সে কি! পাওয়া যায় নি… বলতে গিয়েও কুতুজভ সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সংযত করল, একজন ঊর্ধ্বতন অফিসারকে ডেকে পাঠাল। কালিচে থেকে নেমে মাথাটা নিচু করে নিঃশব্দে পায়চারি করতে লাগল, নিঃশ্বাস খুব দ্রুত পড়ছে। যাকে ডাকা হয়েছিল সেই অফিসার এইখানে আসতেই কুতুজভের মুখটা রাঙা হয়ে উঠল, এই ভুলের জন্য অফিসারটিই দায়ী বলে নয়, সে রাগ দেখাবার মতো যথেষ্ট উপযুক্ত একজন তোক বলে। কাঁপতে কাঁপতে, হাঁপাতে হাঁপাতে বুড়ো মানুষটি একেবারে ক্ষেপে গেল, এইখানে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হাত তুলে তাকে শাসাল, চিৎকার করল, গালাগালি দিয়ে ভূত ভাগিয়ে দিল। ক্যাপ্টেন ব্রোজিন নামক আর একটি লোক ঘটনাক্রমে সেখানে এসে হাজির হয়েছিল, কোনো দোষে সে দোষী নয়, তবু তার কপালেও সেই একই লাঞ্ছনা জুটল।
কী রকম বদমাস লোক হে তোমরা? সব্বাইকে গুলি করব। পাজির দল! হাত ঘোরাতে ঘোরাতে নিজেও কাঁপতে কাঁপতে কুতুজভ কর্কশ গলায় চিৎকার করে বলল।
তার দৈহিক যন্ত্রণা দেখা দিল। সে একজন প্রধান সেনাপতি, প্রশান্ত মহামহিম, সকলেই বলে তার মতো শক্তিধর মানুষ রাশিয়াতে দ্বিতীয়টি নেই : অথচ এই অবস্থায় সে যেন গোটা সেনাবাহিনীর কাছে হাসির খোরাক হয়ে উঠেছে। সে তখন নিজের মনেই ভাবছে : আজ তো এত তাড়াহুড়া করে প্রার্থনা করার কোনো দরকার আমার ছিল না, বা সারা রাত জেগে চিন্তা করারও দরকার ছিল না। আমি যদি জোচ্চোর অফিসার হতাম তাহলে তো কেউ আমাকে এভাবে ঠাট্টা করতে সাহস পেত না…আর এখন! তাকে যেন দৈহিক শাস্তি দেওয়া হয়েছে সেইরকম যন্ত্রণাই সে ভোগ করছে, তাই তো রাগে, দুঃখে সে চিৎকার করছে। কিন্তু বেশিক্ষণ তার শক্তিতে কুলোল না, চারদিকে তাকিয়ে যখন বুঝতে পারল যে সে অনেক আজেবাজে বকেছে, তখনই আবার গাড়িতে চেপে নিঃশব্দে গাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে গেল।
তার রাগ একবার ফুরিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না। চোখ মিটমিট করে সকলেন কৈফিয়ৎ ও যুক্তির ফিরিস্তি শুনল (এরমোলভ অবশ্য পরদিনের আগে তার সঙ্গে দেখা করতেই এল না), আর যে সেনাসমাবেশ ও যুদ্ধযাত্রা আজ করা গেল না সেটা পরদিন করা হোক এই মর্মে বেনিংসেন, কনভনিৎসিন ও তোলের পীড়াপীড়িতে কুতুজভকে আর একবার সে প্রস্তাবে সম্মতি দিতেই হল।
.
