তার মুখখানি দেখে, চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে প্রিন্সেস মারির গতি সহসা শিথিল হয়ে এল, তার মনে হল, চোখের জল শুকিয়ে গেছে, চাপা কান্না থেমে গেছে। তার চোখ-মুখের ভাষা বুঝতে পেরে সহসা নিজেকে বড়ই অপরাধী মনে হল, একটা ভীরুতা তাকে ঘিরে ধরল।
নিজেকেই শুধাল, কিন্তু কিসে আমি অপরাধী? আর ঠাণ্ডা, কঠোর দৃষ্টি যেন জবাব দিল, কারণ তুমি বেঁচে আছে, জীবিতের কথা ভাবছ, আর আমি…।
তার যে গভীর দৃষ্টি বাইরের পরিবর্তে ভিতরটাকেই দেখতে পায় তাতে ফুটে উঠেছে একটা বিরূপতার আভাস।
বোনের হাতটা নিয়ে তাতে চুমো খেল।
দৃষ্টির মতোই শান্ত ও নিস্পৃহ গলায় বলল, কেমন আছ মারি? এখানেই বা এলে কেমন করে?
আন্দ্রুর গলার স্বর শুনে প্রিন্সেস মারি হতবাক হয়ে গেল। সে যদি যন্ত্রণায় চিৎকার করত তাহলে সে চিৎকারও বুঝি প্রিন্সেস মারি বুকে এতখানি ত্রাসের সঞ্চার করতে পারত না।
সেই একই ধীর, শান্ত গলায় সে আবার বলল, ছোট্ট নিকলাসকে সঙ্গে করে এনেছ কি?
এখন কেমন আছ? প্রশ্নটা করে প্রিন্সেস মারি নিজেই অবাক হয়ে গেল।
সেটা তুমি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করো, সে জবাব দিল। পুনরায় স্নেহশীল হবার চেষ্টায় শুধু ঠোঁট দুটি নেড়েই সে ফরাসিতে বলল :
এখানে আসার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।
প্রিন্সেস মারি তার হাতটা চেপে ধরল। সে চাপে আর মুখটা ঈষৎ কুঞ্চিত হল। আন্দ্রু চুপ, প্রিন্সেসও জানে না কি বলবে। এখন সে বুঝতে পেরেছে দুদিন আগে আর কি হয়েছে। আন্দ্রুর কথায়, গলার স্বরে, বিশেষ করে তার শান্ত বিরূপ দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে পৃথিবীর সবকিছু থেকে বিচ্ছেদ, আর একটি জীবিত মানুষের বেলায় সেটা বড়ই ভয়ংকর। স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে, অনেক চেষ্টা করে তবে সে জীবিতকে বুঝতে পারছে, কিন্তু আসলে সে বুঝতে পারছে না, বুঝবার শক্তি নেই বলে নয়, আসল কারণ সে বুঝেছে অন্য কিছু–এমন কিছু যাকে জীবিতরা বোঝে না, বুঝতে পারে না-সেই বোধই এখন তার মনকে ভরে রেখেছে।
নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে নাতাশাকে দেখিয়ে সে বলল, দেখ, কী বিচিত্র পথে ভাগ্য আবার আমাদের মিলিয়ে দিয়েছে। সে তো সারাক্ষণই আমার দেখাশোনা করছে।
প্রিন্সেস মারি কথাগুলি শুনল, কিন্তু এসব কথা আন্দ্রু বলছে কেমন করে তা সে বুঝতে পারল না। সে অনুভূতিশীল, মমতাময় প্রিন্স আন্দ্রু-কেমন করে তার সামনেই এসব কথা তাকেই বলতে পারল যাকে সে ভালোবাসে আর যে তাকে ভালোবাসে? তার যদি জীবনের আশা থাকত তাহলে এমন আপত্তিজনক সুরে এই কথাগুলি সে বলতে পারত না। সে যদি না জানত যে সে মরতে চলেছে তাহলে সে কি ওকে করুণা না করে পারত? ওর সামনে এমন কথা বলতে পারত? এর একমাত্র ব্যাখ্যা সে আজ উদাসীন, কারণ অন্য কিছু, অনেক বেশি গুরুত্ত্বপূর্ণ কিছু, তার কাছে আত্মপ্রকাশ করেছে।
