প্রিন্সেস মারি সোনিয়ার দিকে তাকাল, মনের বিরূপ অনুভূতিকে চাপা দেবার চেষ্টা করে তাকে চুমো খেল। কিন্তু এখানকার সকলের মনের অবস্থাই তার থেকে আলদা দেখে তার খুব কষ্ট হতে লাগল।
সকলের দিকে ফিরে সে আবার শুধাল, সে কোথায়?
সোনিয়া লজ্জায় লাল হয়ে বলল, তিনি নিচে আছেন। নাতাশা তার কাছে আছে। তার কাছে লোক পাঠানো হয়েছে। আপনাকে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে প্রিন্সেস।
বিরক্তিতে প্রিন্সেস মারির চোখে জল এসে গেল। মুখ ঘুরিয়ে কাউন্টেসকে আবার জিজ্ঞাসা করতে যাবে কীভাবে তার কাছে যাবে, এমন সময় দরজায় পায়ের শব্দ শোনা গেল। ঘুরে তাকিয়ে প্রিন্সেস দেখল নাতাশা প্রায় ছুটে আসছে–অনেকদিন আগে মস্কোতে যাকে দেখে তার মোটেই ভালো লাগেনি সেই নাতাশা।
কিন্তু নাতাশার মুখের দিকে তাকিয়েই সে বুঝতে পারল যে এতক্ষণে একজন সমব্যথী সে পেয়েছে, এই তো বন্ধু। প্রিন্সেস ছুটে নাতাশার কাছে গেল, তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে লাগল।
প্রিন্স আন্দ্রুর বিছানার মাথার কাছে বসে প্রিন্সেস মারির আসার সংবাদ শোনামাত্রই সে ছুটে এখানে চলে এসেছে।
ছুটতে ছুটতে সে যখন বৈঠকখানায় ঢুকল তখন তার উত্তেজিত মুখে শুধু একটি লক্ষণই ফুটে উঠেছে-ভালোবাসার লক্ষণ-সীমাহীন ভালোবাসা-প্রিন্স আন্দ্রুর প্রতি, প্রিন্সেস মারির প্রতি, তার প্রেমিকের যারাই নিকটজন তাদের প্রতি, সে মুখে আরো ফুটে উঠেছে করুণা, অন্যের জন্য কষ্টস্বীকার এবং অপরের সেবায় নিজেকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করার একান্ত বাসনা। এই মুহূর্তে নাতাশার অন্তরে নিজের চিন্তা অথবা প্রিন্স আন্দ্রুর সঙ্গে তার সম্পর্কের চিন্তার কোনো স্থান নেই।
নাতাশার মুখের উপর প্রথম দৃষ্টিপাতের ফলেই তীক্ষ্ম অনুভূতিসম্পন্না প্রিন্সেস মারি এসব কথা বুঝতে পেরেছে, তাই তো তার কাঁধে মাথা রেখে দুঃখের সুখে সে কাঁদছে।
চল, ওর কাছে চল মারি, বলেই নাতাশ তাকে অন্য ঘরে নিয়ে চলল।
প্রিন্সেস মারি মাথা তুলে চোখ মুছে নাতাশার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। সে বুঝল, এর কাছ থেকেই সে সবকিছু জানতে ও বুঝতে পারবে।
কেমন..প্রশ্ন করতে গিয়েও সে থেমে গেল।
তার মনে হল, কথায় প্রশ্ন করা বা জবাব দেওয়া দুইই অসম্ভব। নাতাশার চোখ-মুখই তাকে সব কথা পরিষ্কারভাবে, গভীরভাবে বুঝিয়ে দেবে।
নাতাশা তার দিকে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে ভয় পেয়েছে, ইতস্তত করছে সব কথা বলবে কি না। হঠাৎ নাতাশার ঠোঁট দুটি কুঁকড়ে উঠল, মুখের চারদিকে বিশ্রী ভাঁজ দেখা দিল, দুই হাতে মুখ ঢেকে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
প্রিন্সেস মারি সব বুঝতে পারল।
তবু আশা ছাড়ল না, সেকথার উপর তার নিজেরই ভরসা নেই সে কথায়ই প্রশ্ন করলঃ কিন্তু তার ঘাটা কেমন আছে? সাধারণ অবস্থাই বা কেমন?
