সে কান্না দেখে প্রিন্স আন্দ্রু বুঝতে পারল, ছোট্ট নিকলাস এবার পিতৃহারা হবে সে চিন্তায়ই প্রিন্সেস মারি কাঁদছে। আপ্রাণ চেষ্টায় সে জীবনের পথে ফিরে আসতে চাইল, তাদের মতো করে সবকিছু দেখতে চাইল।
ভাবল, হ্যাঁ, এদের কাছে সেটা দুঃখের। কিন্তু কত সহজ, সরল।
আকাশের পাখিরা বীজ বোনে না, ফসলও কাটে না, তবু তোমাদের পরম পিতা তাদের আহার যোগায়, কথাগুলি সে নিজেকে বলল, আর প্রিন্সেস মারিকেও বলতে চাইল, কিন্তু না, ওরা বুঝবে না, কথাটা ওরা ওদের মতো করে নেবে। ওরা বুঝতে পারে না, যেসব অনুভূতিকে ওরা মূল্য দেয়-আমাদের সেইসব অনুভূতিই অপ্রয়োজনীয়। পরস্পরকে আমরা বুঝতে পারি না। সে চুপ করে রইল।
প্রিন্স আন্দ্রুর ছেলের বয়স সাত। একটু-আধটু পড়তে পারে, কিছুই জানে না। সেদিনের পর থেকে অনেক কিছুর ভিতর দিয়ে সে জীবন কাটিয়েছে, জ্ঞান লাভ করেছে, দেখেছে, অভিজ্ঞতা হয়েছে, কিন্তু পরবর্তীকালে যেসব বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী সে হয়েছে সেগুলি যদি সেদিন তার আয়ত্তে থাকত তাহলেও তার বাবা, মারি ও নাতাশার মধ্যে যে দৃশ্যটি অভিনীত হতে সে দেখেছে তার অর্থকে সেদিনের মতো আরো ভালোভাবে বা গভীরভাবে বুঝতে পারত না। সবকিছুই সে বুঝছে, না কেঁদে নাতাশার সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সে নীরবে তার দিকেই এগিয়ে গেল, সুন্দর চিন্তামগ্ন দুটি চোখ মেলে সলজ্জভাবে তার দিকে তাকাল, তার গোলাপি উপরের ঠোঁটটা কাঁপতে লাগল।
তারপর থেকেই সে দেসালেস ও কাউন্টেসকে এড়িয়ে চলতে লাগল, হয় একাকি বসে থাকে, নয়তো ভীরু পায়ে প্রিন্সেস মারি অথবা নাতাশার কাছে যায়, শান্ত লাজুক ভঙ্গিতে তাদের জড়িয়ে ধরে।
প্রিন্স আন্দ্রুর কাছ থেকে চলে যাবার পরে প্রিন্সেস মারি ভালোভাবেই বুঝতে পারল কি লেখা ছিল নাতাশার মুখে। আন্দ্রুকে বাঁচিয়ে তোলার কোনোরকম আশার কথা সে আর কোনোদিন নাতাশাকে বলেনি। নাতাশার সঙ্গে পাল্লা করে আর সোফার পাশে বসে থাকে, চোখের জল ফেলে না, অনবরত প্রার্থনা করে, একান্ত অন্তরে সেই শাশ্বত ও অপরিময়র দিকেই তাকিয়ে থাকে, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটির উপরে যার উপস্থিতির প্রভাব এখন অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
.
