শিবিরের দিকে তাকিয়ে কাউন্ট অলভ বলল, আঃ, সত্যি খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ তার মনে হল যে এই সার্জেন্ট একটি প্রতারক, সে মিথ্যা কথা বলেছে, এই দুটি রেজিমেন্টের অনুপস্থিতির জন্য রুশ আক্রমণটিই ব্যর্থ হয়ে যাবে, তাদের সে যে কোথায় নিয়ে যাবে তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। এত সৈন্যের মধ্যে থেকে একজন প্রধান সেনাপতিকে কেমন করে গ্রেপ্তার করা যাবে।
কাউন্ট বলল, আমি নিশ্চিত বলছি ওই রাস্কেলটা মিথ্যা বলেছে।
একজন বলল, তাদের তো এখনো ফিরিয়ে আনা যায়।
অ্যাঁ? সত্যি…তুমি কি মনে কর? তাদের এগিয়ে যেতে দেব, না দেব না?
আপনি কি তাদের ফিরিয়ে আনতে চান?
ফিরিয়ে আন, ওদের ফিরিয়ে আন! হঠাৎ দৃঢ়সংকল্পে অর্লভ বলে উঠল। নইলে বড় বেশি দেরি হয়ে যাবে। এখনই আলো ফুটেছে।
অ্যাডজুটান্ট জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
গ্রেকভ ফিরে এলে কাউন্ট অর্লভ-দেনিসভ উত্তেজনাবশে আক্রমণ করাই স্থির করল। সঙ্গের লোকজনদের মনেও সেই একই উত্তেজনা।
ঘোড়ায় চাপো! সে চাপা গলায় হুকুম দিল। সৈন্যরা জায়গামতো দাঁড়িয়ে ক্রুশ-চিহ্ন আঁকল।…আগে বাঢ়, ঈশ্বর তোমাদের সহায় হোন!
হুররা–আআ! সারা বন প্রতিধ্বনিতে হল। কসাক দলটি বর্শা বাগিয়ে নালাটা পেরিয়ে শিবিরের দিকে ছুটে চলল।
প্রথম যে ফরাসি সৈনিকটি কসকদের দেখতে পেল সে সভয়ে চিৎকার করে উঠল–আর শিবিরে যে যেখানে ছিল–কেউ পোশাক পরে নি, সবে ঘুম থেকে উঠেছে–সকলেই যে যেদিকে পারল ছুট দিল, রইল কামান, বন্দুক আর ঘোড়া।
পিছনে ও চারদিকে নজর না দিয়ে কাকরা যদি ফরাসিদের পিছু নিত তাহলে তারা সেখানকার সবকিছু সহ স্বয়ং মুরাকেও গ্রেপ্তার করতে পারত। অফিসাররাও তাই চেয়েছিল। কিন্তু লুটের মাল ও বন্দিদের হাতের মুঠোয় পাওয়া কসাকদের এক পাও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া তখন অসম্ভব। কেউ কোনো হুকুমের পরোয়াই করল না। এক জায়গাতেই পনেরোশো কয়েদি ও আটত্রিশটি বন্দুক পাওয়া গেল, তাছাড়া পতাকা, ঘোড়া, গদী, গোড়ার সাজ ও অন্য টুকিটাকি জিনিস তো আছেই। সবকিছুর বন্দোবস্ত করতে হবে, বন্দি ও বন্দুকগুলোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে, লুটের মাল ভাগ করতে হবে–তার জন্য চিৎকার-চেঁচামেচি ও নিজেদের মধ্যে ছোটখাট লড়াইও হল-এইসব নিয়েই কসাকরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
পিছন থেকে তাড়া না খাওয়ায় ফরাসিরা ক্রমে ধাতস্থ হল : নানা দলে ভাগ হয়ে গুলি চালাতে শুরু করল। অর্লভ-দেনিসভ অন্য সেনাদলের আসার প্রতীক্ষায় থেকে আর অগ্রসর হল না।
