.
অধ্যায়-১১
প্রিন্স শের্বাতভের বাড়ি থেকে বন্দিদের সোজা নিয়ে যাওয়া হল কুমারীক্ষেত্রে-সন্ন্যাসিনীদের মঠের বাঁ দিকে একেবারে সজিবাগানের কাছে। সেখানে একটি খুটি পোঁতা হয়েছে। খুঁটিটা ছাড়িয়ে একটা নতুন গর্ত খোঁড়া হয়েছে, আর খুটি ও গর্তের কাছাকাছি অনেক মানুষ অর্ধবৃত্তাকারে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। ভিড়ের মধ্যে আছে অল্প কয়েকজন রুশ আর নেপোলিয়নের অনেক সৈন্যসামন্ত-নানা ইউনিফর্মে সজ্জিত জার্মান, ইতালিয় ও ফরাসি। খুঁটির ডাইনে ও বাঁয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে নীল ইউনিফর্ম, লাল সন্ধত্ৰাণ, উঁচু বুট ও শাকো পরিহিত ফরাসি সৈন্যরা।
তালিকা অনুযারী বন্দিদের পর পর দাঁড় করিয়ে দিয়ে (পিয়েরের স্থান ষষ্ঠ) খুঁটিটার দিকে নিয়ে যাওয়া হল। সহসা তাদের দুদিক থেকে ভেরী বেজে উঠল; সেই শব্দে পিয়েরের মনে হল বুঝি তার মনের একটা অংশকে ছিঁড়ে ফেলা হল। চিন্তা করবার ও বুঝবার শক্তি সে হারিয়ে ফেলেছে। শুধু শুনতে পাচ্ছে আর দেখতে পাচ্ছে। তখন তার শুধু একটি ইচ্ছা–যে ভয়ংকর জিনিস ঘটতে যাচ্ছে সেটা তাড়াতাড়ি ঘটে যাক। অন্য বন্দিদের দিকে তাকিয়ে পিয়ের তাদের ভালো করে লক্ষ্য করতে লাগল।
প্রথম দুজন কয়েদি, মাথা কামানো। একজন লম্বা, লিকলিকে, অপর জনের ময়লা রং, লোমশ পেশীবহুল দেহ, চ্যাপ্টা নাক। তৃতীয়জন গৃহ-ভৃত্য, বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স, ধূসর চুল, নাদুসনুদুস চেহারা। চতুর্থজন চাষী, খুব সুন্দর, হাল্কা বাদামি চওড়া দাড়ি ও কালো চোখ। পঞ্চম একজন কারখানার মজুর, হলদে মুখ, ঢিলে জোব্বা পরা আঠারো বছরের একটি ছেলে।
পিয়ের শুনতে পেল, ফরাসিরা বলাবলি করছে, তাদের আলাদা গুলি করবে, না জোড়ায় জোড়ায়। শান্ত, ঠাণ্ডা গলায় অফিসার বলল, জোড়ায় জোড়ায়।
চাদর পরিহিত একজন ফরাসি পদস্থ ব্যক্তি বন্দিদের ডানদিকে এসে রুশ ও ফরাসি ভাষায় দণ্ডাদেশ পাঠ করল।
দু-জোড়া ফরাসি সৈন্য অপরাধীদের দিকে এগিয়ে গেল; অফিসারের হুকুমে সারির প্রথমে দাঁড়ানো কয়েদি দুজনকে ধরল। খুঁটির কাছে পৌঁছে কয়েদি দুজন থামল; থলে আনা হল; আহত পশু যেভাবে আগুয়ান শিকারীর দিকে তাকায় তারাও সেইভাবে নিঃশব্দে চারদিকে তাকাতে লাগল। একজন অনবরত কুশ-চিহ্ন আঁকতে লাগল, অপরজন পিঠ চুলকোতে চুলকোতে হাসির মতো করে ঠোঁট নাড়তে লাগল। সৈনিকরা দ্রুত হাতে তাদের চোখ বেঁধে দিল, মাথার উপর দিয়ে থলে দুটি নামিয়ে দিল; আর দুজনকেই খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ফেলল।
