ইতিহাকাররা মনে করে, বরদিনোর যুদ্ধ এবং শত্রু-কর্তৃক মস্কো দখল ও অগ্নিদগ্ধ করে তার ধ্বংসসাধনের পরেই ১৮১২ সালের যুদ্ধের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে রিয়াজান হতে কালুগা রোড এবং তারুতিনো শিবির পর্যন্ত রুশ বাহিনীর অভিযান-ক্রাসনয়া পখরা নদী বরাবর সৈন্যদের তথাকথিত পার্শ্বযাত্রা। সেই প্রতিভাদীপ্ত জয়ের গৌরব তারা দিয়ে থাকে বিভিন্ন মানুষকে, আর সে গৌরব কার প্রাপ্য তা নিয়ে বিতর্কও আছে। এমন কি ফরাসি ইতিহাসকাররা সমেত বিদেশী ইতিহাসকাররাও সেই পার্শ্বযাত্রার কথা বলতে গিয়ে রুশ সেনায়কদের প্রতিভাকে স্বীকৃতি জানিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধবিষয়ক লেখকরা, এবং তাদের দেখাদেখি অন্যরাও, কেমন করে মনে করে যে এই অভিযানটি একটি মাত্র মানুষের গভীর ধ্যান-ধারণারই ফল যে রাশিয়াকে রক্ষা করেছে এবং নেপোলিয়নকে ধ্বংস করেছে সেটা বোঝা খুব শক্ত। প্রথমত, এই পার্শ্বযাত্রার মধ্যে গভীর জ্ঞান ও প্রতিভার পরিচয় কোথায় আছে সেটাই বোঝা শক্ত, কারণ যখন আক্রান্ত হবার কোনো ভয় নেই তখন একটি সেনাদলের পক্ষে সেই জায়গায় অবস্থান করাই যে সর্বাপেক্ষা সুবিধাজনক যেখানে যথেষ্ট খাদ্যদ্রব্য পাওয়া যাবে সেটা বুঝতে তো খুব বেশি মানসিক প্রচেষ্টায় প্রয়োজন হয় না, ১৮১২ সালে মস্কো থেকে পশ্বাদপসরণের পরে সেনাদলের পক্ষে সবচাইতে ভালো ঘাঁটি যে কালুগা লোগ সেটা তো যে কোনো একটা তেরো বছরের স্বল্পবুদ্ধি ছেলেও অনুমান করতে পারত। সুতরাং কোনো যুক্তিবলে ইতিহাসকাররা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হল যে এই রণ-কৌশল গভীর জ্ঞানের পরিচায়ক সেটা বোঝা অসম্ভব। তাছাড়া, এটা বোঝা আরো শক্ত যে তারা কেন মনে করে বসল যে রাশিয়াকে রক্ষা করার এবং ফরাসিদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই রণ-কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল, কারণ এই রণ-কৌশলের আগে, সমকালে, বা পরবর্তীকালে যদি অন্য কোনোরকম পরিস্থিতি দেখা দিত তাহলে সেটা রুশদের পক্ষে ধ্বংসাত্মক এবং ফরাসিদের পক্ষে সুবিধাজনক হয়ে উঠতে পারত। সেই সেনাযাত্রার সময় থেকেও যদি রুশদের অবস্থার উন্নতি ঘটতে আরম্ভ করে থাকে তাহলেও তো একথা বলা যায় না যে ওই যাত্রাই তার কারণ।
মস্কো যদি ভস্মীভূত না হত তাহলে কি হত? মুরাৎ যদি রুশদের দৃষ্টির আড়ালে যেতে না দিত? নেপোলিয়ন যদি নিষ্ক্রিয় না হত? বেনিংসেন ও বার্কলের পরমর্শমতো রুশ বাহিনী যদি ক্রাসনয়া পখরাতে যুদ্ধ করত? রুশরা যখন পখরা নদী পেরিয়ে এগোচ্ছিল তখন ফরাসিরা তাদের আক্রমণ করত? নেপোলিয়ন যে উৎসাহ-উদ্যমের সঙ্গে আলেনস্কে রুশদের আক্রমণ করেছিল তার দশ ভাগের এক ভাগ উৎসাহ-উদ্যম নিয়েও সে যদি তারুতিনোর পথে তাদের আক্রমণ করত তাহলে কি হত? ফরাসিরা যদি পিটার্সবুর্গের দিকে এগিয়ে যেতে তাহলেই বা কি হত? এইসব ঘটনার যে-কোনো একটা ঘটলেই পাশ্বযাত্রা মুক্তির বদলে ধ্বংস বয়ে আনতে পারত।
