.
অধ্যায়–২
বিখ্যাত পার্শ্বযাত্রা ব্যাপারটা মোটামুটি এই : ফরাসিদের অগ্রগতি বন্ধ হবার পরে আক্রমণকারীদের কাছ থেকে অবিরাম পশ্চাদপসরণকারী রুশ বাহিনী নিজেদের গতিপথ পরিবর্তন করল এবং যখন দেখল যে শত্রু তার পিছনে ধাওয়া করছে তখন স্বভাবতই তারা সেইদিকে এগোতে লাগল যেখানে প্রচুর রসদ মজুত ছিল।
রুশ বাহিনীর প্রতিভাধর কমান্ডারদের কথা না ভেবে আমরা যদি সে বাহিনীটাকে পরিচালকহীন রূপে কল্পনা করি তাহলে সে বাহিনীর পক্ষে যেসব অঞ্চলে অধিকাংশ রসদ পাওয়া যাবে এবং যেটা দেশের সবচাইতে সমৃদ্ধ অঞ্চল সেখান দিয়ে অর্ধবৃত্তাকার পথে আবার মস্কো ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করা সম্ভব হত না।
নিঝনি থেকে রিয়াজান, তুলা ও কালুগা রোড ধরে চলাটা এতই অস্বাভাবিক যে রুশ লুটেরারাও ওই পথেই চলাচল করে থাকে, আর পিটার্সবুর্গ থেকে কুতুজভকেও ওই পথেই সৈন্য চালিয়ে নিতে বারবার বলা হচ্ছিল। রিয়াজান রোড ধরে সৈন্য চালানোর জন্য তারুতিনোতে কুতুজভকে সম্রাটের কাছ থেকে তীব্র ভর্ৎসনাই শুনতে হল, অথচ কালুগার কাছে যেখানে সে ইতিমধ্যেই ঘাঁটি পেতেছে ম্রাটের চিঠিতে তাকে সেখানে যাবার নির্দেশই দেয়া হল।
একটা বলের মতো গড়াতে গড়াতে রুশ বাহিনী স্বাভাবিকভাবে যেখানে যাবার কথা সেখানেই পৌঁছে গেল। কুতুজভের কৃতিত্ব তথাকথিত সমর-কৌশলগত প্রতিভার নয়, তার কৃতিত্ব যে একমাত্র সেই ঘটনার তাৎপর্যকে বুঝতে পেরেছিল। ফরাসি বাহিনীর তৎকালীন নিষ্ক্রিয়তার অর্থ একমাত্র সেই বুঝতে পেরেছিল, একমাত্র সেই বারবার বলেছে যে বরদিনোর যুদ্ধে তাদের জয় হয়েছে, প্রধান সেনপতি হিসেবে শত্রুকে আক্রমণ করতে চাওয়াটাই তার কাছে প্রত্যাশিত হলেও রুশ বাহিনীকে অকারণ সংঘর্ষ থেকে নিবৃত্ত করতে সেই সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছিল।
বরদিনোতে আহত জন্তুটিকে পলায়নমান শিকারী যেখানে রেখে গিয়েছিল সে সেখানেই পড়ে রইল, কিন্তু সে তখনো বেঁচে আছে কি না, শক্তিশালী হয়েও নেহাৎ পড়ে আছে কিনা, সেকথা শিকারি জানত না। হঠাৎ জন্তুটার আর্তনাদ শোনা গেল।
সেই আহত পশুর (ফরাসি বাহিনী) যে আর্তনাদ তার শোচনীয় অবস্থাটাকে প্রকাশ করে দিল সেটা হল শান্তির প্রস্তাব দিয়ে লরিস্টনকে কুতুজভের শিবিরে প্রেরণ।
নেপোলিয়ন সবসময়ই বিশ্বাস করত যে তার মাথায় যা আসে সেটাই ঠিক, যতই অর্থহীন হোক সে কথাগুলি প্রথম তার মনে এল তাই সে কুতুজভকে লিখে পাঠাল।
লিখল : মঁসিয় লি প্রিন্স কুতুজভ, কয়েকটি বিশেষ প্রশ্ন নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করার জন্য আমার একজন অ্যাডজুটান্ট-জেনারেলকে আপনার কাছে পাঠাচ্ছি। ইয়োর হাইনেসের কাছে আমার মিনতি, সে আপনাকে যা বলবে, বিশেষ করে দীর্ঘকাল ধরেই আপনার ব্যক্তিত্বের প্রতি যে সম্মান ও বিশেষ শ্রদ্ধা আমি পোষণ করে আসছি সেই মনোভাবকে সে যখন প্রকাশ করবে, তখন আপনি যেন তার কথায় বিশ্বাস করেন। এ চিঠির আর কোনো উদ্দেশ্য নেই, মঁসিয় লি প্রিন্স কুতুজভ, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তার পবিত্র ও সদয় আশ্রয়ে তিনি আপনাকে রক্ষা করুন!
