মস্কোর ভিতর দিয়ে প্রচলিত পথে যাওয়ার কথা ভাবাই যায় না। প্রিন্সেস মারিকে বাধ্য হলে লিপেৎক্ত, রিয়াজান, ভাদিমির ও শুয়ার ভিতর দিয়ে যে ঘোরা পথটা বেছে নিতে হল সেটা খুব দীর্ঘ, আর সে পথের সব জায়গায় ডাক-ঘোড়া পাওয়া যায় না বলে খুবই কষ্টসাধ্য, আর যেহেতু রিয়াজনের কাছে ফরাসিরা দেখা দিয়েছে সেজন্য পথটা বিপজ্জনকও বটে।
এই কষ্টকর পথযাত্রায় প্রিন্সেস মারির উদ্যম ও মনের জোর দেখে মাদময়জেল বুরিয়ে, দেসালেস ও চাকরবাকররা অবাক হয়ে গেছে। সকলের পরে সে শুতে যায়, আর ঘুম থেকে ওঠে সকলের আগে, কোনো কষ্টই তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। তার উদ্যম ও কর্মশক্তির ফলেই দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষ নাগাদ তারা ইয়ারোস্লাভলের কাছে পৌঁছে গেল।
ভরোনেঝে শেষের দিন কয়টা ছিল তার জীবনের সব চাইতে সুখের দিন। রস্তভের প্রতি ভালোবাসা আর তাকে যন্ত্রণা দেয় না, বিচলিত করে না। সে ভালোবাসা তার সারা মন জুড়ে আছে, তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, তার বিরুদ্ধে সে আর এখন লড়াই করে না। স্পষ্ট করে নিজেকে না বললেও ইদানীং তার দৃঢ় প্রত্যয় জন্মেছে যে সে ভালোবেসেছে এবং ভালোবাসা পেয়েছে।
কিন্তু মনের একদিককার এই সুখ দাদার জন্য দুঃখবোধের পথে কোনোরকম বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, উপরন্ত, মনের এই প্রশান্তির ফলে দাদার প্রতি মনোভাবকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করা তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে।
ভ্রমণের সময় যেরকম ঘটে থাকে, প্রিন্সেস মারি শুধু যাত্রার কথাই ভাবতে লাগল, উদ্দেশ্যটা ভুলে রইল। কিন্তু ইয়ারোস্লাভলের যত কাছে এগোতে লাগল ততই সন্ধ্যার মধ্যেই যে দৃশ্যের সম্মুখীন তাকে হতে হবে তার চিন্তা নতুন করে মনে জাগল, তার উত্তেজনাকে চরমে তুলে দিল।
রস্তভরা কোথায় আছে এবং প্রিন্স আন্দ্রু কেমন আছে তা জানবার জন্য সংবাদবাহকটাকে আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বড় গাড়িটা শহরের ফটক দিয়ে ঢুকলে প্রিন্সেস মারি যখন জানালা দিয়ে মুখটা বের করল তখন তার মুখের ভয়ংকর ফ্যাকাসে ভাব দেখে লোকটি ভয় পেয়ে গেল।
বলল, সব খোঁজ নিয়েছি ইয়োর এক্সেলেন্সিঃ রস্তভরা আছেন স্কোয়ারের ভিতরে বণিক ব্রোনিকভের বাড়িতে, এখান থেকে বেশি দূর নয়, ভলগার একেবারে দক্ষিণ তীরে।
প্রিন্সেস মারি সভয়ে তার দিকে তাকাল, যেকথা সে সব চাইতে বেশি করে জানতে চাইছে তার জবাব লোকটি দিচ্ছে না কেন : তার দাদা কেমন আছে? মাদময়জেল বুরিতেঁই প্রশ্নটা করল।
প্রিন্স কেমন আছেন?
হিজ এক্সেলেন্সি তাদের সঙ্গে এক বাড়িতেই আছেন।
তাহলে বেঁচে আছে, এই কথা ভেবে বলল, সে কেমন আছে?