তৃতীয় কথা এবং সবচাইতে দুর্বোধ্য কথা এই যে ইতিহাস নিয়ে যারা আলোচনা করে তারাও ইচ্ছা করেই বুঝতে চায় না যে এই পাশ্বযাত্রা কোনো একটি মানুষের ব্যাপার নয়, কেউই আগে থেকে এটা ভাবে নি, আর বাস্তব ক্ষেত্রে, ফিলি (রুশ বাহিনীর পশ্চাদপসরণের পথে সর্বশেষ গ্রাম) থেকে পশ্চাদপসরণের মতোই, এই পার্শ্বর্যাত্রাটা পুরোপুরিভাবে কোনো সময়ই কারো মাথা ছিল না, একটু-একটু করে, ধাপে-ধাপে, ঘটনার পর ঘটনার ভিতর দিয়ে অসংখ্য বিচিত্র পরিস্থিতির পরিণতিতে এটা ঘটেছে, ব্যাপারটা পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে দেখা দিল একমাত্র তখন যখন ঘটে যাবার পরে সেটা অতীতের বিষয় হল।
ফিলির বৈঠকে রুশ কমান্ডারদের মাথায় স্বাভাবিকভাবেই একটি মাত্র পথের কথাই এসেছিল-সোজা নিঝনি রোড ধরে পিছু হটে যাওয়া। কিন্তু কমিসারিয়েট বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ল্যানসকয় প্রধান সেনাপতিকে জানাল, সেনাবাহিনীর রসদের মোটা অংশই মজুত করা আছে তুলা ও রিয়াজন প্রদেশের ওকা নদীর তীর বরবার, কাজেই নিঝনি রোড ধরে গেলে সেনাদল প্রশস্ত ওকা নদীর দ্বারা রসদ-ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, আর প্রথম শীতে ওকা নদী পার হওয়া যাবে না। নিঝনি-নভগরদের পথ ধরে সোজা পিছিয়ে যাবার পরিবর্তে কেন অন্য পথ ধরতে হয়েছিল এখানেই তার হদিস পাওয়া যায়। সেনাদল রিয়াজন রোড ধরে আরো দক্ষিণে এগিয়ে চলল রসদের দিকে। পরবর্তীকালে ফরাসিদের নিষ্ক্রিয়তা, তুলার অস্ত্রাগারের নিরাপত্তার চিন্তা এবং রসদের কাছাকাছি যাবার সুবিধা-এই তিনটি পরিস্থিতির ফলেই সেনাদল আরো দক্ষিণে বেঁকে তুলা রোড ধরল। পখরা নদীর ওপরে তুলা রোডে পৌঁছে রুশ কমান্ডাররা স্থির করল পদোলঙ্কা-এই থেকে যাবে, তখনো তারা তরুতিনো ঘাঁটির কথা চিন্তাই করে নি, কিন্তু অসংখ্য ঘটনা ফরাসি সৈন্যদের পুনরাবির্ভাব, প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের সম্ভাবনা, এবং সর্বোপরি কালুগা প্রদেশে রসদের প্রাচুর্য–সবকিছু মিলে আমাদের সৈন্যদের বাধ্য করল আরো দিক্ষণে অগ্রসর হয়ে এবং তুলা থেকে কালুগা রোড ধরে তারুতিনোর দিকে এগিয়ে যেতে, যেসব রাস্তায় রসদ মজুদ করা ছিল তার মধ্যস্থলেই তারুতিনোর অবস্থান। মস্কো পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত কখন নেয়া হয়েছিল সেটা বলা যেমন অসম্ভব, ঠিক তেমনই তারুতিনো যাবার সিদ্ধান্ত কখন নেয়া হয়েছিল বা কে নিয়েছিল সেটা সঠিকভাবে বলাও অসম্ভব। অসংখ্য বিচিত্র ধরনের ঘটনার ফলে সেনাবাহিনী যখন সেখানে পৌঁছে গেল একমাত্র তখনই সকলে নিশ্চিত হয়ে ভাবল যে এই যাত্রাই ছিল তাদের অভিপ্রেত এবং বহুকাল আগেই তারা এর ফলটা দেখতে পেয়েছিল।