তুমি, তুমি,…নিজেই দেখতে পাবে নাতাশা এর বেশি কিছু বলতে পারল না।
দুজনই আরো কিছুক্ষণ নিচেই বসে রইল, তারপর কান্না থামলে শান্ত মুখে তার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
সমস্ত রোগটা কি অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। তার অবস্থা কি অনেকদিন থেকেই খারাপ? কখন এরকম হল? প্রিন্সেস মারি একে একে খোঁজ নিতে লাগল।
নাতাশা বলল, জ্বর ভাব ও যন্ত্রণার জন্য বেশ বিপদ দেখা দিয়েছিল, কিন্তু ত্রয়েৎসায় এসে সেটা কেটে গেল, তখন ডাক্তার শুধু গ্যাংগ্রিনের আশংকা করতে লাগল। সে বিপদও কেটে গেছে। ইয়ারোস্লাভল আসার পর থেকে ক্ষতস্থানে পুঁজ হতে শুরু করল, তবে ডাক্তার বলল যে এটা স্বাভাবিক পথেই মোড় নেবে। তারপর দেখা দিল জ্বর, কিন্তু ডাক্তার বলেছে যে জ্বরটা গুরুতর কিছু নয়।
উদগত কান্নাকে চাপা দিয়ে নাতাশা বলল, কিন্তু দুদিন আগে হঠাৎ এটা ঘটেছে। কেন তা জানি না, কিন্তু
সে কি খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। শুকিয়ে গেছে? প্রিন্সেস জানতে চাইল।
না, ঠিক তা নয়, আরো খারাপ। নিজেই দেখবে। ও মারি, সে এত ভালো, সে বাঁচতে পারে না, বাঁচতে পারে না, কারণ…
.
অধ্যায়-১৫
পরিচিত ভঙ্গিতে প্রিন্স আন্দ্রুর দরজাটা খুলে নাতাশা যখন তার আগে আগে প্রিন্সেস মারিকে ঘরে ঢুকতে দিল, তখন প্রিন্সেসের বুকের ভিতর থেকে একটা চাপা কান্না ঠেলে উঠছে। অনেক চেষ্টা করে এখন নিজেকে কিছুটা শান্ত করলেও সে জানে যে দাদাকে দেখে সে চোখের জল রাখতে পারবে না।
দুদিন আগে হঠাৎ এটা ঘটেছে, এই কথার দ্বারা নাতাশা কি বোঝাতে চেয়েছিল প্রিন্সেস তা বুঝতে পেরেছে। কথাগুলির অর্থ, সে হঠাৎ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, এভাবে নরম হয়ে যাওয়া, শান্ত হয়ে যাওয়া আসন্ন মৃত্যুর লক্ষণ। দরজায় পা রাখতে গিয়েই কন্নায় সে আর ছেলেবেলার মুখখানি যেন দেখতে পেল। সে নিশ্চিত জানে, মৃত্যুর আগে তার বাবা যেমন বলেছিল আন্দ্রুও তেমনই নরম, মমতাভরা স্বরে তার সঙ্গে কথা বলবে, আর সেও তা সহ্য করতে না পেরে তার সামনেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠবে। কিন্তু আগে হোক পরে হোক, ঘরে তো ঢুকতে হবেই, সে ভিতরে গেল। আন্দ্রুকে যতই স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছে, নিজের ক্ষীণ দৃষ্টিতে যতই তার চোখ-মুখ পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠছে, ততই চাপা কান্না তার গলা বেয়ে ঠেলে উপরে উঠে আসছে, তারপরই তার মুখটা সে দেখতে পেল, তার চোখে চোখ পড়ল।
কাঠবেড়ালের লোমের ড্রেসিং-গাউন পরে চারদিকে বালিশ রেখে সে একটা ডিভানে শুয়ে আছে। শীর্ণ, বিবর্ণ চেহারা। সরু, সাদা একটা হাতে একখানা রুমাল, অন্য হাতে নবোদগত গোঁফে আস্তে আস্তে টোকা দিচ্ছে, ধীরে ধীরে আঙুলগুলি নড়ছে। তারা ঘরে ঢুকতেই একদৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