বারোজন নিপুণ বন্দুকবাজ বন্দুক নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে সেনাদলের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে খুঁটি থেকে আট পা দূরে দাঁড়াল। পাছে আসন্ন ঘটনাটা চোখে দেখতে হয় এই ভয়ে পিয়ের মুখ ফিরিয়ে নিল। হঠাৎ ফটাস করে এমন একটা কুণ্ডলি পাকানো শব্দ কানে এল যেটা যে কোনো ভয়ংকর কামানের শব্দের চাইতেও জোরালো। পিয়ের ঘুরে তাকাল। কিছুটা ধোঁয়া উড়ছে, আর ফরাসি সৈনিকরা বিবর্ণ মুখে ও কম্পিত হাতে গর্তটার কাছে কি যেন করছে। আরো দুজন বন্দিকে আনা হল। একইভাবে একই দৃষ্টিতে তারা দুজনও চারদিকের দর্শকদের দিকে বৃথাই প্রাণরক্ষার নীরব আবেদন নিয়ে তাকাতে লাগল। তাদের ভাগ্যে যে কি ঘটতে চলেছে তাও তারা বুঝতে পারছে না বা বিশ্বাস করতে পারছে না। তাদের কাছে জীবনের যে কি অর্থ তা তারা জানে, আর তাই সে জীবন যে কেউ নিতে পারে এটা তারা না পারছে বুঝতে, আর না পারছে বিশ্বাস করতে।
এবারও পিয়ের এসব দেখতে চাইল না, মুখটা ঘুরিয়ে নিল; কিন্তু আবার সেই ভয়ংকর বিস্ফোরণের শব্দ তার কানে এল, আর সেই মুহূর্তে সে দেখল ধোয়া, রক্ত, আর বিবর্ণ মুখ ফরাসি সৈন্য; এবারও তারা খুটির পাশে কম্পিত হাতে কি যেন করছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে চারদিকে তাকিয়ে যেন জানতে চাইল এসবের অর্থ কি। যতগুলি চোখের উপর চোখ পড়ল সর্বত্রই ঐ একই জিজ্ঞাসা সে দেখতে পেল।
তার নিজের অন্তরের মধ্যে যে হতাশা, আতঙ্ক ও সংঘাত দেখা দিয়েছে তারই প্রতিফলন সে দেখতে পেল প্রতিটি রুশ ও ফরাসি সৈনিক এবং অফিসারদের মুখে; একটিও ব্যতিক্রম নেই। মুহূর্তের জন্য তার মনের মধ্যে একটি প্রশ্নই ঝলসে উঠল; কিন্তু কে তাহলে এসব করছে? এরা সকলেই তো আমাদের মতো কষ্ট পাচ্ছে। তাহলে কে সে? কে?
৮৬তম বন্দুকবাজরা, আগে বাড়ো! কে যেন চিৎকার করে বলল।
এবার পিয়েরের ঠিক পূর্ববর্তী পঞ্চম বন্দিটিকে নিয়ে যাওয়া হল-একা। পিয়ের বুঝতে পারল না যে সে বেঁচে গেছে, তাকে এবং অন্যদের সেখানে আনা হয়েছে শুধু এইসব মৃত্যুদণ্ড দেখতে। সে কিন্তু কোনো রকম আনন্দ বা স্বস্তি বোধ করল না; ক্রমবর্ধমান আতঙ্কের সঙ্গে সবকিছু দেখতে লাগল। ঢিলে জোব্বা পরা সেই কারাখানার ছেলেটিই পঞ্চম বন্দি। তার গায়ে হাত দিতেই সে আতঙ্কে লাফিয়ে একপাশে সরে গিয়ে পিয়েরকে জড়িয়ে ধরল। (পিয়ের শিউরে উঠে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।)
ছেলেটি হাঁটতেও পারছে না। দু বগলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তারা তাকে টেনে নিয়ে চলল; সে চেঁচাতে লাগল। খুঁটির কাছে নিয়ে যেতেই সে চুপ করে গেল, যেন হঠাৎ তার মধ্যে একটা বোধ ফিরে এসেছে। সে কি বুঝতে পেরেছে যে আর্তনাদ করা অর্থহীন, অথবা সে কি ভেবেছে যে এরা তাকে খুন করবে এটা একান্তই অবিশ্বাস্য। সে যাই হোক, খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে সে চোখ বেঁধে দেবার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল এবং একটা আহত জন্তুর মতো চকচকে চোখ মেলে চারদিকে তাকাতে লাগল।
