনারা যে জাতির মানুষই হোন না কেন, জনগণের মনে আস্থা, পুনঃপ্রতিষ্ঠা করুন, পরস্পর ভাইয়ের মতো বাস করুন, পরস্পরকে সাহায্য করুন, আশ্রয় দিন, যারা অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তাদের অভিপ্রায়কে ব্যর্থ করতে ঐক্যবদ্ধ হোন, সামরিক ও অসামরিক কর্তৃপক্ষকে মান্য করে চলুন, তাহলেই আপনাদের চোখের জলের ধারা বন্ধ হবে।
সেনাবাহিনীর রসদের ব্যাপারে নেপোলিয়ন নির্দেশ দিল, সেনাদল পর্যায়ক্রমে মস্কো প্রবেশ করবে a la maraude (লুঠেরা হিসেবে), এমনভাবে নিজেদের রসদ সংগ্রহ করবে যাতে সেনাবাহিনীর ভবিষ্যতের ব্যবস্থা হয়ে যায়।
ধর্মের ব্যাপারে নেপোলিয়ন নির্দেশ দিল, পুরোহিতদের ফিরিয়ে আনা হোক এবং গির্জায় গির্জায় আবার ধর্মীয় অনুষ্ঠান চালু হোক।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেনাবাহিনীর রসদের ব্যাপারে নিম্নলিখিত ইস্তাহার সর্বত্র প্রচার করা হল : ঘোষণা শুনুন! মস্কোর যে সব শান্তিকামী অধিবাসী, শিল্পকর্মী ও মজুর দুর্ভাগ্যের দরুন নগর থেকে বিতাড়িত হয়েছেন, অকারণ ভয়ে যে সব চাষীরা এখনো মাঠ থেকে দূরে সরে আছেন, তারা সকলেই শুনুন! এই রাজধানীতে শান্তি ফিরে আসছে, শৃঙখলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আপনাদের দেশবাসীরা সাহসের সঙ্গে তাদের গুপ্ত ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে আসছে। তাদের প্রতি এবং তাদের সম্পত্তির প্রতি যে কোনোরকম হিংসাত্মক ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি হচ্ছে। হিজ ম্যাজেস্ট্রি সম্রাট ও নৃপতি তাদের সকলকে আশা দিয়েছেন, একমাত্র যারা তাঁর আদেশ অমান্য করছে তারা ভিন্ন আর কাউকেই তিনি শত্রু বলে মনে করেন না। আপনাদের সব দুর্ভাগ্যের অবসান করে আবার আপনাদের নিজ নিজ গৃহে ও পরিবারের মধ্যে ফিরিয়ে দিতেই তিনি চান। সুতরাং তার এই মহৎ অভিপ্রায়ে আপনারা সাড়া দিন, নির্ভয়ে আমাদের কাছে আসুন। অধিবাসীবৃন্দ, পরিপূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে আপনাদের আবাসে ফিরে আসুন। আপনাদের যা কিছু প্রয়োজন অচিরেই সব পাবেন। কারিগর ও শিল্পশ্রমিকগণ, আপনাদের কাজে, আপনাদের ঘরে, আপনাদের দোকানে ফিরে আসুন, সর্বত্রই রক্ষীরা আপনাদের সাহায্যার্থে অপেক্ষা করে আছে। আপনাদের কাজের উপযুক্ত মজুরি আপনারা পাবেন। তার শেষ কথা, যেসব চাষীরা ভয়ে বনে-জঙ্গলে লুকিয়ে আছেন তারাও নির্ভয়ে ফিরে আসুন, বিশ্বাস করুন আপনাদের জন্য সব রকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। নগরে যে সব বাজার বসানো হয়েছে সেখানে চাষীরা তাদের উদ্বৃত্ত রসদ এবং জমির ফসল নিয়ে আসতে পারবেন। তারা যাতে স্বাধীনভাবে সেসব বিক্রি করতে পারেন তার জন্য সরকার নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলি নিয়েছেন : (১) আজ থেকে চাষী, কৃষিজীবী এবং মস্কোর উপকণ্ঠের অধিবাসীরা নির্বিঘ্নে তাদের সবরকম জিনসপত্র দুটি নির্দিষ্ট বাজারে নিয়ে যেতে পারবেন-তাদের একটি মখভায়া স্ট্রিটে এবং অন্যটি রসদ বাজারে অবস্থিত। (২) ক্রেতা ও বিক্রেতা যে দর সাব্যস্ত করবে সেই দরেই সব জিনিসপত্র তাদের কাছ থেকে কেনা হবে, কোনো বিক্রেতা যদি তার জিনিসের ন্যায্য দাম না পান তাহলে তিনি ইচ্ছা করলেই তার জিনিস গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন, কোনো অজুহাতেই কেউ তাকে বাধা দিতে পারবে না। (৩) প্রতি সপ্তাহের রবিবার ও বুধবার প্রধান কেনা-বেচার দিন স্থির করা হয়েছে, এবং তদুদ্দেশ্যে মঙ্গলবার ও শনিবার মালগাড়িগুলি পাহারা দেবার জন্য বড় রাস্তা বরাবর অনেক দূর পর্যন্ত সৈন্য মোতায়েন রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। (৪) চাষীরা যাতে তাদের মালগাড়ি ও ঘোড়া নিয়ে নির্বিঘ্নে ফিরে যেতে পারে তদনুরূপ ব্যবস্থাও করা হয়েছে। (৫) স্বাভাবিক বেচা-কেনা চালু করার জন্য অবিলম্বে সবরকম ব্যবস্থা নেয়া হবে।