অধ্যায়-১৬
প্রিন্স আন্দ্রু জানে সে মরবে, শুধু তাই নয়, সে বুঝতে পারছে সে মরতে চলেছে, এখনই অর্ধমৃত। পার্থিব সবকিছু থেকে একটা দূরত্ব বোধ, অস্তিত্বের একটা বিচিত্র আনন্দময় হাল্কাভাবের চেতনা তাকে ঘিরে ধরেছে। কোনোরকম তাড়াহুড়া বা উত্তেজনা ছাড়াই আসন্ন মৃত্যুর জন্য সে অপেক্ষা করছে। যে দুর্লংঘ্য, শাশ্বত, অতিদূর, অজ্ঞাতের উপস্থিতি সে সারাজীবন অনুভব করেছে, আজ সে কাছে এসেছে, একটা বিচিত্র হাল্কা অভিজ্ঞতার মধ্যে সে যেন বোধগম্য হয়ে উঠছে…।
আগে আগে এই পরিণতিকে সে ভয় পেত। ভয়ংকর যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর-এই পরিণতির–অভিজ্ঞতা তার দুবার হয়েছে, কিন্তু এখন আর সেই ভয়কে সে বুঝতে পারছে না।
একটা গোলা যখন লাটিমের মতো তার সামনে পাক খাচ্ছিল তখনই প্রথম এই ভয় সে পেয়েছিল, শস্যহীন ক্ষেত, ঝোঁপঝাড় ও আকাশের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পেরেছিল যে সে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে। আহত হবার পরে আবার যখন নিজেকে ফিরে পেল, জীবনের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে শাশ্বত, চিরমুক্ত ভালোবাসার কমলটি যখন মুহূর্তের মধ্যে তার অন্তরের মধ্যে প্রস্ফুটিত হয়েছিল, তখন আর তার মৃত্যুর ভয় রইল না, মৃত্যুর চিন্তাই সে ছেড়ে দিল।
আহত হবার পরে সে যখন নির্জনতা, যন্ত্রণা ও আংশিক বিকারের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল তখন সদ্য প্রকাশিত শাশ্বত প্রেমের মধ্যে সে যতই ডুব দিচ্ছিল ততই নিজের অজ্ঞাতে সে পার্থিব জীবন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছিল। সবকিছুকে, সকল জীবকে ভালোবাসা, ভালোবাসার জন্য প্রতিনিয়ত নিজেকে বিসর্জন দেওয়ার অর্থ কোনো একজনকে ভালোবাসা নয়, পার্থিব জীবনটাকে চালিয়ে যাওয়া নয়। ভালোবাসার এ রীতিতে সে যতই উদ্বুদ্ধ হতে লাগল ততই সে জীবনকে পরিহার করে চলল, ততই জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী প্রাচীরটাকে সে ভেঙে ফেলতে লাগল। সেই সময়ে মৃত্যুর চিন্তা মনে এলেই সে নিজেকে বলত, আরে, তাতে কি হল? সে তো আরো ভালো!
কিন্তু মিতিশচির সেই রাতে অর্ধ বিকারের মধ্যে সে যখন সেই বহুবাঞ্ছিতাকে সামনে দেখতে পেল, তার ঠোঁটের উপর নিজের হাতটা রেখে সেই নারী যখন সুখের অশ্রু ঝরাল চোখে, তখন নিজের অলক্ষ্যেই একটি নারীর প্রতি ভালোবাসা আবার তার অন্তরের মধ্যে প্রবেশ করল, আবার তাকে বেঁধেছিল জীবনের সঙ্গে। একটা সানন্দ উদ্বিগ্ন চিন্তা তার মনে বাসা বাঁধল। অ্যাম্বুলেন্স ঘাঁটিতে কুরাগিনের সঙ্গে দেখা হাবার মুহূর্তটি স্মরণ করতে গিয়ে তখন তার মনের ভাব কি রকম হয়েছিল তা সে মনে করতে পারে না, কিন্তু কুরাগিন বেঁচে আছে কি না সে চিন্তা তাকে কষ্ট দিয়েছিল। সে সম্পর্কে খোঁজ নেবার সাহস পর্যন্ত তার হয়নি।
তার অসুস্থতা স্বাভাবিক গতিতেই চলছিল, কিন্তু এটা হঠাৎ ঘটল বলতে গিয়ে নাতাশা যে অবস্থার কথা উল্লেখ করেছে সেটা ঘটেছে প্রিন্সেস মারি আসার দুদিন আগে। জীবন ও মৃত্যুর সেই শেষ আত্মিক সগ্রামে মৃত্যুই বিজয়ী হয়েছে। তার থেকে এই অপ্রত্যাশিত উপলব্ধি তার হয়েছে, যে-জীবন নাতাশার প্রতি ভালোবাসার রূপ ধরে তার কাছে উপস্থিত হয়েছে তাকে সে এখনো মূল্যবান মনে করে, আর তাই অজ্ঞাতপূর্ব একটা আতংক তাকে আক্রমণ করেছে।
