এটা পরিষ্কার যে রুশ নীড় ধ্বংস হয়ে গেছে, ভেঙে গেছে, কিন্তু বিধ্বস্ত রুশ জীবনযাত্রার জায়গায় সেই ভাঙা নীড়ের উপর গড়ে উঠেছে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ফরাসি শৃঙখলা। যে সৈনিকরা তাকে ও অন্য অপরাধীদের পাহারা দিয়ে নিয়ে চলেছে তাদের চোখে পিয়ের এই সত্যকে দেখতে পেল; দেখতে পেল দুঘঘাড়ার গাড়িতে চেপে যে গণ্যমান্য অফিসারটি চলেছে তার চোখে। পিয়েরের মনে হল সে যেন একটা তুচ্ছ কাঠের টুকরো, এমন একটা যন্ত্রের চাকার মধ্যে পড়ে গেছে যার কাজকর্ম সে বুঝতে পারে না, কিন্তু যন্ত্রটা বেশ ভালোভাবেই চলছে।
তাকে ও অন্য বন্দিদের নিয়ে যাওয়া হল কুমারীক্ষেত্রের ডান দিকে মস্ত বাগানওয়ালা একটা বড় শাদা বাড়িতে। প্রিন্স শের্বাতভের বাড়ি; আগে এ বাড়িতে পিয়ের প্রায়ই আসত। সৈনিকদের কথাবার্তা থেকে সে জানতে পেরেছে, এই বাড়িতে এখন একমুলের ডিউক (দাভুত) মার্শাল বাস করে।
ফটকে পৌঁছে তাদের একে একে ভিতরে ঢোকানো হল। পিয়েরের স্থান ষষ্ঠ। কাঁচের ঘর, বাইরের ঘর ও হল ঘরের ভিতর দিয়ে একটা লম্বা নিচু পড়ার ঘরে তাকে নিয়ে যাওয়া হল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে একজন অ্যাডজুটান্ট।
নাকের উপর চশমা রেখে ঘরের একেবারে শেষ কোণে টেবিলের উপর ঝুঁকে বসে আছে দাভুত। পিয়ের তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেও একটা কাগজ দেখতে ব্যস্ত থাকায় দাভুত চোখ তুলল না। চোখ না তুলেই নিচু গলায় বলল, কে তুমি?
পিয়ের নীরব, একটা কথাও তার মুখ থেকে বের হল না। সে জানে, দাভুত শুধু একজন ফরাসি জেনারেলই নয়, নিষ্ঠুরতার জন্যও সে কুখ্যাত। দাভুত বসে আছে ছাত্রের জবাব শুনবার জন্য অপেক্ষারত কড়া ধাতের স্কুলশিক্ষকের মতো। তার ঠাণ্ডা মুখের দিকে তাকিয়ে পিয়ের বুঝতে পারল, জবাব দিতে একমুহূর্ত বিলম্ব ঘটলে তার ফলে তার জীবনটাই চলে যেতে পারে; কিন্তু সে যে কি বলবে তাই জানে না। দাভুত মাথা তুলল, চশমাজোড়াকে কপালের উপর ঠেলে দিল, চোখ কুঁচকে পিয়েরের দিকে তাকাল।
পিয়েরকে ভয় দেখাবার জন্যই মাপা ঠাণ্ডা গলায় বলল, লোকটিকে আমি চিনি।
যে ঠাণ্ডা স্রোতটা এতক্ষণ পিয়েরের পিঠ বেয়ে নামছিল এবার সেটা পাক-সাঁড়াশীর মতো তার মাথাটাকেই চেপে ধরল।
আপনি আমাকে চিনতে পারেন না জেনারেল, আমি কখনো আপনাকে দেখিনি…।
তার কথায় বাধা দিয়ে উপস্থিত অপর একজন জেনারেলকে দাভুত বলল, ও একজন রুশ গুপ্তচর।
দাভুত ঘুরে বসল। অপ্রত্যাশিতভাবে গলা কাঁপিয়ে পিয়ের তাড়াতাড়ি বলে উঠল : না মঁসিয়, আপনি আমাকে চিনতে পারেননি। আমি একজন বেসামরিক অফিসার; মস্কো ছেড়ে যাইনি।
তোমার নাম? দাভুত শুধাল।
বেজুখভ।
তুমি যে মিথ্যা বলছ না তার কি প্রমাণ আছে?
