পরবর্তীকালে সেই দিনগুলির কথা মনে হলে আর সবকিছুই অস্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়, একমাত্র প্রাতন কারাতায়েভ ছাড়া, তার মনে প্লাতনের মূর্তিটি সর্বদাই বিরাজ করছে অত্যন্ত স্পষ্ট এক মূল্যবান স্মৃতি হয়ে, রাশিয়ার যা কিছু ভালো ও অখণ্ড তারই প্রতিমূর্তি হয়ে। পরদিন ভোরে পিয়ের যখন তার সেই পার্শ্ববর্তী লোকটিকে দেখল তখন সর্বপ্রথম তার মনে জাগল একটা অখণ্ডতার আভাস : কোমরে দড়ি দিয়ে বাঁধা ফরাসি ওভারকোট, সৈনিকের টুপি ও কাঠের জুতো পরিহিত প্লাতনের গোটা শরীরটাই যেন এক অখণ্ডতার প্রতিমূর্তি। তার মাথাটা অখণ্ড, তার পিঠ, বুক, ঘাড়, এমন কি সর্বদা আলিঙ্গন-উনুখ দুই প্রসারিত হাত, তার স্মিত হাসি এবং বড় বড় শান্ত দুটি বাদামি চোখ–সবই অখণ্ড।
একজন বুড়ো সৈনিকের ভঙ্গিতে নিজের যেসব অভিযানের কথা সে বলেছে তা থেকেই বোঝা যায় তার বয়স পঞ্চাশ হয়েছে। সে নিজে তার বয়স জানে না, সেটা স্থির করতেও অপারগ। কিন্তু তার ঝকঝকে, উজ্জ্বল, সাদা দুই পাটি অর্ধবৃত্তাকার দাঁত যেমন সুস্থ তেমনই মজবুত, তার দাড়িতে বা মাথায় একটাও সাদা চুল নেই, তার সারা দেহে নমনীয়তা, দৃঢ়তা ও কষ্টসহিষ্ণুতার আভাস।
গ্রেপ্তার হবার পরে প্রথম কয়েকদিন তার শারীরিক শক্তি ও কর্মপটুতা এত বেশি ছিল যে ক্লান্তি ও রোগ কাকে বলে তাই সে জানত না। প্রতি রাতে শোবার আগে সে বলত: প্রভু, আমাকে শুইয়ে দাও পাথরের মতো, আর জাগিয়ে তোল একটুকরো পাউরুটির মতো। আর প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বলত : আমি শুয়েই কুঁকড়ে গিয়েছিলাম, জেগে উঠেই গা ঝাড়া দিয়েছি। সত্যি, শোয়ামাত্রই সে ঘুমিয়ে পড়ত পাথরের মতো, আর শরীরটাকে একবার ঝাড়া দিয়েই মুহূর্তের মধ্যে কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে যেত, ঠিক ছোট ছেলেরা যেমন ঘুম থেকে উঠেই খেলার জন্য তৈরি হয়ে যায়। সব কাজই সে করতে পারত, খুব ভালো না পারলেও মন্দও নয়। সে রুটি সেঁকত, রান্না করত, সেলাই করত, জুতো মেরামত করত। সবসময়ই কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত, গল্প করত আর গান গাইত শুধু রাতে। শিক্ষিত গায়কের মতো সে গাইত না, গাইত পাখির মতো যখন যেভাবে খুশি।
বন্দি হবার পরে তার মুখে দাড়ি গজাল, মনে হল সামরিক ও অন্য যা কিছু তার চরিত্রের বিপরীত সে সবকিছু ঝেড়ে ফেলে সে ফিরে গেছে তার আগেকার চাষীর জীবনে।
এবার সৈনিকের ছুটি-শার্ট থাকছে ব্রিচেসের বাইরে, সে বলত।
সৈনিক জীবনের কথা বলতে তার ভালো লাগত না, অবশ্য সে সম্পর্কে কোনো অভিযোগও তার ছিল না, প্রায়ই বলত যে সারা সৈনিক জীবনে মাত্র একবার তাকে চাবুক খেতে হয়েছে। যখনই কিছু বলত নিজের খ্রিস্টিয় জীবনের (চাষীর জীবনকে সে ঐ নামেই উল্লেখ করত) পুরনো ও মূল্যবান স্মৃতির কথাই বলত।
