.
অধ্যায়-৪
কসাকটি খবর দিল যে ফরাসি বাহিনীর বাঁ দিকটা অরক্ষিত, তার সঙ্গে বেনিংসেনের চিঠি এসে এটাই বুঝিয়ে দিল যে এখনই আক্রমণের নির্দেশ দেওয়া দরকার, দিন স্থির হল ৫ই অক্টোবর।
৪ঠা অক্টোবর সকালে কুতুজভ হুকুম-নামায় সই করল। তল সেটা এরমোলভকে পড়ে শোনাল, তাকে বাকি ব্যবস্থার উপর নজর রাখতে বলল।
ঠিক আছে–ঠিক আছে। এখন আমার হাতে সময় নেই, বলে এরশোলভ কুটির থেকে বেরিয়ে গেল।
তল যে হুকুমনামাটা রচনা করল সেটা খুবই ভালো হয়েছে। অস্তারলিজের হুকুমনামার মতোই এটাও লেখা হল–তবে এবার আর জার্মান ভাষায় নয়।
প্রথম সেনাদল এখানে-এখানে যাবে, দ্বিতীয় সেনাদল ওখানে-ওখানে যাবে, ইত্যাদি। কাগজে-কলমে সেনাদলগুলি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গেল এবং শত্রু বিধ্বস্ত হল। সব হুকুমনামার বেলায়ই যা হয়ে থাকে, আশ্চর্য নৈপুণ্যের সঙ্গে সবকিছুই ভাবা হল, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে যেরকম ঘটে থাকে, একটি সেনাদলও যথানির্দিষ্ট সময়ে এসে পৌঁছল না।
হুকুমনামার প্রয়োজনীয় সংখ্যক কপি তৈরি হবার পরে একজন অফিসারকে ডেকে সেগুলো এরমমালভের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হল। অশ্বারোহী রক্ষীবাহিনীর যে তরুণ অফিসাটির উপর এই কাজের ভার দেয়া হল সে কুতুজভের একজন আর্দালি। এত বড় কাজের ভার পেয়ে খুশি মনে সে এরমমালভের বাসায় গেল।
চলে গেছেন, এরমোলভের আর্দালি জানাল।
অশ্বারোহী রক্ষীবাহিনীর অফিসারটি তখন আর এক জেনারেলের কাছে গেল, এরমোলভকে প্রায়ই তার সঙ্গে দেখা যায়।
না, জেনারেলও বেরিয়ে গেছেন।
ঘোড়ায় চেপে অফিসার অন্য একজনের কাছে গেল।
না, তিনিও বেরিয়ে গেছেন।
এই বিলম্বের জন্য তারা আবার আমাকে না দায়ী করেন। যত সব বাজে ব্যাপার! ভাবতে ভাবতে অফিসারটি গোটা শিবিরটা চক্কর দিল। একজন বলল, অন্য কয়েকজন জেনারেলের সঙ্গে এরমোলভকে ঘোড়া ছুটিয়ে যেতে দেখেছে, অন্যরা বলল সে নিশ্চয় বাড়ি ফিরে গেছে। অফিসারটি সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করল, খাবার সময় পর্যন্ত পেল না। কিন্তু এরমোলভকে কোথাও পাওয়া গেল না, সে যে কোথায় গেছে তা কেউ জানে না। একজন সহকর্মীর কাছ থেকে কোনোরকমে কিছু খেয়ে সে আবার সামনের দিকে ছুটল মিলরাদভিচের খোঝে। সেও বেরিয়ে গেছে, তবে সেখান থেকে বলে দেওয়া হল যে জেনারেল কিকিন-এর বলনাচের আসরে তাকে পাওয়া যেতে পারে।
কিন্তু সেটা কোথায়?
অনেক দূরে একটা বাড়ি দেখিয়ে কসাক অফিসারটি বলল, কেন, ওই তো, ওই এচকিনোতে।
সে কি? আমাদের সীমানার বাইরে?
দুটো রেজিমেন্টকে ঘাঁটিতে বসিয়ে দেয়া হয়েছে, আর তারা ওখানে মজা করছে। জঘন্য। দুটো ব্যান্ড আর তিন দল গায়িকা!
