অন্য একজনকে বলল, আজ সকালে আমরা মুরাকে বন্দি করতে পারি নি, ঠিক সময়ে সেখানে পৌঁছতেও পারি নি, এখন আর কিছু করার নেই!
কুতুজভকে খবর দেয়া হল, ফরাসিদের পিছন দিয়ে যেখানে আগে কোনো সৈন্য ছিল না এখন সেখানে দুই ব্যাটেলিয়ন পোলিশ সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। একথা শুনে পশ্চাদ্বর্তী এরমোলভের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে সে বলল, দেখলে তো! এরা আক্রমণ করতে বলছে, সব রকম ফন্দি-ফিকির করতে বলছে, কিন্তু কাজের বেলায় কেউ কিছু করছে না, আর ওদিকে শত্রুপক্ষ আগে থেকে কভর পেয়ে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করে ফেলছে।
একথা শুনে এরমোল চোখ কুঁচকে একটু হাসল। বুঝতে পারল, তার উপরকার ঝড়টা উড়ে গেছে, একটু খোঁচা দিয়েই কুতুজভ এখন খুশি থাকবে।
পার্শ্ববতী রায়েভস্কিকে কনুইয়ের খোঁচা দিয়ে বলল, আমাকে নিয়ে বেশ একটু মস্করা করে নিলেন।
একটু পরেই এরমোলভ কুতুজভের কাছে গিয়ে সশ্রদ্ধভাবে নিবেদন করল :
ইয়োর হাইসেন, আক্রমণের হুকুম যদি দিতে চান তো এখনো সময় আছে-শত্রুরা এখনো সরে পড়ে নি। আর তা যদি না করে তো রক্ষীবাহিনী এক ফোঁটা ধোয়াও দেখতে পাবে না।
কুতুজভ জবাব দিল না, কিন্তু তাকে যখন জানানো হল যে মুরাতের সৈন্যরা পিছু হটছে তখন সে সৈন্যদের অগ্রসর হবার হুকুম দিল, যদিও প্রতি একশো পা অন্তর সে একবার করে পৌনে এক ঘণ্টার মতো থামতে লাগল।
যুদ্ধ যা করার তা অলভ-দেনিসভের কাকরাই করল, বাকি সৈন্যদের মধ্যে শত শত লোক অকারণেই প্রাণ হারাল।
এই যুদ্ধের ফলস্বরূপ কুতুজভ পেল হীরক-পদক, বেনিংসেন পেল হীরক ও এক লাখ রুবল, অন্যরাও পদমর্যাদা অনুসারে মনমতো পুরস্কার পেয়ে খুশি হল, আর কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে রদ-বদল করা হল।
তারুতিনো যুদ্ধের পরে রুশ অফিসার ও জেনারেলরা বলল, আমাদের নিয়ে এইরকমই করা হয়, মাথা মুণ্ডু কিছুই ঠিক থাকে না। তারা বলতে চাইল, কতকগুলো বোকা মিলে সব তালগোল পাকিয়ে দিয়েছে, আমরা হলে এরকম করতাম না। একথা সব সময়ই বলা হয়। কিন্তু একথা যারা বলে তারা হয় কি বলছে তাই জানে না, আর না হয় তো ইচ্ছা করেই নিজেদের ঠকায়। তারুতিনো, বরদিনো, বা অস্তারলিজ-কোনো যুদ্ধই পরিকল্পনামাফিক হয় না। এটা একেবারে মূল সত্য।
সংখ্যা স্বাধীন শক্তি একটা যুদ্ধের গতিকে প্রভাবিত করে, সে গতি-পথ আগে থেকে জানা যায় না, এবং কোনো একটি শক্তির দ্বারা নির্দেশিত পথের সঙ্গে মেলেও না।– যদি ইতিহাসকারদের, বিশেষ করে ফরাসি ইতিহাসকারদের বিবরণে দেখা যায়। যে তাদের যুদ্ধ বিগ্রহগুলি পূর্বরচিত পরিকল্পনা অনুসারেই পরিচালিত হয়েছে তাহলে একমাত্র এই সিদ্ধান্তই করা যায় যে সেসব বিবরণই মিথ্যা।
