এবারে পিয়ের মুখ ঘুরিয়ে চোখ বন্ধ করতে পারল না। ভিড়ের অন্য সকলের মতোই এই পঞ্চম হত্যাকাণ্ডের সময় তার কৌতূহল ও উত্তেজনাও একেবারে চরমে উঠেছে। অন্য সকলের মতোই পঞ্চম লোকটিও চুপচাপ হয়ে গেছে; ঢিলে জোব্বাটাকে আরো ভালো করে গায়ে জড়িয়ে একটা খালি পা দিয়ে অন্য পাটা ঘষছে।
তারা যখন তার চোখ বেঁধে দিল তখন পিছনের গিটটা মাথায় লাগছিল বলে নিজেই সেটা ঠিক করে নিল; রক্তাক্ত খুঁটিটার গায়ে তাকে ঠেসান দিয়ে দাঁড় করানো হলে সে নিজেই হেলান দিল এবং কিছুটা অস্বস্তি বোধ করায় সোজা হয়ে দাঁড়াল, পা দুটোকে ঠিক করে নিল, আরাম করে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। পিয়ের তার ওপর। থেকে চোখ সরিয়ে নিল না, তার সব গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগল।
হয়তো একটা হুকুম দেওয়া হয়েছিল এবং তার পরে আটটা বন্দুকের শব্দও হয়েছিল; কিন্তু পরবর্তীকালে অনেক চেষ্টা করেও গুলির এতটুকু শব্দ শোনার কথা পিয়ের মনে করতে পারত না। সে শুধু দেখেছিল, মজুরটি হঠাৎ তার বন্ধন-দড়ির উপরেই পড়ে গেল, দুটো স্থানে রক্ত দেখা গেল, ঝুলন্ত শরীরটার ভারে দড়িগুলো ঢিলে হয়ে গেল,আর মজুরটি বসে পড়ল, মাথাটা অস্বাভাবিকভাবে ঝুলে আছে, আর একটা পা ভাঁজ হয়ে আছে। পিয়ের খুঁটিটার দিকে এগিয়ে গেল। কেউ তাকে বাধা দিল না। বিবর্ণ ভয়ার্ত লোকগুলো মজুরটিকে ঘিরে কি যেন করছে। ঘন গোঁফওয়ালা একটি বুড়ো ফরাসি যখন দড়িগুলো খুলছিল তখন তার নিচের চোয়ালটা অনবরত কাঁপছে। শরীরটা পড়ে গেল। সৈনিকরা বিশ্রীভাবে সেটাকে খুঁটির কাছ থেকে টেনে নিয়ে গর্তের মধ্যে ঠেলে দিতে লাগল।
তারা সকলেই নিশ্চিতভাবে জানে যে তারা অপরাধী; যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের অপরাধের চিহ্ন সরিয়ে ফেলতেই হবে।
গর্তের ভিতরে তাকিয়ে পিয়ের দেখল, কারখানার ছেলেটি হাঁটু দুটোকে মাথার কাছে নিয়ে পড়ে আছে; একটা কাঁধ অপর কাঁধটার চাইতে বেশি উঁচু হয়ে আছে। সেই কাঁধটা তালে তালে ওঠা-নামা করছে, কিন্তু ইতিমধ্যেই কোদাল ভর্তি মাটি তার শরীরের উপর চড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। একটি সেনিক ক্রুদ্ধ কণ্ঠে পিয়েরকে চলে যেতে বলল। কিন্তু পিয়ের তার কথা বুঝতে পারল না, খুঁটিটার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল, কেউ তাড়িয়ে দিল না।
গর্তটা ভর্তি হয়ে গেলে আবার একটা হুকুম দেওয়া হল। পিয়েরকে তার জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল, খুঁটির দুপাশের দুসারি সৈন্য অর্ধেক ঘুরে গিয়ে মাপা পা ফেলে সেটার পাশ দিয়ে চলে গেল। বৃত্তের মাঝখানে দাঁড়ানো চব্বিশটি বন্দুকবাজ ছুটে যার যার নিজের জায়গায় চলে গেল।
