আবার সে বাইরে থেকে ঠেলা দিল। আন্দ্রু শেষ মানবিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল, দরজার পাল্লা দুটো নিঃশব্দে খুলে গেল। সে ঢুকল, ঢুকল মৃত্যু, প্রিন্স আন্দ্রু মারা গেল।
কিন্তু যে মুহূর্তে সে মারা গেল সেই মুহূর্তে প্রিন্স আন্দ্রুর মনে পড়ল যে সে ঘুমিয়েছিল, আর ঠিক যে মুহূর্তে সে মারা গেল তখনই অনেক চেষ্টার পরে সে জেগে উঠেছে।
হ্যাঁ, এই তো মুত্যু! আমি মরে গিয়েছিলাম–আবার জেগে উঠেছি। হ্যাঁ, মৃত্যুই তো জাগরণ। আর সঙ্গে সঙ্গে তার অন্তর আলোকিত হয়ে উঠল, যে যবনিকা অজ্ঞাতকে আড়াল করে রেখেছিল তার আত্নিক দৃষ্টির সম্মুখ থেকে সেটা সরে গেল। মনে হল, যেসব শক্তি এতদিন তার মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে ছিল তারা ছাড়া পেয়েছে, সেই বিচিত্র ভারহীনতা আর কোনো দিন তাকে ছেড়ে যায়নি।
ঠাণ্ডা ঘামের মধ্যে জেগে উঠে সে ডিভানে নড়াচড়া করল তখন নাতাশা কাছে গিয়ে জানতে চাইল কি হয়েছে। সে কোনো জবাব দিল না, কিছু বুঝতে না পেরে অদ্ভুতভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
প্রিন্সেস মারি আসার দুদিন আগে এই ঘটনাই ঘটেছিল। ডাক্তারের মতে ক্ষয়কারী জ্বরটা সেদিন থেকেই উকট আকার ধারণ করেছে, কিন্তু নাতাশা ডাক্তারের কথায় কান দিল না, তার চোখে ধরা পড়ল কতকগুলি সুস্পষ্ট ভয়ংকর নৈতিক লক্ষণ।
সেদিন থেকেই ঘুম থেকে জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রু যেন জীবন থেকেও জেগে উঠতে লাগল। একটা স্বপ্নের সময়কালের সঙ্গে তুলনায় এই জাগরণের গতি মোটেই শ্লথতর নয়।
এই তুলনামূলক ধীরগতি জাগরণের মধ্যে ভয়ংকর বা দুর্বার কিছু ছিল না।
তার শেষের দিনগুলি অতি সাধারণ ও সরলভাবেই কাটতে লাগল। প্রিন্সেস মারি ও নাতাশা কখনো তাকে ছেড়ে যায় না, এটা তারাও বুঝতে পারল। কিন্তু তারা কাঁদল না, ভয়ে শিউরে উঠল না, শেষের কয়টা দিন তারা নিজেরাও বুঝতে পারল যে তারা আর প্রিন্স আন্দ্রুর সেবা করছে না সে এখন আর তাদের মধ্যে নেই,তাদের ছেড়ে গেছে), সেবা করছে তার দেহের। এই অনুভূতি দুজনের মনেই তখন এত প্রবল যে মৃত্যুর ভয়ংকর বহিরঙ্গ দিকটা তাদের আর আঘাত দিতে পারছে না, তাই তাদের মনে শোকও জাগছে না। তার সামনে বা অন্যত্র তারা আর চোখের জল ফেলছে না, তাকে নিয়ে আলোচনাও করছে না। মনে মনে তারাও বুঝছে, নিজেদের বুকের কথাকে তারা মুখের কথায় প্রকাশ করতে পারবে না।
দুজনই দেখছে সে ধীরে ধীরে নিঃশব্দে মৃত্যুর গভীর থেকে গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে, দুজনই জানে যে এটা ঘটবেই, আর ঘটাই স্বাভাবিক।
সে দোষ স্বীকার করল, প্রার্থনা করল: সকলেই এসে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেল। ছেলেকে যখন তার কাছে নিয়ে গেল তখন সে বালকের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চুঁইয়ে মুখটা ফিরিয়ে নিল, কাজটা কষ্টকর ও দুঃখজনক বলে নয়, তার ধারণা যে শুধু এইটুকুই তার করণীয়, কিন্তু তাকে যখন ছেলেকে আশীর্বাদ করতে বলা হল তখন সে তাও করল, তারপর চারদিকে তাকাতে লাগল, যেন জানতে চাইল তার আর কিছু করণীয় আছে কি না।
আত্মা ছেড়ে যাবার সময় যখন দেহের শেষ খিচুনি দেখা দিল তখনো প্রিন্সেস মারি ও নাতাশা তার পাশেই ছিল।