অফিসারটি আমাদের সীমানার ওপারে এচকিনোর দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। অনেকদূর থেকেই বাড়ির ভিতর থেকে ভেসে আসা নৃত্য-সঙ্গীতের সুর তার কানে এল।
অবিরাম শিস ও তরবানের (একরকম তারের যন্ত্র) বাজনার সঙ্গে শুনতে পেল গান ওই প্রান্তরে.. ওই প্রান্তরে! মাঝে মাঝেই উল্লাস-ধ্বনিতে তাও চাপা পড়ে যাচ্ছে। আটটা বেজে গেছে। গোড়া থেকে নেমে একটা বড় বাড়ির বারান্দায় গিয়ে সে দাঁড়াল। একদিকে রুশ সৈন্য আর অন্যদিকে ফরাসি সৈন্য থাকা সত্ত্বেও বাড়িটা অক্ষতই আছে। ভিতরে ঢুকে দেখল, সব প্রধান জেনারেলরাই সেখানে হাজির, এরমোলভের দশাসই মূর্তিটাও আছে। সকলেরই কোটের বোতাম খোলা, লাল মুখে অর্ধবৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে তারা হো-হো করে হাসছে। ঘরের মাঝখানে একটি সুর্দশন বেঁটে জেনারেল মহা উৎসাহে পোক নাচছে।
হা, হা, হা! সাবাস নিকলাস আইভানিচ! হা, হা, হা!
অফিসারটির মনে হল একটা গুরুতর নির্দেশসহ এরকম সময়ে এখানে আসায় তার দ্বিগুণ অপরাধ হয়েছে, তার অপেক্ষা করাই উচিত ছিল, কিন্তু একজন জেনারেল তাকে দেখে ও তার মুখে সব শুনে এরমোলভকে খবর দিল।
ভ্রূকুটিত মুখে এগিয়ে এসে এরমোলভ অফিসারটির বক্তব্য শুনল, কোনো কথা না বলে কাগজগুলি তার হাত থেকে নিয়ে নিল।
কর্তব্যরত একজন সহকর্মী এরমোলভ প্রসঙ্গে অশ্বারোহী রক্ষীবাহিনীর অফিসারটিকে বলল, তুমি কি মনে কর তিনি হঠাত্র বেরিয়ে গিয়েছিলেন? এটা একটা চাল। কনভনিৎসিনকে বিপদে ফেলবার জন্য ইচ্ছা করেই এটা করা হয়েছে। দেখো, কাল কী কেচ্ছাটাই না হবে!
.
অধ্যায়-৫
কুতুজভ বলেই রেখেছিল পরদিন তাকে যেন বেশ সকালেই ঘুম থেকে ডেকে দেয়া হয়। শীর্ণদেহ বৃদ্ধ মানুষটি তাড়াতাড়ি প্রার্থনা করল, পোশাক পরল, এবং যে যুদ্ধে তার সম্মতি নেই তাতেই সৈন্য পরিচালনা করতে হবে মনের মধ্যে এই খুঁতখুতি নিয়েই কালিচে গাড়িতে চেপে লেশোভকা (তারুতিনো থেকে সাড়ে তিন মাইল দূরের একটা গ্রাম) থেকে নির্দিষ্ট জায়গার দিকে গাড়ি চালিয়ে দিল। কালিচেতে বসে সে একবার ঝিমুচ্ছে, আবার জেগে উঠছে, আর তখনই কান পেতে শুনতে চেষ্টা করছে যুদ্ধ শুরু হবার ইঙ্গিতস্বরূপ কোনো কামানের শব্দ ডান দিকে থেকে আসছে কি না। স্যাঁতসেঁতে, একঘেয়ে হেমন্তের সকাল, সবে ভোর হচ্ছে। তারুতিনোর কাছাকাছি পৌঁছে কুতুজভ দেখতে পেল, অশ্বারোহী সৈন্যরা তার যাবার পথটা পেরিয়েই ঘোড়াগুলোকে জল খাওয়াতে নিয়ে চলেছে। কুতুজভ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকাল, গাড়িটা থামাল, জিজ্ঞাসা করল তারা কোন রেজিমেন্টের লোক। যে সেনাদলের নাম তারা বলল তাদের তো এখন অনেক দূর এগিয়ে এক জায়গায় ওঁৎ পেতে থাকার কথা। হয় তো একটা ভুল হয়ে গেছে, বৃদ্ধ সেনাপতি ভাবল। কিন্তু আরো কিছুটা এগিয়ে দেখল, পদাতিক রেজিমেন্টের সৈন্যরা অস্ত্রশস্ত্র এক জায়গায় জড় করে রেখে আধা পোশাক পরে যই–পরিজ খাচ্ছে আর জ্বালানি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে একজন অফিসারকে ডেকে পাঠাল। অফিসার এসে জানাল, যুদ্ধযাত্রার কোনো হুকুম তারা পায় নি।
