অন্ধকারে সকলে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে; বোঝা যাচ্ছে তার প্রতি তাদের অসীম আগ্রহ। তারা তাকে কি যেন বলছে, কি সব প্রশ্ন করছে। তারা তাকে অন্য কোনোখানে নিয়ে চলল, এবং শেষপর্যন্ত চালাটার এমন একটা কোণে নিয়ে গেল যেখানে চারদিককার মানুষগুলো হাসছে আর কথা বলছে।
আচ্ছা, তাহলে স্যাঙাত্রা…ইনিই সেই প্রিন্স যে… যে শব্দটার উপর বিশেষ জোর দিয়ে চালার অপর দিক থেকে কে যেন বলে উঠল।
দেয়ালে পিঠ দিয়ে একগাদা খড়ের উপর নীরব, নিশ্চল হয়ে বসে পিয়ের একবার চোখ খুলছে, একবার বন্ধ করছে। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই সে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে কারখানার ছেলেটির সেই ভয়ংকর মুখতার সরলতার জন্যই বুঝি বেশি ভয়ংকর-আর সেই সব হত্যাকারীর মুখ যারা আত্মগ্লানির জন্যই যেন আরো ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। আবার চোখ খুলে চারদিককার অন্ধকারের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।
তার পাশেই উবু হয়ে বসে আছে একটি ছোটখাট মানুষ। নড়াচড়া করলেই শরীর থেকে ঘামের যে তীব্র গন্ধ আসছে তা থেকেই সে প্রথম লোকটির উপস্থিতি টের পেয়েছে। অন্ধকারে লোকটি নিজের পা নিয়ে কি যেন করছে; তার মুখ দেখতে না পেলেও পিয়ের বুঝতে পারছে যে লোকটি বারবার তার দিকে তাকাচ্ছে।
অন্ধকারে কিছুটা অভ্যন্ত হবার পরে পিয়ের দেখল, লোকটি তার পায়ের পট্টি খুলছে, আর যেভাবে খুলছে। তাতে পিয়েরের মনে আগ্রহ দেখা দিল।
এক পায়ের পট্টির দড়িটা খুলে সাবধানে সেটাকে পাকে পাকে খুলে সঙ্গে সঙ্গে অপর পায়ের কাজ শুরু করে লোকটি পিয়েরের দিকে তাকাল। এক হাতে দড়িটা ঝুলিয়ে রেখেই আর এক হাতে দ্বিতীয় পায়ের পট্টিটা খুলতে শুরু করল। এইভাবে নিপুণ দক্ষতায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দুপায়ের পট্টি খুলে লোকটি মাথার উপরকার একটা গজালে সে দুটো ঝুলিয়ে রাখল। তারপর একটা ছুরি বের করে কি যেন কাটল, ছুরিটা বন্ধ করল, মাথার কাছে বিছানার নিচে রেখে দিল। তারপর পিয়েরের দিকে তাকাল।
আপনি অনেক গোলযোগ পুইয়েছেন, কি বলেন স্যার? ছোট মানুষটি হঠাৎ বলে উঠল।
তার সুরেলা কণ্ঠস্বরে এত দয়া ও সরলতা ঝরে পড়ল যে পিয়ের জবাব দিতে চেষ্টা করল, কিন্তু তার চোয়াল কাঁপতে লাগল, দুচোখে জল এসে গেল।
পিয়েরের এই বিহ্বলতা প্রকাশের এতটুকু সময় না দিয়ে ছোট মানুষটি সেই একই মনোরম স্বরে সঙ্গে সঙ্গে বলতে লাগল, আরে বাবা, বেজার হবেন না!….বেজার হবেন না বন্ধু-এক ঘণ্টা কষ্ট কর, আর একযুগ বেঁচে থাক! এটাই তো আসল কথা গো বন্ধু। আর ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে এর মধ্যেও আমরা বেঁচে আছি। এইসব মানুষদের মধ্যে যেমন খারাপ লোক আছে, তেমনই ভালো লোকও আছে। কথা বলতে বলতে সে সহজেই হাঁটুর উপর ভর করে উঠে দাঁড়াল, কাশল, তারপর চালাটার অপর দিকে চলে গেল।
অ্যাঁ, ব্যাটা পাজি তুমি!! পিয়ের শুনতে পেল এই লোকটিই ওধারে কথা বলছে। তাহলে তুমি এসেছ, ব্যাটা পাজি। তার তাহলে মনে আছে….ঠিক আছে, ঠিক আছে, ওতেই হবে!