অধ্যায়-৬
পরদিন সন্ধ্যায় সৈন্যরা নির্দিষ্ট জায়গায় সমবেত হল এবং রাতেই যাত্রা শুরু করল। হেমন্তের রাতের আকাশে গাঢ় লাল মেঘ জমেছে, কিন্তু বৃষ্টি নেই। মাটি ভিজে, কিন্তু কর্দমাক্ত নয়, সৈন্যরা নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে, শুধু মাঝে মাঝে গোলন্দাজ বাহিনীর ঝন ঝন শব্দ ঈষৎ কানে আসছে। সৈন্যদের জোরে কথা বলতে পাইপ টানতে, বা আগুন জ্বালাতে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে, তারাও ঘোড়ার ডাক বন্ধ করার চেষ্টা করছে। অভিযানের এই গোপনীয়তা তাদের বেশি করে মুগ্ধ করেছে, মনের সুখে তারা এগিয়ে চলেছে। লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে গেছে মনে করে কিছু দল থেমে গিয়ে অস্ত্রশস্ত্র স্কুপ করে রেখে ঠাণ্ডা মাটিতেই বসে পড়ল, কিন্তু বেশির ভাগ সৈন্যই সারারাত ধরে এগিয়ে চলল এবং সব জায়গায় গিয়ে পৌঁছল যেখানে যাওয়া তাদের উচিত ছিল না।
একমাত্র কাউন্ট অর্লভ-দেনিসভ তার কসাকদের নিয়ে যথাসময়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গেল। স্ত্রমিলভা গ্রাম থেকে দিমিত্রভঙ্ক যাবার পথের ধারে একটা বনের প্রান্তে পৌঁছে এই সেনাদলটি থামল।
ভোরের দিকে কাউন্ট অর্লভ-দেনিসভ ঝিমুচ্ছিল, এমন সময় ফরাসি বাহিনী ছেড়ে আসা একটি সৈনিককে এনে হাজির করায় তার ঘুম ভেঙে গেল। লোকটি পনিয়াতোস্কি সেনাদলের একজন পোলিশ সার্জেন্ট, পোলিশ ভাষাতেই সে বলল যে, তাকে অনেক আগেই অফিসার করা উচিত ছিল, তাদের যে-কোনো লোকের চাইতে সে বেশি সাহসী, অথচ তাকে খুবই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয় বলেই সে তাদের ছেড়ে এসেছে, আর তাদের ভালোভাবে শিক্ষা দিতে চায়। আরো বলল, সেখান থেকে মাত্র এক ভাস্ট দূরে মুরাৎ রাতটা কাটাচ্ছে, আর মাত্র একশো সৈন্যের একটা দল যদি তার সঙ্গে দেয়া হয় তাহলে সে তাকে জীবিত গ্রেপ্তার করতে পারবে। কাউন্ট অর্লভ-দেনিসভসহ-অফিসারদের সঙ্গে পরামর্শ করল। প্রস্তাবটা এতই লোভনীয় যে প্রত্যাখ্যান করা যায় না। সকলেই স্বেচ্ছায় যেতে রাজি হল এবং একবার চেষ্টা করে দেখার পরামর্শ দিল। অনেক যুক্তি-তর্ক ও বাদানুবাদের পরে স্থির হল, মেজর-জেনারেল গ্রেকভ দুটি কসাক রেজিমেন্ট নিয়ে পোলিশ সার্জেন্টের সঙ্গে যাবে।
যাত্রার আগে কাউন্ট অর্লভ-দেনিসভ সার্জেন্টকে বলল, মনে রেখো, যদি মিথ্যা বলে থাক তো তোমাকে কুকুরের মতো ফাঁসিতে ঝোলানো হবে, কিন্তু যদি সত্যি হয় তাহলে পাবে একশো স্বর্ণমুদ্রা!
কোনো জবাব না দিয়ে সার্জেন্ট গম্ভীরভাবে ঘোড়ায় চেপে গ্রেকভের সঙ্গে চলে গেল। তারা জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয় গেলে কাউন্ট অর্লভ-দেনিসভ প্রথম ভোরের বাসাতে কাঁপতে কাঁপতে ফিরে এল। নিজের দায়িত্বে যে কাজ সে করেছে সেজন্য বেশ উত্তেজনাও বোধ করছে। ভোরের অস্পষ্ট আলোয় ও নিভে-আসা শিবির আগুনের আলোয় সে শত্রু-শিবিরের দিকে তাকাল। ডানদিকে খোলা জায়গায় এখন আমাদের সেনাদলকে দেখতে পাবার কথা। সেইদিকে ভালো করে তাকিয়েও তাদের দেখতে পেল না। কাউন্টের মনে হল, ফরাসি শিবির কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে, তার ক্ষীণদৃষ্টি অ্যাডজুটান্টটিও সেকথা সমর্থন করল।