স্পষ্টতই তারুতিনোর যুদ্ধ তেলের লক্ষ্যে পৌঁছেনি, কাউন্ট অর্লভ-দেনিসভ যুদ্ধে গিয়েছিল মুরাকে বন্দি করতে, সে উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হয় নি, গোটা সেনাদলকে সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস করবার যে উদ্দেশ্য বেনিংসেন ও অন্য অনেকের ছিল তাও পূর্ণ হয় নি, নিজেকে খ্যাতিমান করার উদ্দেশ্য নিয়ে যে অফিসার যুদ্ধে গিয়েছিল তার মনস্কামনা পূর্ণ হয় নি, বা যে কসাকরা আরো বেশি লুটের মালের আশায় ছিল তাও তারা পায় নি, ইত্যাদি। কিন্তু যুদ্ধের সত্যিকারের ফল যা হল, সেদিন গোটা রাশিয়া সে ফলকে কামনা করেছিল-ফরাসিদের রাশিয়া থেকে তাড়িয়ে দিয়ে তাদের সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করা–সেটাই যদি এ যুদ্ধের লক্ষ্য হয়ে থাকে তাহলে তো ওই পরিস্থিতিতে যা ঘটা উচিত ছিল তারুতিনোর যুদ্ধে ঠিক তাই ঘটেছে। সে যুদ্ধের যা সত্যিকারের ফলাফল তার চাইতে সুবিধাজক আর কোনো ফলের কথা তো কল্পনাও করা যায় না। ন্যূনতম প্রচেষ্টা ও তুচ্ছ ক্ষয় ক্ষতির ভিতর দিয়ে প্রচণ্ড গোলযোগ সত্ত্বেও সারা অভিযানের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ফলটিই অর্জিত হল : পশ্চাদপসরণের স্থলে অগ্রগমন, ফরাসিদের দুর্বলতাকে উদ্মাটন, আর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়নের জন্য নেপোলিয়নের বাহিনী যে আঘাতের জন্য অপেক্ষা করেছিল তারই ব্যবস্থা গ্রহণ।
.
অধ্যায়-৮
মস্কোয়ার গৌরবময় জয়লাভের পরে নেপোলিয়ন মস্কোতে প্রবেশ করল। জয়লাভ সম্পর্কে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না কারণ যুদ্ধক্ষেত্রটি তখন ফরাসিদের দখলে। প্রাচীন রাজধানীকে পিছনে ফেলে রুশরা পশ্চাদপসরণ করে চলেছে। খাদ্য, অস্ত্র, বারুদ ও অপরিমেয় সম্পদে ভরা মস্কো এসেছে নেপোলিয়নের হাতে। ফরাসিদের তুলনায় অর্ধেক সৈন্য-শক্তি নিয়ে রুশ বাহিনী একটা মাসের মধ্যে একবারও আক্রমণের চেষ্টা পর্যন্ত করল না। নেপোলিয়নের অবস্থা তখন খুবই সুবিধাজনক। দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে সে তখন রুশ বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ধ্বংস করতে পারে, সুবিধাজনক শর্তে সন্ধির আলোচনা করতে পারে, অথবা তাতে ব্যর্থকাম হলে পিটার্সবুর্গকে ধ্বংস করতে অগ্রসর হতে পারে, এমন কি বেগতিক বুঝলে স্মোলেনস্ক বা ভিলনাতে ফিরে যেতে পারে, অথবা মস্কোতেই থেকে যেতে পারে : সংক্ষেপে, ফরাসিরা যে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে সেটাকে বজায় রাখতে কোনো বিশেষ প্রতিভারই দরকার হয় না। সেজন্য দরকার শুধু কতকগুলি অত্যন্ত সরল ও সহজ পদক্ষেপ : সৈন্যদের লুঠতরাজ করতে না দেওয়া, শীতের পোশাকের ব্যবস্থা করা–একটা গোটা বাহিনীর পক্ষে যথেষ্ট শীতবস্ত্র তখন মস্কোতে ছিল, এবং সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে রসদ সংগ্রহ করা-ফরাসি ইতিহাসকারদের মত অনুসারেই গোটা বাহিনীর ছয় মাসের মতো রসদ তখন মস্কোতে ছিল। তথাপি সব প্রতিভার সেরা প্রতিভা যে নেপোলিয়ন, ইতিহাসকারদের মতে সৈন্যদের উপর যার নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ ছিল, সে এর কোনো পন্থাই অবলম্বন করল না।