পিয়ের বিস্ময়বিমূঢ় চোখে বন্দুকবাজদের দিকেই তাকিয়েছিল। একজন ছাড়া আর সকলেই সেনাদলের সঙ্গে ফিরে গেল। এই যুবক সৈনিকটি গর্তের কাছে ঠিক সেই জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে রইল যেখান থেকে সে গুলি ছুঁড়েছিল। তার মুখটা মড়ার মতো শাদা, শাকো পিছনের দিকে সরানো, আর বন্দুকটা মাটির উপরে রাখা। সে মাতালের মতো দুলছে; পাছে পড়ে যায় তাই একবার কয়েক পা এগোচ্ছে, আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। একটি বৃদ্ধ নন-কমিশনড অফিসার দলের ভিতর থেকে ছুটে এসে তাকে কনুই দিয়ে জাপটে ধরে দলের দিকে নিয়ে গেল। রুশ ও ফরাসিদের ভিড় কমতে শুরু করেছে। সকলেই মাথা নিচু করে নীরবে চলে যাচ্ছে।
একটি ফরাসি সৈনিক বলল, এ থেকেই ওরা আগুন দেবার উচিত শিক্ষা পাবে।
পিয়ের ঘুরে বক্তার দিকে তাকাল। সৈন্যটি নিজের কৃতকর্মের জন্য কিছুটা স্বস্তি পেতে চেষ্টা করছে, কিন্তু পাচ্ছেনা। কথা শেষ না করেই সে হাত দিয়ে একটা অর্থহীন ভঙ্গি করে চলে গেল।
.
অধ্যায়-১২
প্রাণদণ্ড-পর্ব শেষ হবার পরে পিয়েরকে অন্য সব বন্দিদের কাছ থেকে আলাদা করে একটা ছোট, বিধ্বস্ত, দুর্গন্ধময় গির্জায় একলা রেখে দেওয়া হল।
সন্ধ্যার দিকে দুটি সৈনিকসহ একজন নন-কমিশনড অফিসার সেখানে ঢুকে বলল যে তাকে ক্ষমা করা হয়েছে এবং এখন তাকে যুদ্ধ-বন্দিদের জন্য নির্দিষ্ট ব্যারাকে যেতে হবে। তাকে বলা হল না বুঝেই সে উঠে সৈন্যদের সঙ্গে চলল। তারা তাকে নিয়ে গেল মাঠের উঁচু দিকটার শেষ প্রান্তে। সেখানে পোড়া তক্তা, কড়ি ও বরগা দিয়ে কতকগুলি চালাঘর বানানো হয়েছে। তারই একটার মধ্যে তাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। অন্ধকারে জনা বিশেক মানুষ পিয়েরকে ঘিরে ধরল। তারা কে, কেন এখানে এসেছে, আর তার কাছেই বা কি চায়-এ সবকিছুই বুঝতে না পেরে সে তাদের দিকে তাকাল। তারা যা বলল তা শুনল, কিন্তু কোনো কথার অর্থ বুঝতে পারল না। তাদের প্রশ্নের জবাব দিল, কিন্তু কারা সে জবাব শুনছে, বা শুনে বুঝতে পারছে কি না তাও ভাবল না। তাদের মুখের দিকে, শরীরের দিকে তাকাল, কিন্তু সবকিছুই অর্থহীন মনে হল।
যে মুহূর্তে সে মানুষের হাতে মানুষের সেই ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড দেখেছে, অথচ তারা কেউ সে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে চায়নি, তখন থেকেই জীবনের মূল উৎসই যেন সহসা তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে; সবকিছুই ভেঙে পড়ে একটা অর্থহীন জঞ্জালের স্তূপে পরিণত হয়েছে। নিজের কাছে স্বীকার না করলেও এই জগতের সুষ্ঠু পরিচালনা, মানবতা, নিজের আত্মা, এবং ঈশ্বরের উপর তার যে বিশ্বাস ছিল তা ধ্বংস হয়ে গেছে। এ অভিজ্ঞতা তার আগেও হয়েছে, কিন্তু এখানকার মতো এমন তীব্র অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি। এখন তার মনে হচ্ছে, গোটা পৃথিবীটাই তার চোখের সামনে ভেঙে পড়েছে, পড়ে আছে শুধু অর্থহীন ধ্বংসস্তূপ, অথচ এ ব্যাপারে তার নিজের কোনো দোষ নেই। সে অনুভব করছে, জীবনের অর্থকে নতুন করে বিশ্বাস করবার ক্ষমতাও তার নেই।