চাকররা বলছে, একই রকম।
একই রকম মানে কি সেটা প্রিন্সেস মারি জিজ্ঞাসা করল না, সকলের অলক্ষ্যে সাত বছরের নিকলাসের দিকে একবার তাকিয়ে সেই যে মাথা নিচু করল, ভারি গাড়িটা দুলে দুলে ঝাঁকুনি দিতে দিতে সশব্দে চলতে চলতে না থামা পর্যন্ত আর সে মাথা তুলল না। ঝনঝন শব্দে গাড়ির সিঁড়িটা নামিয়ে দেওয়া হল।
গাড়ির দরজা খুলে গেল। বাঁ দিকে জল-একটা বড় নদী–ডান দিকে বারান্দা। ফটকে অনেকে দাঁড়িয়ে আছেঃ চাকরবাকর, আর একটি গোলাপি মেয়ে, মেয়েটি যেন মুখ ভার করে হাসছে। (মেয়েটি সোনিয়া)। প্রিন্সেস মারি সিঁড়ি বেয়ে ছুটে চলল। মেয়েটি তেমনই কৃত্রিম হাসির সঙ্গে বলে উঠল, এই পথে, এই পথে! হলে ঢুকে প্রিন্সেস সামনেই দেখতে পেল প্রাচ্য দেশীয় চেহারার একটি বর্ষীয়সী মহিলাকে। মহিলাটি দ্রুত তার দিকে এগিয়ে গেল। কাউন্টেস।
প্রিন্সেস মারিয়াকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেল।
ফরাসিতে বলল, বাছা আমার! তোমাকে কত ভালোবাসি, কতদিন হল তোমার কথা শুনিছ, জানছি।
প্রিন্সেস মারি বুঝতে পারল ইনিই কাউন্টেস, এঁর সঙ্গে কিছু বলা দরকার। ফরাসিতে কিছু সৌজন্যসূচক কথা বলে সে শুধালঃ ও কেমন আছে?
ডাক্তার বলছে আর কোনো বিপদ নেই, কথাগুলি মুখে বললেও দীর্ঘশ্বাস ফেলে এমনভাবে চোখ তুলে তাকাল যাতে তার কথার প্রতিবাদই বুঝি প্রকাশ পেল।
প্রিন্সেস বলল, সে কোথায়? আমি কি তাকে দেখতে পারি–দেখতে পারি?
একটু দেরি কর প্রিন্সেস, একটু। এটি বুঝি তার ছেলে? দেসেলেসের সঙ্গে ঘরে ঢুকতেই ছোট্ট নিকলাসকে দেখিয়ে কাউন্টেস বলল। বাড়িটা বেশ বড়, সকলেরই জায়গা হয়ে যাবে। আহা, কী চমৎকার ছেলেটি!
কাউন্টেস প্রিন্সেস মারিকে নিয়ে বৈঠকখানায় গেল। সেখানে সোনিয়াও মাদময়জেল বুরিয়ে গল্প করছিল। কাউন্টেস ছেলেটিকে আদর করতে লাগল, আর বুড়ো কাউন্ট এসে প্রিন্সেসকে স্বাগত জানাল। প্রিন্সেস মারি যখন তাকে সর্বশেষ দেখেছিল তারপর থেকে বুড়ো কাউন্ট অনেক বদলে গেছে। তখন সে ছিল চটপটে, ফুর্তিবাজ, আত্মপ্রত্যয়শীল একটি বৃদ্ধ, আর এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে একটি করুণ, বিভ্রান্ত মানুষ। প্রিন্সেস মারির সঙ্গে কথা বলার সময় সে অনবরত চারদিকে তাকাচ্ছে, যেন জানতে চাইছে তার ব্যবহার ঠিক হচ্ছে কি না। মস্কোর ধ্বংস এবং তার সম্পত্তি নষ্ট হয়ে যাবার পরে অভ্যস্ত আশ্রয় থেকে সরে এসে সে যেন নিজের গুরুত্ববোধটাই হারিয়ে ফেলেছে, যেন ধরেই নিয়েছে জীবনে তার আর কোনো স্থান নেই।
সোনিয়ার পরিচয় দিয়ে বলল, এটি আমার জ্ঞাতি বোন-ঝি-তোমার সঙ্গে ওর পরিচয় নেই প্রিন্সেস?
