সেরকম কিছু তো করলই না, উপরন্তু যতগুলি পথ তার সামনে খোলা ছিল তার মধ্যে সবচাইতে বুদ্ধিহীন ও ক্ষতিকর পথটাই সে বেছে নিল। নেপোলিয়ন তো কত কিছুই করতে পারত : শীতকালটা মস্কোতে থাকতে পারত, পিটার্সবুর্গের পথে অথবা নিঝনি-নভগরদের পথ ধরে অগ্রসর হতে পারত, অথবা আরো উত্তরের অথবা আরো দক্ষিণের কোনো পথে (যেমন পরবর্তীকালে কুতুজভ যে পথ ধরেছিল) ফিরে যেতে পারত, কিন্তু সে বাস্তব ক্ষেত্রে যা করল তার চাইতে বোকামি বা বিপজ্জনক আর কিছু কল্পনাও করা যায় না। অক্টোবর পর্যন্ত সে মস্কোতেই কাটাল, সৈন্যদের যথেচ্ছ লুটতরাজের সুযোগ দিল, তারপর একটা সেনাদলকে রেখে যাবে কি না সে বিষয়ে ইতস্তত করে মস্কো পরিত্যাগ করল, যুদ্ধে যোগদান না করে কুতুজভের সঙ্গে যোগাযোগ করল, ডাইনে মোড় নিয়ে মালো-ইয়াবোশ্লাভেৎসে পৌঁছল, আবারও সোজাসুজি এগিয়ে কুতুজভের পথটা না ধরে তার পরিবর্তে বিধ্বস্ত স্মোলেনস্ক রোড ধরে মোঝায়েঙ্কে ফিরে গেল। পরবর্তী ঘটনাতেই প্রমাণ হয়েছে যে এর চাইতে নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক এবং সেনাবাহিনীর পক্ষে অধিকতর ক্ষতিকর আর কিছুই ভাবা যেত না। নিজের বাহিনীকে ধ্বংস করাই যুদি নেপোলিয়নের লক্ষ্য ছিল তাহলেও তো রুশ বাহিনী যা করুক বা না করুক, অত্যন্ত নিপুণ কোনো রণকুশলীও তো সে উদ্দেশ্যকে পুরোপুরি কার্যে পরিণত করার জন্য এর চাইতে সফল কোনো কর্মপন্থা উদ্ভাবন করতে পারত না।
প্রতিভাধর বীর নেপোলিয়ন কিন্তু এই কাজটিই করল। কিন্তু নেপোলিয়ন ইচ্ছা করেই তার বাহিনীকে ধ্বংস করেছে, অথবা অত্যন্ত বোকার মতোই সে এ কাজ করেছে, এ কথা বলা নিশ্চয়ই ঠিক হবে না, যেমন ঠিক হবে না যদি বলা হয় যে সে খুব কুশলী ও প্রতিভাধর বলেই নিজের ইচ্ছা অনুসারেই তার বাহিনীকে মস্কোতে নিয়ে গিয়েছিল।
উভয় ক্ষেত্রেই যে সব নিয়ম যুদ্ধের গতিকে পরিচালিত করেছে তার সঙ্গে নেপোলিয়নের ব্যক্তিগত ক্রিয়া কলাপ আকস্মিকভাবেই মিলে গিয়েছে মাত্র, নইলে যে-কোনো সৈনিকের ব্যক্তিগত কার্যকলাপের চাইতে তার নিজের কার্যকলাপের কোনো বিশেষ গুরুত্ব নেই।
ইতিহাসকাররা ভুল করেই বলে থাকে যে মস্কোতে এসে নেপোলিয়নের বিদ্যাবুদ্ধি দুর্বলতার হয়ে গিয়েছিল, আর তারা একথা বলে কারণ ফলাফলগুলি তার কার্যাবলিকে সমর্থন করে নি। আগেও যেমন করেছে, এবং ১৮১৩ সালের পরেও যেমন করেছে, তেমনই নিজের সব ক্ষমতা ও শক্তিকে নিয়োগ করেই সে নিজের ও সেনাবাহিনীর ভালো করতেই চেয়েছে। এক্ষেত্রেও তার কার্যাবলি মিশরে, ইতালিতে, অস্ট্রিয়ায় এবং প্রুশিয়াতে তার কার্যাবলির তুলনায় কিছু কম বিস্ময়কর ছিল না। মিশরে তার প্রতিভা কতখানি খাঁটি ছিল সেকথা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না, কারণ তার বড় বড় জয়ের