এ কথায় আহত না হয়ে অনুনয়ের সুরে পিয়ের বলল, মঁসিয়!
দাভুত চোখ তুলে একাগ্র দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড তারা পরস্পরকে দেখল, আর সেই দৃষ্টিই পিয়েরকে রক্ষা করল। যুদ্ধ ও আইনের দৃষ্টিতে সেই দৃষ্টি দুটি মানুষের মধ্যে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তুলল। সেই মুহূর্তে দুজনের মনের মধ্যেও অস্পষ্টভাবে কিছু ঘটে গেল; তারা বুঝল, তারা দুজনেই মানবতার সন্তান, দু-ভাই।
একমুহূর্ত কী ভেবে দাভুত ঠাণ্ডা গলায় বলল, তুমি যে সত্য কথাই বলছ সেটা আমার কাছে কীভাবে প্রমাণ করবে?
পিয়েরের মনে পড়ে গেল রাম্বেলের কথা; তার নাম, রেজিমেন্ট ও যে রাস্তায় তার বাড়ি সব বলে দিল।
তুমি যা বলছ তা নও, দাভুত আবার বলল।
কম্পিত স্খলিত কণ্ঠে পিয়ের তার বক্তব্যের স্বপক্ষে প্রমাণ দিতে লাগল। কিন্তু সেই মুহূর্তে একটি অ্যাডজুটান্ট ঘরে ঢুকে দাভুতকে কি যেন বলল।
সে সংবাদ শুনে দাভুতের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল; সে ইউনিফর্মের বোম আঁটতে লাগল। মনে হল, পিয়েরের কথা সে বেমালুম ভুলে গেছে।
অ্যাডজুটান্টটি বন্দির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে সে কুটি করে মাথাটা পিয়েরের দিকে নেড়ে তাকে সরিয়ে নেবার হুকুম দিল। তাকে যে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে পিয়ের তা বুঝতে পারল না।
মুখ ফিরিয়ে দেখল, অ্যাডজুটান্টটি দাভুতকে আর একটা প্রশ্ন করছে।
হ্যাঁ, অবশ্য! দাভুত উত্তর দিল, কিন্তু এই ঘা-র যে কি অর্থ তা পিয়ের বুঝতে পারল না।
সে যে কোথায় গিয়েছিল, অনেক দূরে কি না, অথবা কোন দিকে–পরবর্তীকালে এ সবকিছুই পিয়ের স্মরণ করতে পারেনি। তার বুদ্ধিবৃত্তি অবশ হয়ে গেল, কেমন যেন বিমূঢ় হয়ে পড়ল, কোনো দিকে লক্ষ্য না করে অন্যের সঙ্গে পা মিলিয়ে এগিয়ে চলল, এবং অন্য সকলে যখন থামল তখন সেও থেমে গেল। একটা চিন্তাই তখন তার মনের মধ্যে ঘুরতে লাগল : কে তার মৃত্যুদণ্ড দিল? যে কমিশন তাকে প্রথম জেরা করেছিল তারা নয়। এমন মানবিক দৃষ্টিতে দাভুত তার দিকে তাকিয়েছিল যে সেও হতে পারে না। আর একমুহূর্ত পরেই দাভুত তার ভুল বুঝতে পারত, কিন্তু তখনই অ্যাডজুটান্টটি এসে তার চিন্তায় বাধা দিল। তাহলে কে তার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, তাকে হত্যা করছে, জীবন থেকে তাকে বঞ্চিত করছে-তাকে, পিয়েরকে, অনেক স্মৃতি, আকাক্ষা, আশা ও চিন্তার একটি মানুষকে? একাজ কে করছে? পিয়েরের মনে হল, কেউ না।
একটা ব্যবস্থা মাত্ৰ-ঘটনার একটা সমাবেশ মাত্র।
যে-কোনো রকমের একটা ব্যবস্থা তাকে-পিয়েরকে হত্যা করছে, জীবন থেকে, সবকিছু থেকে বঞ্চিত করছে, তাকে ধ্বংস করছে।