অন্য সব বন্দিদের কাছে প্লাতন কারাতায়েভ নেহাত্র একজন অতি সাধারণ সৈনিক। তারা তাকে ডাকত ছোট বাজপাখি অথবা প্লাতোশা বলে তাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করত, নানা কাজে পাঠাত। কিন্তু পিয়েরের কাছে সে রয়ে গেল প্রথম রাতের দেখা সেই একই মূর্তিঃ সরলতা ও সত্যের এক অপরিমেয় অখণ্ড, শাশ্বত প্রতিমূর্তি।
একমাত্র প্রার্থনা ছাড়া প্লাতন কারাতায়েভ অন্য কিছুই মুখস্থ রাখতে পারত না। কথা বলতে আরম্ভ করে কীভাবে যে শেষ করবে তাও জানত না।
তার কথার অর্থে চমকে উঠে পিয়ের মাঝে মাঝে তাকে কথাটা আর একবার বলতে অনুরোধ করত, কিন্তু একমুহূর্ত আগে যে কথাগুলি বলছে প্লাতন আর একবার তা বলতে পারত না। তার প্রিয় গানঃ স্বদেশ, বার্চগাছ ও আমার রুগ্ন হৃদয়-এর কথাগুলিও সে পিয়েরকে আলাদা করে বলতে পারত না, বললেও গানের বাইরে সে কথাগুলির কোনো অর্থই খুঁজে পাওয়া যেত না। তার প্রতিটি কথা ও কাজই অজ্ঞাত এক কর্মধারার বহিঃপ্রকাশ–সেই কর্মধারা তারই জীবন। কিন্তু তার জীবনের তো আলাদা করে কোনো অর্থ নেই। এক অখণ্ড সত্তার অংশ হিসেবেই তো তার যার কিছু অর্থ। ফুলের ভিতর থেকে যেমন ভেসে আসে গন্ধ, তেমনই তার কথা ও কাজ তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে অনিবার্য স্বাভাবিকতায়। আলাদা করে কোনো একটি কথা বা কাজের কোনো মূল্য বা তাৎপর্য সে বুঝতে পারে না।
.
অধ্যায়–১৪
প্রিন্সেস মারি যখন নিকলাসের কাছে শুনল যে তার দাদা ইয়ারোস্লাভলে রস্তভদের বাড়িতে আছে তখনই সে সেখানে যাবার জন্য প্রস্তুত হল, মাসির কোনো নিষেধই শুনল না, শুধু নিজে নয়, ভাইপোটিকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে বলে স্থির করল। একাজটা কঠিন কি সহজ, সম্ভব কি অসম্ভব, তা সে কাউকে জিজ্ঞাসা করল না, জানতেও চাইল না, দাদা মৃত্যুর পথে, এ সময় তার কাছে থাকা এবং তার ছেলেকে তার কাছে নিয়ে যাওয়া তার কর্তব্য, তাই সে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল। প্রিন্স আন্দ্রু যে নিজে তাকে কিছুই জানায়নি তার কারণ হিসেবে সে ভাবল, হয় তো অত্যধিক দুর্বলতার জন্য সে নিজে চিঠি লিখতে পারছে না, অথবা এই দীর্ঘ পথযাত্রা তার পক্ষে এবং দাদার ছেলেটির পক্ষে যেমন কষ্টকর তেমনই বিপজ্জনক বলেই সে মনে করছে।
কয়েকদিনের মধ্যেই প্রিন্সেস মারি যাত্রার জন্য প্রস্তুত হল। যাত্রার আয়োজনের মধ্যে আছে একটা বড় পারিবারিক গাড়ি যাতে চড়ে সে ভরোনেঝ গিয়েছিল, একটা আধ-খোলা ছোট এক্কা ও একটা মালগাড়ি। তার সঙ্গে যাচ্ছে মাদময়জেল বুরিয়ে, ছোট্ট নিকলাস ও তার শিক্ষক, বুড়ি নার্স, তিনটি দাসী, তিখন, যুবক পরিচারক ও সংবাদবাহক।
