পিয়ের, এখানে এস বাবা। এই পারিবারিক পরামর্শের ব্যাপারে ওর যোগদান অবান্তর হবে না বলেই আমি মনে করি; তাই নয় কি প্রিন্স?
তুমি কথা বলছ না কেন দাদা? প্রিন্সেস হঠাৎ এত জোরে চিৎকার করে উঠল সে আশপাশের সকলেই চমকে উঠল। ঈশ্বর জানেন কে ওকে নাক গলাবার অনুমতি দিয়েছে। একটি মুমূর্ষ মানুষের একবারে দোরগোড়ায় এরকম গণ্ডগোল পাকাতে কে বলেছে? তুমি চুপ করে আছ কেন? সর্বশক্তি দিয়ে পোর্টফোলিওটাকে টেনে ধরে সে হিসহিস করে উঠল, ষড়যন্ত্রকারিণী!
কিন্তু আন্না মিখায়লভনা পোর্টফোলিওটাকে দখলে রাখতে একপা কি দুপা এগিয়ে হাতটা বদলে নিল।
প্রিন্স ভাসিলি উঠে দাঁড়াল। তিরস্কার ও বিস্ময়ের সুরে বলল, আঃ! এ তো অসহ্য। ছেড়ে দাও বলছি।
প্রিন্সেস ছেড়ে দিল।
আপনিও ছেড়ে দিন।
কিন্তু আন্না মিখায়লভনা তার কথা শুনল না।
ছেড়ে দিন বলছি! আমি দায়িত্ব নিচ্ছি। আমি নিজে গিয়ে তাঁকে বলব। আমি! তাহলে আপনি খুশি হবেন তো?
আন্না মিখায়লভনা বলল, কিন্তু প্রিন্স, এ রকম একটা পবিত্র অনুষ্ঠানের পরে তাঁকে একটু শান্তিতে থাকতে দিন! এই যে পিয়ের, তোমার মতামতটা এদের জানিয়ে দাও। পিয়ের ততক্ষণে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
প্রিন্স ভাসিলি কঠোর গলায় বলল, মনে রাখবেন যে এর ফলাফলের জন্য আপনাকে জবাবদিহি করতে হবে। আপনি কি করছেন তা নিজেই জানেন না।
আচমকা একলাফে আন্না মিখায়লভনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পোর্টফোলিওটা তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বড় প্রিন্সেস চিৎকার করে বলল, নিচ মেয়েছেলে!
প্রিন্স ভাসিলি মাথা নিচু করে দুই হাত ছড়িয়ে দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সেই ভয়ংকর দরজাটা-যে দরজার উপর পিয়ের এতক্ষণ নজর রেখেছিল, যে দরজা এতক্ষণ নিঃশব্দে খুলছিল-এবার সেটা সশব্দে খুলে গিয়ে দেয়ালের গায়ে আছড়ে পড়ল, আর মেজ প্রিন্সেস হাত মোচড়াতে মোচড়াতে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
তীব্রভাবে চিৎকার করে বলল, তোমরা করছ কি! তিনি মরতে বসেছেন, আর তোমরা আমাকে একা তার কাছে রেখে এসেছ!
বড় বোন পোর্টফোলিওটা ফেলে দিল। আন্না মিখায়লভনা নিচু হয়ে তাড়াতাড়ি সেটা তুলে নিয়ে ছুটে গিয়ে শোবার ঘরে ঢুকল। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বড় প্রিন্সেস ও প্রিন্স ভাসিলিও তার পিছনে ছুটল। কয়েক মিনিট পরে বিবর্ণ, কঠিন মুখে নিচের ঠোঁটটা কামড়াতে কামড়াতে বড় প্রিন্সেস বেরিয়ে এল। পিয়েরকে দেখতে পেয়ে তার মুখে ফুটে উঠল অদম্য ঘৃণা।
বলল, হ্যাঁ, এবার তুমি খুশি হবে! এর জন্যই তো তুমি অপেক্ষা করে ছিলে! হঠাৎ কেঁদে উঠে রুমালে মুখ ঢেকে সে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
তারপরেই ঢুকল প্রিন্স ভাসিলি। যে সোফায় পিয়ের বসেছিল টলতে টলতে সেখানে গিয়ে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে সে সেখানে ধপ করে বসে পড়ল। পিয়ের দেখল, তার মুখটা কালো হয়ে গেছে; তীব্র যন্ত্রণায় তার চোয়াল থরথর করে কাঁপছে।
পিয়েরের কনুইটা ধরে সে বলল, হায় বন্ধু আমার! এখন তার গলায় এমন একটা আন্তরিকতা ও দুর্বলতার সুর ফুটে উঠেছে যা এর আগে পিয়ের কখনো শোনে নি। প্রিন্স ভাসিলি বলতে লাগল, আমরা কত পাপ করি, কত লোককে ঠকাই, কিন্তু কিসের জন্য? আমার বয়স প্রায় ষাট হল বন্ধু…আমিও…মৃত্যুতে সবই তো শেষ হয়ে যাবে, সব! মৃত্যু ভয়াবহ… বলেই সে কেঁদে উঠল।
সব শেষে বেরিয়ে এল আন্না মিখায়লভনা। ধীর, শান্ত পা ফেলে সে পিয়েরের কাছে এগিয়ে গেল।
ডাকল, পিয়ের!