বর্ণনা আমরা শুনেছি ফরাসিদেরই মুখে। অস্ট্রিয়া বা প্রুশিয়াতে তার প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন আমরা করতে পারি না, কারণ সেখানেও আমাদের সব তথ্যের উৎস হয় ফরাসি, না হয় জার্মান। কিন্তু ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, নিজেদের লজ্জাকে ঢাকবার জন্য তার প্রতিভাকে স্বীকার করার কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই। সমস্ত ব্যাপারটাকে সহজ, সরল চোখে দেখবার অধিকার অর্জন করতে অনেক মূল্য আমরা দিয়েছি, আর তাই সে অধিকার আমরা ছাড়ব না।
অন্য সব জায়গার মতোই মস্কোতেও তার ক্রিয়াকলাপ সমান বিস্ময়কর ও প্রতিভার পরিচায়ক। মস্কোতে ঢোকার মুহূর্ত থেকে তাকে ছেড়ে যাবার ক্ষণটি পর্যন্ত সে হুকুমের পর হুকুম জারি করেছে, পরিকল্পনা পর পরিকল্পনা রচনা করেছে। কোনো নাগরিক নেই, প্রতিনিধিদল নেই, মস্কো পুড়ছে, কিন্তু তাতে সে বিচলিত হয় নি। নিজের সৈন্যদের কল্যাণ, শত্রুর কার্যকলাপ, রাশিয়ার সাধারণ মানুষের কল্যাণ, প্যারিসের ঘটনাবলির গতিবিধি, অথবা প্রত্যাশিত সন্ধির শর্তাবলী নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা–কোনো কিছুই তার দৃষ্টি এড়ায় নি।
.
অধ্যায়-৯
সামরিক ব্যাপারের দিক থেকে মস্কোতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই নেপোলিয়ন জেনারেল সাবাস্তিয়ানিকে কড়া হুকুম দিল রুশ বাহিনীর গতিবিধির উপর নজর রাখতে, বিভিন্ন পথে সেনাদল পাঠাবার ব্যবস্থা করল, আর কুতুজভকে খুঁজে বের করার ভার দিল মুরাতের উপর। তারপর ক্রেমলিনকে সুরক্ষিত করার ব্যাপারে নানারকম নির্দেশ দিল, আর রাশিয়ার গোটা মানচিত্রের বুকে ভবিষ্যতে অভিযান চালাবার একটা চমৎকার পরিকল্পনাও তৈরি করে ফেলল।
কূটনৈতিক প্রশ্নের প্রসঙ্গে নেপোলিয়ন ক্যাপ্টেন ইয়াকভলেভকে ডেকে পাঠাল। তার সর্বস্ব লুঠ করে এমনভাবে ছেঁড়া পোশাক পরিয়ে ছেড়েছে যে সে বেচারি মস্কো ছেড়ে যাবার পথ পায় নি। তাকে ডেকে এনে নেপোলিয়ন নিজের নীতি ও উদারতার কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝিয়ে বলল এবং সম্রাট আলেক্সান্দারের বরাবরে একটা চিঠি লিখে তাকে পিটার্সবুর্গে পাঠিয়ে দিল। চিঠিতে লিখল, তার বন্ধু এবং ভাইকে একথা জানানো সে কর্তব্য বলে মনে করে সে মস্কোতে রস্তপচিনের কার্যকলাপ খুবই শোচনীয়।
সেই একইভাবে নিজের মতামত ও উদারতার কথা তুতোলমিনকে বুঝিয়ে বলে সেই বুড়ো মানুষটিকেও পিটার্সবুর্গে পাঠাল আলোচনা চালাতে।
আইনঘটিত ব্যাপারে অগ্নিকাণ্ডের ঠিক পরেই সে হুকুম দিল, যারা আগুন লাগিয়েছে তাদের খুঁজে এনে ফাঁসি দেওয়া হোক। তার বাড়িটাকে আগুনে পুড়িয়ে দিবার হুকুম দিয়ে শয়তান রস্তপচিনকে শাস্তি দিল।