এদিকে বেনিংসেন ও তোল-এর নেতৃত্বাধীন পদাতিক সেনাদলগুলি হুকুমনামা অনুসারেই যথারীতি যাত্রা করলে নির্দিষ্ট স্থানে না পৌঁছে, পৌঁছে গেল অন্য কোনো স্থানে। অবশ্য কিছু সেনাদল শেষপর্যন্ত নির্দিষ্ট স্থানেই গিয়ে হাজির হল, কিন্তু তখন এত দেরি হয়ে গেছে যে তারা কোনো কাজে লাগার পরিবর্তে শত্রুপক্ষের গোলাগুলির শিকারে পরিণত হল। তোল ঘোড়া ছুটিয়ে মহাউৎসাহে সর্বত্র ছুটে বেড়াল, কিন্তু দেখল সর্বত্র সবকিছুই বিপর্যস্ত, এলোমেলো। যখন একটা জঙ্গলের মধ্যে বাগভুত-এর সেনাদলের সঙ্গে হঠাৎই দেখা হয়ে গেল তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে, অনেক আগেই তাদের অলভ-দেনিসভের সঙ্গে যোগ দেবার কথা। উত্তেজিত ও বিরক্ত হয়ে একজন কাউকে এজন্য দায়ী করতে গিয়ে তোল সেই সেনাদলের কমান্ডারের কাছে হাজির হয়ে তাকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগালি করে শেষপর্যন্ত বলল যে তাকে গুলি করা উচিত। জেনারেল বাগভুত একজন শান্ত প্রকৃতির বৃদ্ধ যোদ্ধা, এইভাবে দেরি হওয়াতে এবং সর্বত্র গোলমাল ও ভুল-বোঝাবুঝির ফলে বিচলিত হওয়ায় সেও হঠাৎ ভীষণ রেগে গেল, সকলকে অবাক করে দিয়ে নিজের স্বভাববিরুদ্ধভাবে তোল-এর প্রতি অনেক অশোভন উক্তি করে বসল।
অন্যের কাছ থেকে শিক্ষা নেয়াটা আমি পছন্দ করি না, কিন্তু অন্য যে-কোনো লোকের মতোই আমার লোকজনদের নিয়ে মরতে পারি, এই কথা বলে একটিমাত্র সেনাদল নিয়ে সে এগিয়ে গেল।
শত্রুপক্ষের গুলিবর্ষণের মুখে একটা মাঠে নেমে এই সাহসী জেনারেলটি সৈন্যদের নিয়ে সোজা এগিয়ে গেল, গভীর উত্তেজনায় একবার ভেবেও দেখল না এই অবস্থায় একটিমাত্র সেনাদল নিয়ে যুদ্ধের মধ্যে এগিয়ে যাওয়ায় কোনো ফল হবে কি না। রাগে সে তখন দিশেহারা, বিপদ, কামানের গোলা, বুলেট-যা হোক একটা কিছু তার চাই। প্রথম আসা একটি বুলেটের তার মৃত্যু হল, অন্য বুলেটে মরল তার অনেক সৈন্য। নেহাৎ অকারণেই তার সেনাদল আরো কিছুক্ষণ সেই গুলিবর্ষণের মুখে টিকে রইল।
.
অধ্যায়-৭
এদিকে আর একটা সেনাদল সম্মুখ থেকে ফরাসিদের আক্রমণ করবে এ-রকম কথা ছিল, কিন্তু সে দলের সঙ্গে ছিল কুতুজভ। সে ভালো করেই জানত যে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পরিচালিত এই যুদ্ধের ফলে গোলমাল সৃষ্টি ছাড়া আর কোনো লাভই হবে না, তাই সৈন্যদের টেনে রাখতে সে সাধ্যমতো চেষ্টা করে চলল। মোটেই এগিয়ে গেল না।
ঘোট ধূসর ঘোড়াটায় চেপে সে নীরবে পথ চলতে লাগল, আর কেউ যুদ্ধের কথা বললে ধীরে সুস্থে তার কথার জবাব দিতে লাগল।
মিলরাদভিচ অগ্রসর হবার অনুমতি চাইলে তাকে বলল, আক্রমণ কথাটা তো তোমাদের সকলের জিভেই লেগে আছে, কিন্তু কোনো রকম জটিল সেনাসমাবেশ করতে যে আমরা অক্ষম সেকথাটা তোমরা কেউ বুঝতে পারছ না।