পিয়ের সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাল। মহিলাটি তার কপালে চুমো খেল; তাকে চোখের জলে ভিজিয়ে দিল। একটু চুপ করে থেকে বলল, তিনি ইহজগতে নেই…
চশমার উপর দিয়ে পিয়ের তার দিকে তাকাল।
চল। আমি তোমার সঙ্গে যাব। কাঁদতে চেষ্টা কর। চোখের জলের মতো সান্ত্বনা আর কিছুই দিতে পারে না।
মহিলাটি তাকে অন্ধকার বসবার ঘরে নিয়ে গেল। কেউ তার মুখ দেখতে পাচ্ছে না ভেবে পিয়ের খুশি হল। তাকে রেখে আন্না মিখায়লভনা চলে গেল। ফিরে এসে দেখল হাতের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।
সকালে আন্না মিখায়লভনা পিয়েরকে বলল :
হ্যাঁ বাবা, এটা আমাদের সকলেরই এক বিরাট ক্ষতি; তোমার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। কিন্তু ঈশ্বর তোমার সহায় হবেন : তুমি যুবক, আর আমি আশা করি তুমি এখন প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী। উইলটা এখনো ভোলা হয় নি। তোমাকে আমি ভালো করেই চিনি, তাই নিশ্চিত আশা রাখি যে সম্পত্তি তোমার মাথা ঘুরিয়ে দেবে না; কিন্তু এই সম্পত্তি তোমার উপর অনেক কর্তব্যের ভার চাপিয়েছে; তোমাকে মানুষ হতে হবে।
পিয়ের নীরব।
হয়তো পরে তোমাকে বলব বাবা যে আমি সেখানে না থাকলে কি যে ঘটত তা শুধু ঈশ্বরই জানেন! তুমি জান, গতকালের আগের দিনই তিনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন, বরিসকে ভুলবেন না। কিন্তু তিনি তো সময় পেলেন না। আশা করি, তোমার বাবার ইচ্ছা তুমি পূরণ করবে।
পিয়ের এ সবকিছুই বুঝল না; লজ্জায় লাল হয়ে সে নিঃশব্দে প্রিন্সেস আন্না মিখায়লভনার দিকে তাকাল। পিয়েরের সঙ্গে কথা বলে আন্না মিখায়লভনা রশুভদের বাড়িতে ফিরে গিয়ে ঘুমতে গেল। সকালে ঘুম থেকে উঠে সে রস্ত পরিবারকে এবং অন্য পরিচিত লোকদের কাউন্ট বেজুখভের মৃত্যুর বিবরণ বিস্তারিতভাবে শোনাল। বলল, কাউন্ট যে ভাবে মারা গেছে সে-মৃত্যু তার নিজেরও কাম্য; তার পরিণতি শুধু মর্মস্পর্শী নয়, মহান। আর পিতা-পুত্রের শেষ সাক্ষাৎ, সেটি এতই মর্মস্পর্শী যে সে কথা ভাবলেই তার চোখে পানি আসে; সেই ভয়ংকর মুহূর্তগুলিতে কার ব্যবহার যে বেশি ভালো হয়েছিল তা সে জানে না যে পিতা শেষ মুহূর্তেও সব জিনিস ও সব মানুষকে স্মরণে রেখেছিল এবং ছেলেকে এত সব করুণ কথা বলেছিল, সে-না কি পিয়ের যে দুঃখে এতদূর ভেঙে পড়েছিল যে তাকে দেখেও কষ্ট হচ্ছিল, অথচ মুমূর্ষ বাবাকে কষ্ট না দেবার জন্য সে দুঃখকে সে প্রাণপণে চেপে রেখেছিল। মৃত্যু বেদনাদায়ক, তবু সে মানুষের কল্যাণ করে। বৃদ্ধ কাউন্ট ও তাঁর উপযুক্ত ছেলের মতো মানুষকে দেখিয়ে মৃত্যু আমাদের মনকে উন্নত করে, মহিলাটি বলল। বড় প্রিন্সেস ও প্রিন্স ভাসিলির ব্যবহারকে সে সমর্থন করল না, কিন্তু তাদের কথা সে বলল ফিসফিস করে অত্যন্ত গোপন । কথার মতো।
