যদিও মস্কো আমাদের হাতে আছে এটা ধরে নিয়েই পরিকল্পনাটা রচিত হয়েছিল তবু কর্ম-পরিষদ কর্তৃক সেটা অনুমোদিত ও গৃহীত হয়েছিল। কুতুজভ উত্তরে শুধু জানাল যে এতটা দূর থেকে পাঠানো ব্যবস্থা অনুসারে কাজ করার অনেকরকম অসুবিধা আছে। কাজেই সম্ভাবিত অসুবিধা দূর করার জন্য নতুন নির্দেশাদি পাঠানো হল, সেই সঙ্গে কুতুজভের কাজকর্মের উপর নজর রাখতে এবং সে সম্পর্কে প্রতিবেদন পাঠাতে নতুন লোকও পাঠানো হল।
এছাড়া, রুশ বাহিনীর গোটা কর্ম-পরিষদও নতুন করে গঠিত হয়েছে। ব্যাগ্রেশন নিহত হওয়ায় এবং বার্কলে আক্রোশবশত চলে যাওয়া সেই দুটি শূন্যপদেও লোক নেয়া দরকার। তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাও চলতে লাগল।
কুতুজভ ও তার কর্ম-পরিষদের প্রধান বেনিংসেনের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ, সম্রাটের ব্যক্তিগত প্রতিনিধির উপস্থিতি, এবং এইসব-রদ-বদলের ফলে সেনাবাহিনীর কর্মচারীদের মধ্যে নানারকম দলাদলি চলতে লাগল। যুদ্ধ কিন্তু এসব সত্ত্বেও নিজস্ব গতিতেই চলতে থাকল।
সম্রাটের ২রা অক্টোবরে লেখা যে চিঠিটা কুতুজভের হাতে পৌঁছল তারুতিনো যুদ্ধের পরে তাতে লেখা হয়েছিল : প্রিন্স মাইকেল ইলারিয়নভিচ! ২রা সেপ্টেম্বর থেকে মস্কো শত্রুপক্ষের হাতে রয়েছে। আপনার সর্বশেষ প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছে ২০শে তারিখে, এই সময়কালের মধ্যে আপনি শত্রুর বিরুদ্ধে অথবা প্রাচীন রাজধানীর উদ্ধারে কোনোরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি, কিন্তু আপনার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে আপনি আরো পিছিয়ে গিয়েছেন। শত্রুপক্ষের একটা ছোট দল ইতিমধ্যেই সেরপুখভ দখল করেছে, এবং সেনাবাহিনীর পক্ষে অপরিহার্য বিখ্যাত অস্ত্রাগারসহ তুলা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। জেনারেল উইতিনগরদের প্রতিবেদন থেকে আমি জানতে পেরেছি যে দশ হাজার সৈন্যের একটি শত্রুপক্ষীয় দল পিটার্সবুর্গ রোড ধরে এগিয়ে চলেছে। কয়েক হাজার সৈন্যের আর একটি দল দিমিত্রভের দিকে এগিয়ে আসছে। একটা তৃতীয় সেনাদল ভ্রাদিমির রোড ধরে এগোচ্ছে এবং একটা চতুর্থ বড় দল রুজা ও মোঝায়েঙ্কের মধ্যে ঘাঁটি করেছে। নেপোলিয়ন স্বয়ং ২৫শে তারিখ পর্যন্ত মস্কোতেই ছিলেন। এইসব সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে শত্রুপক্ষ যখন তার বড় বড় সেনাদলকে নানা দিকে ছড়িয়ে রেখেছে এবং নেপোলিয়ন ও তার রক্ষীবাহিনী মস্কোতেই রয়েছে তখনো কি আপনার সম্মুখস্থ শত্রুপক্ষ এতদূর শক্তিশালী হতে পারে যে আপনি তাদের আক্রমণ করতে পারছেন না? বরং আপনার অধীনস্থ সৈন্যদের চাইতে দুর্বলতর সেনাদল নিয়ে সেই হয়তো আপনার পশ্চাদ্ধাবন করছে। আমার তো মনে হয় এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটি দুর্বলতর শত্রুকে আক্রমণ করে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া, অন্ততপক্ষে তাকে পশ্চাদপসরণে বাধ্য করাই আপনার পক্ষে সুবিধাজনক, তাতে যে সমস্ত অঞ্চল এখন ফরাসিদের দখলে আছে তার কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ পুনর্দখল করে তুলা এবং ভিতরকার অন্য শহরগুলিকে বিপদমুক্ত করা যাবে। এদিকে বর্তমান অবস্থায় পিটার্সবুর্গে বেশি সৈন্য রাখা সম্ভব হয় নি, ফলে যে-কোনো রকমের একটা সেনাদল নিয়ে এসে শত্রু যদিএ রাজধানীটিকেও বিপন্ন করে তোল তার সব দায়-দায়িত্ব আপনাকেই বহন করতে হবে, কারণ আপনার যে বাহিনীকে রাখা হয়েছে তাতে যথেস্ট দৃঢ়তা ও উদ্যমের সঙ্গে চললে এই নতুন বিপদকে এড়িয়ে চলা খুবই সম্ভবপর। স্মরণে রাখবেন, মস্কো ছেড়ে আসার জন্য শুধু দেশবাসীর কাছে আপনার জবাবদিহি করাটা এখনো বাকি আছে। আপনি জানেন, আপনাকে পুরস্কৃত করতে আমি সর্বদাই প্রস্তুত আছি। সে দুর্বলতা আমাকে দুর্বল করবে না, কিন্তু আপনার কাছ থেকে সেই উত্সাহ, দৃঢ়তা ও সাফল্য আশা করার অধিকার আমার এবং গোটা রাশিয়ার অবশ্যই আছে, আপনার বুদ্ধি, সামরিক প্রতিভা এবং আপনার অধীনস্থ সৈন্যদের সাহসের গুণে সে প্রত্যাশা আমরা নিশ্চয়ই করতে পারি।
এই চিঠি যখন পাঠানো হল ততদিনে কুতুজভ আর তার সৈন্যদের ঠেকিয়ে রাখতে পারল না, একটা সংঘর্ষ এর মধ্যেই ঘটে গেছে।
২রা অক্টোবর সীমান্ত ঘাঁটির শাপোভালভা নামক একটি কসাক টহল দেবার সময় একটি খরগোসকে মেরে ফেলে এবং আর একটিকে আহত করে। আহত খরগোসটির পিছনে ধাওয়া করে জঙ্গলের একেবারে ভিতরে ঢুকে পড়ে সেখানে অবস্থিত মুরাতের সেনাবাহিনীর বাম ব্যূহের কাছে পৌঁছে যায়। সে যে ফরাসিদের হাতে প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিল, ফিরে এসে হাসতে হাসতে সেকথা সহকর্মীদের কাছে গল্প করল। আর সে গল্প শুনে জনৈক কর্নেল তার কমান্ডারকে খবরটা জানিয়ে দিল।
কসাকটিকে ডেকে পাঠিয়ে নানারকম প্রশ্ন করা হল। কসাক অফিসাররা এই সুযোগে কয়েকটা ঘোড়া হাতিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু একজন ঊর্ধ্বতন অফিসার ব্যাপারটা আরো উপরে জানিয়ে দিল। উপর মহলে তখন খুবই রেশারেশি চলছে। কয়েকদিন আগেই এরমোলভ বেনিংসেনের সঙ্গে দেখা করে তাকে বলে এসেছে, আক্রমণ শুরু করার জন্য প্রধান সেনাপতির উপর যেন চাপ সৃষ্টি করা হয়।
বেনিংসেন উত্তরে তাকে বলেছে, আমি যদি আপনাকে না জানতাম তা হলে ভাবতাম যে আপনি মুখে যা বলছেন আসলে তা চাইছেন না। আমি যে পরামর্শই দেই না কেন, হিজ হাইসেন অবশ্যই করবেন ঠিক তার উল্টোটি।
কসাকটির প্রতিবেদন এবং অশ্বারোহী টহলদার পাঠানোতেই প্রমাণ পাওয়া গেল সে সন্ধিক্ষণ সমাগত। কসে পাক-দেওয়া স্পিংটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে শুরু করেছে, ঘণ্টা বাজছে। নিজের সব শক্তি, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা এবং মানব-চরিত্রের জ্ঞান সত্ত্বেও কাকটির প্রতিবেদন, বেনিয়সেনের চিঠি, তার মতে সম্রাটের অভিপ্রায়, এবং সব জেনারেলের ঐকমত্যের কথা চিন্তা করে কুতুজভ আর সেনাদলের অনিবার্য অগ্রগতিকে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না, নিষ্ফল এবং ক্ষতিকর জেনেও সেই কাজটি করার হুকুমই দিল–অর্থাৎ যা ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে তাতে নিজের সম্মতি জানাল।
