বলল, হ্যাঁ মামণি, লিখব।
সেদিন যা কিছু ঘটেছে, বিশেষ করে তার স্বপ্ন-দর্শনের যে রহস্যময় পুনরাবৃত্তি সে এই মাত্র দেখেছে, তাতে সোনিয়ার মনটা নরম হয়েছে, উত্তেজিত হয়েছে। অভিভূত হয়েছে। এখন সে বুঝতে পেরেছে যে নাতাশার সঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রুর সম্পর্কটা নতুন করে গড়ে ওঠায় নিকলাসের পক্ষে প্রিন্সেস মারিকে বিয়ে করার পথে বিপ্ন দেখা দেবে, আর তাই আনন্দিত চেতনায় সেই আত্মত্যাগের মনোভাব আবার ফিরে এসেছে যাতে সে অভ্যস্ত, যা নিয়ে সে বেঁচে থাকতে ভালোবাসে। আর তাই একটা মহৎ কর্মসাধনের সানন্দ চেতনায় সেই আবেগভরা চিঠিটা সে লিখেছে–যদিও চোখের জল এসে তার পশম-কালো চোখ দুটিকে ভিজিয়ে দিয়ে বারবার বাধা দিয়েছে–যা পেয়ে নিকলাস অবাক হয়ে গেছে।
.
অধ্যায়-৯
অফিসার ও সৈনিকরা পিয়েরকে গ্রেপ্তার করে রক্ষী-ভবনে নিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে শত্রুতাপূর্ণ অথচ সসম্মান আচরণ করতে লাগল। তার প্রতি ব্যবহারে তাদের মনে এখনো একটা অনিশ্চয়তা কাজ করছে-লোকটি কে হতে পারে; হয়তো একজন খুব গণমান্য লোকই হবে; আবার তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সংঘর্ষের ফলে লোকটির প্রতি শত্রুসুলভ বিদ্বেষও রয়েছে।
কিন্তু পরদিন সকালে যখন রক্ষীদল চলে গেল, তখন পিয়ের বুঝতে পারল যে অফিসার ও সৈনিকসহ নতুন রক্ষীদলের চোখে তার কোনো অভিনবত্ব ধরা পড়ল না; বস্তুত চাষীর কোট-পরা এই শক্ত-সমর্থ লোকটার মধ্যে তারা তো সেই পরাক্রমশালী মানুষটিকে দেখছে না যে লুঠেরা ও প্রহরীদলের সঙ্গে বেপরোয়াভাবে লড়াই করেছিল এবং একটি শিশুকে রক্ষা করার জন্য গম্ভীর কথাগুলি বলেছিল; তারা তার মধ্যে দেখল শুধু ১৭ নম্বরের একটি রুশ বন্দিকে যাকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হুকুমে গ্রেপ্তার করে আটক রাখা হয়েছে। তাই সেদিন তাকে অন্যসব সন্দেহভাজন রুশ বন্দিদের সঙ্গে এক ঘরেই রাখা হল, কারণ যে আলাদা ঘরটাতে সে ছিল সেটা জনৈক অফিসারকে দেওয়া হয়েছে।
যেসব রুশদের সঙ্গে পিয়েরকে আটক রাখা হয়েছে তারা সকলেই একেবারে নিম্নশ্রেণীর মানুষ। তাকে ভদ্রলোক বলে চিনতে পেরে, বিশেষত সে ফরাসি ভাষায় কথা বলছে দেখে, তারা তাকে এড়িয়ে চলতে লাগল। তাকে নিয়ে সকলে হাসি-ঠাট্টা করছে দেখে পিয়ের দুঃখ পেল।
সেদিন সন্ধ্যায় সে জানতে পারল, এইসব বন্দিদের (হয়তো সেও তাদের মধ্যে একজন আগুন লাগাবার অভিযোগে বিচার করা হবে। তৃতীয় দিনে অন্য সকলের সঙ্গে তাকেও একটা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে দুজন কর্নেল ও অন্য ফরাসি সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে একজন শাদা গোঁফওয়ালা ফরাসি জেনারেল বসে আছে। অন্য সকলের মতোই পিয়েরকেও জিজ্ঞাসা করা হল সে কে, কোথায় ছিল, কি উদ্দেশ্যে, ইত্যাদি।
