সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ডিনারের পরে আগের মতোই একটু জ্বরভাব হয়েছে, চিন্তার ধারা হয়ে উঠেছে অস্বাভাবিক রকমের স্বচ্ছ। সোনিয়া বসে আছে টেবিলের পাশে। প্রিন্স আন্দ্রু ঘুমে ঢুলছে। সহসা একটা আনন্দের অনুভূতি জাগল তার মনে।
আঃ, সে এসেছে! সে ভাবল।
আর সত্যি তাইঃ সোনিয়ার জায়গায় নিঃশব্দে এসে বসেছে নাতাশা।
যবে থেকে নাতাশা তার দেখাশোনা করতে শুরু করেছে তবে থেকেই তার উপস্থিতি সে সবসময়ই বুঝতে পারে। তার মুখের উপর থেকে মোমবাতির আলোটাকে আড়াল করে নাতাশা একটা হাতল-চেয়ারে বসে মোজা বুনছে। প্রিন্স আন্দ্রু একদিন কথাপ্রসঙ্গে বলেছিল, যেসব বুড়ি নার্স মোজা বোনে তাদের মতো রোগীর শুশ্রূষা কেউ করতে পারে না, মোজা বোনার মধ্যে একটা শান্তভাব আছে, সেই থেকেই নাতাশা মোজা বোনা শিখছে। তার হাতে সূচ চলছে দ্রুতগতিতে, তার চিন্তাম্বিত আনত মূর্তিটা দেখা যাচ্ছে। একটু নড়তেই সুতোর গোলাটা হাঁটুর উপর থেকে গড়িয়ে পড়ল। প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে একবার তাকিয়ে গোলাটা কুড়িয়ে নিয়ে সে আবার আগের জায়গায় গিয়ে বসল।
প্রিন্স আন্দ্রু শোয়া অবস্থাতেই নাতাশার দিকে তাকাল, বুঝতে পারল, একটা ভারি শ্বাস টানবার ইচ্ছা হওয়া সত্ত্বেও তা না করে খুব সাবধানে শ্বাস টানতে লাগল।
এয়ৎসা মঠে অতীতের কথাপ্রসঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রু নাতাশাকে বলেছিল, বেঁচে থাকলে এই ক্ষতের জন্য সে ঈশ্বরকে চিরদিন ধন্যবাদ দেবে, কারণ এই ক্ষতই তাদের দুজনকে আবার মিলিয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে তারা কোনোদিন ভবিষ্যতের কথা বলেনি।
নাতাশার দিকে তাকিয়ে ইস্পাতের সূচের শব্দ শুনতে শুনতে সে ভাবল, এ কি হতে পারে, না পারে না? এমন অদ্ভুতভাবে ভাগ্য আমাকে ওর কাছে নিয়ে এসেছে কি শুধু আমাকে মেরে ফেলবার জন্য? …এও কি সম্ভব যে জীবনের সত্যকে আমার কাছে প্রকাশ করা হয়েছে শুধু এটাই বোঝতে যে মিথ্যার পথেই আমি জীবনটাকে কাটিয়েছি? পৃথিবীর সবকিছুর চাইতে ওকে আমি বেশি ভালোবাসি। কিন্তু ওকে ভালোবেসে আমি কি করব? নিজের অজ্ঞাতেই তার মুখ হতে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে গেল।
সে শব্দ শুনে নাতাশা মোজাটা রেখে তার দিকে ঝুঁকল, হঠাৎ তার চকচকে চোখের দিকে চোখ পড়তেই আস্তে পা ফেলে তার কাছে গিয়ে ঝুঁকে দাঁড়াল।
তুমি কি ঘুমিয়েছ?
না, অনেকক্ষণ ধরে তোমাকে দেখছি। তোমার আসা আমি টের পেয়েছি। তুমি এলে যে মৃদু প্রশান্তির স্বাদ পাই তা আর কেউ দিতে পারে না।…সে এক আলো। সুখে আমার কাঁদতে ইচ্ছা করছে।
নাতাশা আরো কাছে এগিয়ে গেল। পরমানন্দে তার ঝিলমিল করছে।
নাতাশা, আমি তোমাকে বড় বেশি ভালোবাসি! পৃথিবীর অন্য সবকিছুর চাইতে বেশি।
আর আমি!–মুহূর্তের জন্য নাতাশা মুখটা ফিরিয়ে নিল। শুধাল, বড় বেশি বললে কেন।
কেন বড় বেশি?…আচ্ছা, তুমি কি মনে কর, তোমার মন কি বলে–আমি বাঁচব তো? তুমি কি মনে কর?
