পাশ ফিরে শুতে চাইছেন, বলে চাকরটি মনিবের ভারী দেহটাকে দেয়ালের দিকে ফিরিয়ে দেবার জন্য এগিয়ে গেল।
তাকে সাহায্য করতে পিয়েরও উঠে গেল।
কাউন্টকে পাশ ফিরিয়ে দেবার সময় তার একটা হাত এলিয়ে পড়ল; হাতটাকে টেনে তুলতে রোগী বৃথাই চেষ্টা করল। যে রকম আতংকিত দৃষ্টিতে পিয়ের সেই নির্জীব হাতটাকে দেখছিল সেটা লক্ষ্য করেই হোক, অথবা অন্য কোনো চিন্তার প্রেরণাতেই হোক, রোগী একবার তার অশক্ত শিথিল হাতটার দিকে, আর একবার পিয়েরের ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকাল; আবার সে তাকাল নিজের হাতের দিকে। তখনই তার দুর্বল মুখে একটা দুর্বল, করুণ হাসি খেলে গেল। সে হাসি তার গম্ভীর মুখে বেমানান; মনে হল সে বুঝি নিজের অসহায় অবস্থাকেই ব্যঙ্গ করছে। সে হাসি দেখে পিয়েরের বুকের ভিতরটা অপ্রত্যাশিতভাবে কেঁপে উঠল, তার নাকটা সুড় সুড় করে উঠল, দুই চোখ জলে ঝাপসা হয়ে এল। রোগীকে দেয়ালের দিকে ফিরিয়ে শুইয়ে দেওয়া হল। সে দীর্ঘনিঃশাস ফেলল।
একটি প্রিসেসকে ঘরে ঢুকতে দেখে আন্না মিখায়লভনা বলল, উনি ঝিমুচ্ছেন। এস আমরা চলে যাই।
পিয়ের বেরিয়ে গেল।
*
অধ্যায়-২৪
প্রিন্স ভাসিলি ও বড় প্রিন্সেস ছাড়া অভ্যর্থনা-ঘরে আর কেউ নেই। মহীয়সী ক্যাথারিনের প্রতিকৃতির নিচে বসে তারা সাগ্রহে কথা বলছে। পিয়ের ও তার সঙ্গিনীকে দেখামাত্রই তারা চুপ করে গেল। পিয়েরের মনে হল, বড় প্রিন্সেস কি যেন লুকিয়ে ফেলল; ফিসফিস করে বলল, ওই মেয়েটিকে আমি সহ্য করতে পারি না।
প্রিন্স ভাসিলি আন্না মিখায়লভনাকে বলল, কাভিচে ছোট বসার ঘরটাতে চায়ের ব্যবস্থা করেছে। সেখানে গিয়ে কিছু খেয়ে নিন আন্না মিখায়লভনা, নইলে যে ধকল সইতে পারবেন না।
সে পিয়েরকে কিছু বলল না, শুধু কাঁধের নিচে তার হাতটাকে সহানুভূতির সঙ্গে একটু টিপে নিল। আন্না মিখায়লভনার সঙ্গে পিয়ের ছোট বসবার ঘরটাতে ঢুকল।
ছোট গোল ঘরটাতে একটা টেবিলে চা ও ঠাণ্ডা খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। সেখান থেকে একটা হাতলবিহীন সুদৃশ্য চীনা পেয়ালায় চা নিয়ে লোরেন সোৎসাহে বলে উঠল, একটা বিদ্রি রাতের পরে সুস্বাদু। রুশ চায়ের মতো স্ফুর্তিকর আর কিছু নেই। সেই রাতে যে সব অতিথি কাউন্ট বেজুখভের বাড়িতে এসেছিল। তারা সকলেই শক্তি সঞ্চয়ের জন্য সেই টেবিলে ভিড় করেছে। আয়না ও ছোট ছোট টেবিলে সাজানো এই ছোট গোল বসার ঘরটার কথা পিয়েরের খুব ভালোই মনে আছে। একটা ছোট টেবিলে চায়ের সরঞ্জাম ও খাবারের ডিশ এলোমেলোভাবে সাজানো রয়েছে। এই মাঝরাতেই একদল লোক সেখানে বসে আছে; ফুর্তি করছে না; গম্ভীরভাবে ফিসফিস করে কথা বলছে; কিন্তু তাদের