একটা ছোট কুকুর তার দিকে লাফিয়ে উঠছিল; সেটাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে সৈনিকটি তার জায়গায় ফিরে এসে বসল। তার হাতে ছেঁড়া কাপড়ে জড়ানো কি যেন রয়েছে।
পুঁটুলি খুলে পিয়েরের দিকে কিছু সিদ্ধ আলু এগিয়ে দিয়ে সে আগেকার মতোই সশ্রদ্ধ স্বরে বলল, এই যে, কিছু খান স্যার। ডিনারে ছিল ঝোল, আর আলু তো চমৎকার!
পিয়ের সারাদিন কিছু খায়নি। আলুর ঘ্রাণ তার খুবই ভালো লাগল। সৈন্যটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে খেতে শুরু করল।
সৈনিকটি হেসে বলল, আচ্ছা, ভালো তো? আপনার তো ভালো লাগা উচিত।
একটা আলু নিয়ে ছুরিটা বের করে হাতের উপরেই সেটাকে দুখণ্ড করে কেটে তাতে একটু নুন ছড়িয়ে দিয়ে পিয়েরের হাতে দিল।
আবার বলল, আলুগলি চমৎকার! এরকম আগে খেয়েছেন!
পিয়েরের মনে হল এর চাইতে বেশি সুস্বাদু কিছু সে কখনো খায়নি।
বলল, আরে, আমি তো ভালো আছি, কিন্তু ওই বেচারিদের ওরা গুলি করল কেন? শেষটির তো বিশ বছরও বয়স হয়নি।
ছোট মানুষটি বলল, চু, চু…! কী পাপ! কী পাপ! আচ্ছা স্যার, আপনি কেন মস্কোতে রয়ে গেলেন?
পিয়ের জবাব দিল, ওরা এত তাড়াতাড়ি এসে পড়বে ভাবতে পারিনি। হঠাৎই থেকে গেছি আর কি।
আর ওরা আপনাকে গ্রেপ্তার করল কেমন করে বাবা? আপনার বাড়িতে?
না, আমি অগ্নিকাণ্ড দেখতে গিয়েছিলাম, সেখানেই ওরা আমাকে গ্রেপ্তার করে, আর আগুন লাগানোর অভিযোগে বিচার করে।
ছোট মানুষটি শুধু বলল, যেখানে আইন আছে, সেখানেই আছে অন্যায়।
আলুর শেষটুকু চিবোতে চিবোতে পিয়ের শুধাল, আপনি কি অনেকদিন এখানে আছেন?
আমি? আমাকে তো গত রবিবারে ধরে এনেছে, মস্কোর একটা হাসপাতাল থেকে।
আরে, আপনি তাহলে একজন সৈনিক?
হ্যাঁ, আমরা আপশেরন রেজিমেন্টের সৈনিক। জ্বরে মরে যাচ্ছিলাম। কেউ কিছু জানায়নি। প্রায় জনবিশেক সেখানে শুয়ে ছিলাম। আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না, কখনো ভাবিও নি।
এখানে কি খুব খারাপ লাগছে? পিয়ের শুধাল।
কিন্তু উপায় কি বলুন বাবা? আমার নাম প্লাতন, উপাধি কারাতায়েভ, পিয়েরের পক্ষে ডাকবার সুবিধা হবে মনে করেই সে নামটা বলল। রেজিমেন্টেসকলে আমাকে ডাকে ছোট বাজপাখি বলে। খারাপ না লেগে কি পারে? মস্কোতে সব শহরের জননী। তার এই অবস্থা দেখলে কি দুঃখ না হয়ে পারে? কিন্তু কথায় বলে পোকা বাঁধাকপির পাতা কেটে ভিতরে ঢোকে, কিন্তু মরে সকলের আগে!