আলোচনা হতে লাগল নিস্পৃহ ও অসংলগ্নভাবে, মাঝে মাঝেই বাধা পড়ল।
মারি এসেছে রিয়াজানের পথে, নাতাশা বলল।
সত্যি? আন্দ্রু শুধাল।
ওরা বলছে যে গোটা মস্কো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, আর…
নাতাশা থেমে গেল। কথা বলা অসম্ভব। বোঝা যাচ্ছে যে আ মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না।
আন্দ্রু বলল, হ্যাঁ, সকলেই তাই বলছে। বড়ই দুঃখের কথা। অন্যমনস্কভাবে আঙুল দিয়ে গোঁফে টোকা দিতে দিতে সে সামনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
তারপর যেন দুজনের সঙ্গে ঘরোয়াভাবে কথা বলার বাসনাতেই প্রিন্স আন্দ্রু হঠাৎ বলে উঠল, তাহলে কাউন্ট নিকলাসের সঙ্গে তোমার দেখা হল মারি? সে তো এখানে লিখেছে, যে তোমাকে তার খুব পছন্দ। তোমারও যদি তাকে ভালো লেগে থাকে তাহলে তো তোমাদের বিয়ে হলে বেশ ভালোই হয়।
প্রিন্সেস মারি তার কথাগুলি শুনল, কিন্তু জীবিত সবকিছু থেকে সে যে এখন কতদূরে চলে গেছে তারই প্রমাণ ছাড়া কথাগুলির মধ্যে তার কোনো অর্থই সে খুঁজে পেল না।
আমার কথা কেন বলছ? শান্তভাবে বলে মারি নাতাশার দিকে তাকাল।
নাতাশা বুঝতে পারল, কিন্তু মারির দিকে তাকাল না। তিনজনই আবার নিশ্চুপ।
প্রিন্সেস মারি হঠাৎ কাঁপা গলায় বলে উঠল, আন্দু, ছোট্ট নিকলাসকে দেখবে না? সে তো সবসময় তোমার কথা বলে।
প্রিন্স আন্দ্রু এই প্রথম একটুখানি হাসল, কিন্তু প্রিন্সেস মারি তো তার মুখকে ভালোভাবেই চেনে, সে সভয়ে প্রত্যক্ষ করল, সুখের জন্য বা ছেলের প্রতি স্নেহবশত আন্দ্রু হাসেনি, হেসেছে শান্ত শ্লেষে, কারণ তার মনে হয়েছে যে তাকে জাগিয়ে রাখবার শেষ চেষ্টা হিসেবেই প্রিন্সেস কথাগুলি বলেছে।
হ্যাঁ, তাকে দেখলে আমি খুশি হব। সে বেশ ভালো আছে তো?
ছোট্ট নিকলাসকে যেখন প্রিন্স আন্দ্রুর ঘরে আনা হল তখন সে ভয়ার্ত চোখে বাবার দিকে তাকাল, কিন্তু কাঁদল না, কারণ আর কেউই কাঁদছে না। প্রিন্স আন্দ্রু তাকে চুমো খেল, কিন্তু কি কথা তাকে বলবে তা বুঝতে পারল না।
নিকলাসকে বাইরে নিয়ে যাবার পরে প্রিন্সেস মারি আবার দাদার কাছে গেল, তাকে চুমো খেল, কিন্তু এবার আর চোখের জল রোধ করতে পাল না, কাঁদতে লাগল।
প্রিন্স আন্দ্রু একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
বলল, নিকলাসের জন্য কাঁদছ?
প্রিন্সেস মারি মাথা নেড়ে কাঁদতেই লাগল।
মারি, তুমি কি সুভাষিতাবলী… প্রিন্স আন্দ্রু থেমে গেল।
কি বললে?
কিছু না। এখানে তুমি কেঁদ না, সেই একই নিস্পৃহভাবে প্রিন্সেস মারির দিকে তাকিয়ে সে বলল।