প্রতিটি কথায়, প্রতিটি ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছে যে এখানে কি ঘটছে এবং শোবার ঘরে কি ঘটতে চলেছে সে কথা তারা মোটেই ভুলে যায় নি। খাবার যথেষ্ট ইচ্ছা থাকলেও পিয়ের কিছুই খেল না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার অভিভাবিকার দিকে তাকাতে লাগল। সে দেখল, যে অভ্যর্থনা-ঘরে তারা প্রিন্স ভাসিলি ও বড় প্রিন্সেসকে রেখে চলে এসেছে, মহিলাটি পা টিপে টিপে সেই ঘরের দিকেই চলেছে। পিয়ের ধরে নিল যে এটাও অবশ্য প্রয়োজনীয়; একটু পরে সেও সেই দিকেই গেল। আন্না মিখায়লভনা বড় প্রিন্সেসের পাশে দাঁড়িয়ে আছে; দুজনই ফিসফিস করে উত্তেজিতভাবে কথা বলছে।
বড় প্রিন্সেস যে রকম উত্তেজিতভাবে দরজাটাকে সশব্দে বন্ধ করে দিয়েছিল ঠিক সেই রকম উত্তেজনার সঙ্গেই সে বলে উঠল, কোনটা দরকারী আর কোনটা দরকারী নয় সেটা আমিই ভালো বুঝি প্রিন্সেস।
শোবার ঘরে যাবার দরজাটা আটকে বড় প্রিন্সেসকে সেখানে যেতে না দিয়ে আন্না মিখায়লভনা সরাসরি জবাব দিল, কিন্তু প্রিয় প্রিন্সেস, এটা কি খুবই বাড়াবাড়ি হবে না? এই মুহূর্তে ওঁর যে বিশ্রামের বড়ই প্রয়োজন। তাঁর আত্মা যখন প্রস্তুত হয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এই সব পার্থিব আলোচনা…।
অভ্যস্ত ভঙ্গিতে এক পায়ের উপর আর এক পা তুলে প্রিন্স ভাসিলি একটা আরাম কেদারায় বসে ছিল। তার ভারী গাল দুটো ভীষণভাবে কুঁচকে যাচ্ছে; কিন্তু সে এমন একটা ভাব দেখাচ্ছে যেন এই দুটি মহিলার কথাবার্তার ব্যাপারে তার কোনো মাথাব্যথাই নেই।
দেখুন আন্না মিখায়লভনা, কাতিচে যা করতে চায় তাই করতে দিন। কাউন্ট যে ওকে কত ভালোবাসেন তা তো আপনি জানেন।
হাতের কারুকার্যকরা পোর্টফোলিওটা প্রিন্স ভাসিলিকে দেখিয়ে বড় প্রিন্সেস বলল, এই কাগজে কি আছে তাও আমি জানি না। আমি শুধু এইটুকুই জানি যে তাঁর আসল উইলটা রয়েছে লেখার টেবিলে; এ কাগজের কথা তিনি ভুলেই গেছেন।…
সে আন্না মিখায়লভনাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চেষ্টা করল, কিন্তু মহিলাটি একলাফে এগিয়ে এসে তার পথ আটকে দিল।
সে যে সহজে ছেড়ে দেবে না এমনি ভাব দেখিয়ে পোর্টফোলিওটা শক্ত করে চেপে ধরে আন্না মিখায়লভনা বলল, আমি সব জানি গো দয়ালু প্রিন্সেস। তোমাকে মিনতি করছি, তার প্রতি একটু করুণা কর।
প্রিন্সেস জবাব দিল না। পোর্টফোলিও নিয়ে টানাটানি ছাড়া আর কোনো শব্দই শোনা যাচ্ছে না, তবে এটা বোঝা যাচ্ছে যে বড় প্রিন্সেস যদি কথা বলে তাহলে সে কথাগুলি আন্না মিখায়লভনার পক্ষে শ্রুতিসুখকর হবে না। কিন্তু মহিলাটির কথায় মিষ্টতার ও দৃঢ়তা কোনোটারই অভাব নেই।