চোখের সামনে দেহটা ঠাণ্ডা হয়ে এল, কয়েক মিনিটের জন্য একেবারে নিশ্চল হয়ে পড়ে রইল। প্রিন্সেস মারি বলল, সব কি শেষ হয়ে গেল? নাতাশা এগিয়ে গেল, মৃত চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দিল। চোখের পাতা বন্ধ করে দিল, কিন্তু তাতে চুমো না খেয়ে এই একান্ত প্রিয়জনটির শেষ স্মৃতি তার দেহটাকে জড়িয়ে ধরল।
ও কোথায় চলে গেল? এখন কোথায় আছে?…
দেহটাকে ধুয়ে-মুছে সাজিয়ে যখন টেবিলের উপর শবাধারে রাখা হল তখন সকলে এসে তার কাছ থেকে বিদায় নিল, সকলেই কাঁদতেই লাগল। ছোট নিকলাসও কাঁদল, কারণ বেদনাদায়ক বিহ্বলতায় তার অন্তরটা বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কাউন্টেস ও সোনিয়া কাঁদল নাতাশার প্রতি করুণায়, কারণ সে আর নেই। বুড়ো কাউন্ট কাঁদল, কারণ সে জানে যে অচিরেই তাকেও এই ভয়ংকর পথে পা বাড়াতে হবে।
এবার নাতাশা ও প্রিন্সেস মারিও কাঁদল কিন্তু সে কান্না নিজেদের দুঃখে নয়, তাদের চোখের সম্মুখে মৃত্যুর যে সরল গম্ভীর রহস্য উদঘাটিত হল তারই চেতনায় আবিষ্ট মনের শ্রদ্ধায় ও আবেগে তারা কাঁদতে লাগল।
১৩. মানুষের মন
ত্রয়োদশ পর্ব – অধ্যায়-১
মানুষের মন কখনো কোনো ঘটনার কারণসমূহের পুরোপুরি জানতে পারে না, অথচ জানবার বাসনা নিহিত আছে মানুষের মনের গভীরে। বহু কারণাংশের যেকোন একটিকেই যেখানে আলাদা করে দেখলে মনে হতে পারে তাদের জটিলতাকে বিচার করে না দেখে মানুষ কারণের কাছকাছি যেকোন একটি কারণাংশকেও মূল কারণ বলে ধরে নিয়ে বলে ওঠে: এটাই কারণ। ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম এবং সবচাইতে প্রাচীন অভিমত ছিল নানা দেবদেবীর ইচ্ছাকেই কারণ বলে গ্রহণ করা, আর তার পরে সে জায়গা নিয়েছিল তাদের ইচ্ছা যারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত-অর্থাৎ ইতিহাসের মহানায়ক যারা। কিন্তু যে-কোনো ঐতিহাসিক ঘটনাই তাতে অংশগ্রহণকারী জনসাধারণের কার্যাবলির ফল, সেই ঘটনার মূলে প্রবেশের চেষ্টা করলেই স্পষ্ট বোঝা যাবে যে ইতিহাসের মহানায়কদের ইচ্ছা জনসাধারণের কার্যাবলিকে নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং তার দ্বারাই বারবার নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। ঐতিহাসিক ঘটনার তাৎপর্যকে আমরা যেভাবেই বুঝি না কেন তাতে কিছু যায়-আসে না, তথাপি যে মানুষ বলে যে নেপোলিয়নের ইচ্ছানুসারেই পশ্চিমের মানুষগুলি পুব দিকে গিয়েছিল এবং যে মানুষ বলে যে এ ঘটনা ঘটবে বলেই ঘটেছিল, তাদের মধ্যে সেই একই পার্থক্য দেখা যায় যেমনটি দেখা যেত সেই দুটি দলের মধ্যে যাদের একদল বলত যে পৃথিবীটা স্থির আর অন্য সব গ্রহ তার চারদিকে ঘুরছে এবং অন্য দল বলত যে পৃথিবীকে কে ধরে আছে তা তারা জানে না, তবে একথা জানে যে নিদিষ্ট নিয়ম অনুসারেই পৃথিবী ও অন্যসব গ্রহের গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। সব কারণের সেরা কারণটি ছাড়া কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার আর কোনো কারণ নেই, থাকতে পারে না। কিন্তু ওইসব ঘটনাকে নিয়ন্ত্রিণ করবার মতো নিয়ম-কানুন আছে, আর তার, কিছু কিছু আমাদের জানাও বটে। কিন্তু সেই সব নিয়ম কানুনকে আবিষ্কার করা একমাত্র তখনই সম্ভব যখন কোনো একটি মানুষের ইচ্ছার মধ্যে সেই কারণকে খুঁজবার চেষ্টাকে আমরা সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করি, ঠিক যেভাবে মানুষ যখন পৃথিবীর স্থিরত্বের ধারণাকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করল একমাত্র তখনই গ্রহনিচয়ের গতিবিধির নিয়ম আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছিল।
