কি? কি বললেন? পিয়ের শুধাল।
কে? আমি? কারাতায়েভ বলল। আমি বলি, ঘটনা তো আমাদের হিসাব মতো ঘটে না, ঘটে ঈশ্বরের হিসেবে। তারপর সঙ্গে সঙ্গে বলতে শুরু করল, আচ্ছা স্যার, আপনার তো পরিবার আছে, জমিদারি আছে? আর একটা বাড়িও? তার মানে আপনার প্রচুর আছে, কি বলেন? আর গৃহিণীও? আর বুড়ো বাবা-মা, তারা, এখনো বেঁচে আছেন কি?
অন্ধকারে দেখা না গেলেও পিয়ের বুঝতে পারল যে এই প্রশ্নগুলি করার সময় করুণার চাপা হাসিতে সৈনিকটির ঠোঁট দুটি কুঁচকে গেল। পিয়েরের বাবা-মা বেঁচে নেই শুনে, বিশেষ করে মা নেই শুনে সে খুব দুঃখ পেল।
বলল, স্ত্রী পরামর্শ দেয়, শাশুড়ি জানায় আদর, কিন্তু মার মতো আপনজন কেউ নেই! আচ্ছা আপনার ছেলে-মেয়ে আছে তো?
নেতিবাচক জবাব শুনে লোকটি দুঃখ পেল; তাড়াতাড়ি বলল, ঠিক আছে! আপনার তো অল্প বয়স, ঈশ্বরের দয়া হলেই সন্তান হবে। সবচাইতে বড় কথাই হল মিলেমিশে থাকা….
কিন্তু এখন তো সবই সমান, পিয়ের না বলে পারল না।
কারাতায়েভ বলে উঠল, আহা বাছা! কারাগার অথবা ভিখারীর কথাকে অগ্রাহ্য করবেন না!
বেশ আরাম করে বসে সে একটু কাশল। মনে হল, একটা লম্বা গল্প বলার জন্য তৈরি হয়ে নিচ্ছে।
বলতে আরম্ভ করল, দেখুন বাবা, আমি তো বাড়িতেই বাস করছিলাম। আমাদের একটা ভালো বাড়ি ছিল, প্রচুর জমি ছিল, আমরা চাষীরা তো সুখেই ছিলাম, আর বাড়িটার জন্যও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেওয়া যেতে পারে। বাবাকে নিয়ে যখন ফসল কাটতে যেতাম তখন আমরা হতাম সাতজন। ভালোই ছিলাম। সত্যিকারের চাষী ছিলাম। কিন্তু কি যে ঘটল..।
প্লাতন কারাতায়েভ তার দীর্ঘ কাহিনী সূত্রে জানাল-কাঠ কাটতে অন্যের জঙ্গলে ঢুকলে প্রহরী তাকে ধরে ফেলে, বিচার হয়, বেত্রাঘাত হয়, তার পর তাকে সৈন্যদলে চালান করে দেওয়া হয়।
ঈষৎ হাসির সঙ্গে গলার সুর পাল্টে ফেলে সে বলে চলল, দেখুন বাবা, আমরা এটাকে দুর্ভাগ্য বলেই মনে করেছিলাম, কিন্তু সেটাই বড় হয়ে দেখা দিল। আমি সেই পাপকাজ না করলে আমার ভাইকে সৈন্য হতে হত। কিন্তু তার, আমার ছোট ভাইয়ের পাঁচটি সন্তান, আর আমি ফেলে এসেছি শুধু স্ত্রীকে। আমাদের একটি ছোট মেয়ে ছিল, কিন্তু আমি সৈন্যদলে চলে যাবার আগেই ঈশ্বর তাকে নিয়ে নিলেন। ছুটিতে বাড়ি গেলে কি দেখি তাও বলছি; দেখি তারা আগের চাইতে ভালো আছে। উঠোন-ভরা গরু-মোষ, মেয়েরা সব ভালো আছে, দুভাই বিদেশে মাইনে পাচ্ছে, একমাত্র ছোট ভাই মাইকেল বাড়িতে থাকে। বাবা বলে, আমার কাছে সব সন্তানই সমান; যে আঙুলেই কামড় লাগুক, আঘাত সমানই লাগে। কিন্তু সৈন্য হিসেবে যদি প্লাতনের মাথা কামানো না হত তাহলে তো মাইকেলকেই যেতে হত। বিশ্বাস করুন, বাবা সকলকে কাছে ডেকে এনে আমাদের নিয়ে গেল দেবমূর্তির সামনে। বলল, মাইকেল, ওর পায়ের কাছে নত হও; আর তুমি বৌমা, তুমিও নত হও; আর তোমরা নাতি-নাতনিরা, তোমরাও ওর কাছে নত হও!…বুঝলেন তো ব্যাপারটা? এইরকমই হয়। ভাগ্য একটা মাথা চায়। কিন্তু আমরাই শুধু বিচার করি, এটা ভালো নয়-এটা ঠিক নয়। আমাদের ভাগ্য হচ্ছে টানা-জালের জলের মতো : যতক্ষণ টানবেন ততক্ষণ ফুলে-ফেঁপে উঠবে, কিন্তু যেই জল থেকে টেনে তুলবেন অমনি সব ফাঁকা! এই রকমই হয়!