সে বিষয়ে তো আমি নিশ্চিত, সম্পূর্ণ নিশ্চিত! গভীর আগ্রহে তার দুটি হাত ধরে নাতাশা প্রায় চেঁচিয়ে বলল।
প্রিন্স আন্দ্রু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তাহলে কী ভালোই হত!নাতাশার হাতটা নিয়ে তাতে চুমো খেল।
নাতাশার মনে সুখের উচ্ছ্বাস, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল, এ চলবে না, আন্দ্রুকে শান্ত হয়ে থাকতে হবে।
আন্দ্রুকে চেপে রেখে বলল, কিন্তু তুমি ঘুমোওনি। ঘুমোতে চেষ্টা কর…দোহাই!
প্রিন্স আন্দ্রু তার হাতটা চেপে ধরে ছেড়ে দিল, নাতাশা ফিরে গিয়ে নিজের জায়গায় বসল। দুবার তার দিকে তাকাল, দুবার দেখল প্রিন্স আন্দ্রুর উজ্জ্বল চোখ দুটি তার দিকেই তাকিয়ে আছে। নাতাশা মোজা বোনায় মন দিল, স্থির করল শেষ না করা পর্যন্ত মুখ ফেরাবে না।
প্রিন্স আন্দ্রুও অচিরেই চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়ল। বেশিক্ষণ ঘুম হল না, হঠাৎই চমকে জেগে উঠল, সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে।
ঘুমোবার আগেও সে একথাই ভাবছিল–জীবন ও মৃত্যুর কথা, প্রধানত মৃত্যুর কথা। মনে হল, ক্রমেই সে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে।
ভালোবাসা ভালোবাসা কি? সে ভাবতে লাগল।
ভালোবাসা মৃত্যুকে বাধা দেয়। ভালোবাসাই জীবন। যা কিছু বুঝি, ভালোবাসি বলেই বুঝি। একমাত্র ভালোবাসাতেই সবকিছুর এক হয়। ভালোবাসাই ঈশ্বর, আর মরে যাওয়া মানেই আমি, সেই কিছুটা সান্ত্বনা পেল। কিন্তু সে তো চিন্তা মাত্র। তাতে কিসের যেন অভাব আছে, যথেষ্ট পরিষ্কার নয়, বড় বেশি একপেশে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, মস্তিষ্কের বোনা জাল। ফিরে এল আগেকার সেই উত্তেজনা ও অস্পষ্টতা। সে ঘুমিয়ে পড়ল।
স্বপ্ন দেখল, সেই ঘরেই সে ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ ও অক্ষত। নানা ধরনের সাধারণ মানুষ তার সামনে এল। সে তাদের সঙ্গে কথা বলল, নানা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আলোচনা করল। তার যেন কোথায় যাবার জন্য প্রস্তত হচ্ছে। প্রিন্স আন্দ্রু আবছাভাবে বুঝতে পারল, এসবই তুচ্ছ, আরো বড় কাজ তার হাতে আছে, কিন্তু সে কথা বলেই চলল, তার চুটকি কথায় সকলকে তাক লাগিয়ে দিল। ক্রমে সকলেই অলক্ষ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল, আর সব চাইতে বড় হয়ে দেখা দিল রুদ্ধদ্বার ঘরে আলোচনার যোগ্য একটি মাত্র প্রশ্ন। সে উঠে দাঁড়াল, দরজায় ছিটকিনি টেনে তালা লাগাতে এগিয়ে গেল। যথাসময়ে তালাটা লাগাতে পারবে কি না তার উপরেই সবকিছু নির্ভর করছে। তাড়াতাড়ি যেতে চেষ্টা করল, কিন্তু পা চলল না, বুঝতে পারল যে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করলেও সে যথাসময়ে দরজায় তালা লাগাতে পারবে না। একটা যন্ত্রণাদায়ক ভয় তাকে পেয়ে বসল। সে ভয় মৃত্যু-ভয়। মৃত্যু দুয়ারে দাঁড়িয়ে। কিন্তু যেই সে কোনোরকমে হামাগুড়ি দিয়ে দরজার দিকে এগোতে লাগল তখনই দরজার ওপারের সেই ভয়ংকর বস্তুটি দরজা ঠেলে জোর করে ঢুকতে চেষ্টা করল। কোনো মানুষ নয়-মৃত্যুই দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকছে, তাকে ঠেকিয়ে রাখতেই হবে। তালা লাগানো আর সম্ভব নয় বলে সে দরজা ঠেলে রাখার শেষ চেষ্টা করল, কিন্তু তার চেষ্টা বড়ই দুর্বল ও এলোমেলো, সেই ভয়ংকর পিছন থেকে দরজায় ধাক্কা দিল, দরজাটা খুলে আবার বন্ধ হয়ে গেল।