—-মস্কো, ৩০শে অক্টোবর, ১৮১২ নেপেলিয়ন।
কুতুজভ জবাব দিল : আমাকে কোনোরকম মিটমাটের উদ্যোক্তা বলে মনে করলে উত্তরপুরুষ আমাকে অভিশাপ দেবে। আজ এই আমার জাতির মনোভাব। কিন্তু সেনাদল যাতে আক্রমণ না করে সেজন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করতে লাগল।
যে একটা মাস ধরে ফরাসি সৈন্যরা মস্কোতে লুঠতরাজ করে ফিরছিল আর রুশ সৈন্যরা তারুতিনোতে তবু ফেলে চুপচাপ বসেছিল, সেই সময়কালে দুই সেনাদলের মধ্যে কি মনোবলে কি সংখ্যায় একটা পরিবর্তন দেখা দিয়েছে–তার ফলে এখন রুশ পক্ষের দিকেই পাল্লাটা ভারি হয়েছে। যদিও ফরাসি বাহিনীর অবস্থা ও সংখ্যার কথা রুশরা জানত না, তবু এই পরিবর্তন ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই আক্রমণ করার প্রয়োজনটা অসংখ্য লক্ষণের ভিতর দিয়ে প্রকাশ পেতে লাগল। সে লক্ষণগুলি হল : লরিস্টনের দৌত্য, তারুনিনোতে রসদের প্রাচুর্য, চতুর্দিক থেকে ফরাসিদের নিষ্ক্রিয়তা ও বিশৃঙ্খলার সংবাদ, চমৎকার আবহাওয়া, আমাদের রেজিমেন্টে নতুন সৈনিকের অবিরাম যোগদান, রুশ সৈন্যদের লম্বা বিশ্রাম ও কাজ করার জন্য অধৈর্য হয়ে ওঠা, যে ফরাসি বাহিনী এতকাল ছিল দৃষ্টির আড়ালে তাদের গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত হবার জন্য তারুতিনোতে অবস্থিত ফরাসিদের সম্পর্কে খুব নিকটবর্তী রুশ ঘাঁটির সৈন্যদের কৌতূহল, ফরাসিদের বিরুদ্ধে চাষী ও গেরিলা সৈনদের সহজ জয়লাভের সংবাদ ও তজ্জনিত উৎসাহ বৃদ্ধি, ফরাসিরা যতদিন মস্কোতে থাকবে ততদিন রাশিয়ার প্রতিটি মানুষের মনে প্রতিশোধের তীব্র স্পৃহা, এবং সর্বোপরি প্রতিটি রুশসৈনিকের মনের অস্পষ্ট ধারণা যে তুলনামূলকভাবে উভয়দলের সৈন্যসংখ্যার পরিবর্তন ঘটেছে, আর সেটা ঘটেছে আমাদেরই স্বপক্ষে। তুলনামূলক শক্তির যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটার ফলে সৈন্যদের অগ্রাভিযান অনিবার্য হয়ে উঠেছে। আর সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ির মিনিটের কাঁটাটা একটা বৃত্ত পূর্ণ করামাত্রই যেমন ঘড়িটা বাজতে শুরু করে তেমনই উচ্চতর মহলের ফিসফিস, ফুসফুস এবং বর্ধিত কর্মপ্রচেষ্টার ভিতর দিয়ে এই পরিবর্তনই ঘোষিত হচ্ছে।
.
অধ্যায়-৩
রুশ বাহিনী পরিচালিত হচ্ছে সপার্ষদ কুতুজভের হাতে এবং পিটার্সবুর্গ থেকে সম্রাটের হাতে। মস্কো পরিত্যাগের সংবাদ পিটার্সবুর্গে পৌঁছবার আগেই গোটা অভিযানের একটা বিস্তারিত পরিকল্পনা রচনা করে কুতুজভকে পাঠানো হয়েছিল সেই মতো কাজ করতে।