প্লাতন তার আসনটাকে খড়ের উপর সরিয়ে নিল।
একটু চুপ করে থেকে উঠে দাঁড়াল।
আচ্ছা, মনে হচ্ছে আপনার ঘুম পাচ্ছে, বলে তাড়াতাড়ি ক্রুশ-চিহ্ন এঁকে সে বারবার বলতে লাগলঃ
প্রভু যীশুখৃস্ট, মহাত্মা সন্ত নিকলাস, ফ্রোলা ও লাভ্রা! প্রভু যীশুখৃস্ট, মহাত্মা সন্ত নিকলাস, ফ্রোলা ও লাভ্রা! প্রভু যীশুখৃস্ট, আমাদের প্রতি করুণা কর, আমাদের রক্ষা কর! কথা শেষ করে আভূমি নত হল, উঠে দাঁড়াল, দীঘশ্বাস ফেলল, তারপর আবার খড়ের স্থূপের উপর বসে পড়ল। এই তত পথ। হে ঈশ্বর, আমাকে পাথরের মতো শুইয়ে দাও, পাউরুটির মতো জাগিয়ে তোল। বিড়বিড় করে বলতে বলতে কোটটা গায়ে চাপা দিয়ে সে শুয়ে পড়ল।
পিয়ের শুধাল, আপনি কি প্রার্থনা করলেন?
প্রায় ঘুমের মধ্যে প্লাতন অস্ফুটে বলল, অ্যাঁ? আমি কি বলছিলাম। প্রার্থনা করছিলাম। আপনি প্রার্থনা করেন না?
হ্যাঁ, করি, পিয়ের বলল। কিন্তু ওই যে ফ্রোলা ও লাভ্রা বললেন, ওটা কী?
স্নাতন সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, এই কথা! ওঁরা হলেন ঘোড়াদের দু সন্ত।
জন্তু-জানোয়ারদের প্রতিও তো করুণা করা চাই। আরে, পাজিটা! বেশ তো কুঁকড়ে গরম হয়ে আছ দেখছি, এই কুকুরির বাচ্চা!
পায়ের কাছে শুয়ে থাকা কুকুরটার গায়ে হাত বুলিয়ে পুনরায় পাশ ফিরে শুয়ে প্লাতন সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল।
বাইরে অনেক দূর থেকে কান্না ও আর্তনাদের শব্দে ভসে আসছে, চালাঘরের ফাটল দিয়ে আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ভিতরটা শান্ত ও অন্ধকার। অনেকক্ষণ পর্যন্ত পিয়েরের ঘুম এল না, অন্ধকারে চোখ মেলে তাকিয়ে প্লাতনের নাসিকা-গর্জন শুনতে শুনতে তার মনে হল, যে পৃথিবী ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল সেটাই যেন নতুন রূপে, নতুন ও অবিচলিত ভিত্তির উপর নতুন করে গড়ে উঠছে তার আত্মার মধ্যে।
.
অধ্যায়-১৩
যে চালাঘরে পিয়েরকে রাখা হয়েছে সেখানেই রাখা হয়েছে আরো তেইশটি সৈনিক, তিনটি অফিসার ও দুটি কর্মচারীকে। সেখানেই পিয়ের চারটি সপ্তাহ কাটাল।