পিয়ের জানে এই বিচারের ব্যবস্থাটা পুরোপুরি একটা লোক-দেখানো ব্যাপার। সে জানে, সে এই লোকগুলির মুঠোর মধ্যে পড়েছে, গায়ের জোরে তারা তাকে এখানে এনেছে, সেই গায়ের জোরেই তার কাছ থেকে প্রশ্নের উত্তর দাবি করার অধিকার তারা পেয়েছে, আর তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করা। আর যেহেতু তাকে দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষমতা ও ইচ্ছা দুই তাদের আছে, সেইহেতু এই তদন্ত ও বিচারের ব্যবস্থাটা একান্তই অপ্রয়োজনীয়। এটা তো জানা কথা যে জবাব যাই হোক তার শাস্তি হবেই। যখন তাকে প্রশ্ন করা হল গ্রেপ্তারের সময় সে কি করছিল, তখন পিয়ের করুণভাবে বলল যে আগুনের ভিতর থেকে উদ্ধার করে একটি শিশুকে তার বাবা-মার হাতে তুলে দিচ্ছিল। সে লুঠেরাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল কেন? পিয়ের জবাব দিল, একটি স্ত্রীলোককে বাঁচাবার জন্য, আর অসম্মানিত একটি নারীকে রক্ষা করা প্রত্যেক মানুষেরই কর্তব্য, এবং…তারা তার কথায় বাধা দিল, কারণ এসব কথা তারা শুনতে চায় না। সাক্ষীরা তাকে যেখানে দেখতে পেয়েছিল সেই অগ্নিদগ্ধ বাড়িটার উঠোনে সে কেন গিয়েছিল? পিয়ের জবাব দিল, সে মস্কোর অবস্থাটা দেখতে গিয়েছিল। আবার তাকে বাধা দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, সে কে? আবার সে জানাল যে প্রশ্নের জবাব সে দেবে না।
রেখে দাও, খারাপ…খুব খারাপ, শাদা গোঁফ ও লাল মুখ জেনারেলটি কঠোর গলায় বলে উঠল।
.
চতুর্থ দিনে জুবভস্কি প্রাচীরেও আগুন জ্বলে উঠল।
পিয়ের ও অন্য তেরোজনকে নিয়ে যাওয়া হল ক্রিমিয় সেতুর নিকটবর্তী জনৈক বণিকের বাড়ির গাড়ির আড্ডায়। রাজপথ দিয়ে যেতে যেতে পিয়েরের দম বন্ধ হয়ে এল; সারা শহর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। চারদিকেই আগুন জ্বলছে। মস্কো পুড়ে যাওয়ার তাৎপর্য সে তখনও বুঝতে পারেনি; সভয়ে আগুনের দিকে তাকাল।
ক্রিমিয় সেতুর নিকটবর্তী গাড়ির আড্ডাখানায় সে চার দিন কাটাল। সেখানেই ফরাসি সৈন্যদের কথাবার্তা থেকে সে জানতে পারল, যাদের সেখানে আটক রাখা হয়েছে তাদের সম্পর্কে মার্শালের সিদ্ধান্ত যে-কোনো দিন পৌঁছে যাবে। মার্শালটি যে কে তা পিয়ের জানতে পারল না। স্পষ্টতই তাদের কাছে মার্শাল নিশ্চয়ই একটি খুব বৃহৎ রহস্যময় শক্তি।
৮ সেপ্টেম্বরের আগেকার যে কয়টা দিন ধরে বন্দিদের দ্বিতীয় দফা জেরা চলতে লাগল, পিয়েরের কাছে সেই দিনগুলি ছিল কঠোরতম।
.
অধ্যায়-১০
৮ সেপ্টেম্বর একজন অফিসাররক্ষীরা তাকে যেরকম সম্মান দেখাল তাতেই বোঝা গেল সে একজন গণ্যমান্য লোক-এসে গাড়ির আড্ডায় ঢুকল। হাতে একখানি কাগজ নিয়ে সে উপস্থিত রুশদের সকলেরই নাম ধরে ডাকল; শুধু পিয়েরকে ডাকল একজন লোক যে তার নাম বলেনি বলে। নির্বিকার উদাসভাবে বন্দিদের দিকে তাকিয়ে সে ভারপ্রাপ্ত অফিসারকে হুকুম দিল, মার্শালের কাছে নিয়ে যাবার আগে এদের যেন ভালো পোশাক পরিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নিয়ে যাওয়া হয়। একঘন্টা পরে একদল সৈন্য এসে পিয়ের ও অন্য তেরোজনকে নিয়ে কুমারীক্ষেত্রে হাজির করল। দিনটি সুন্দর, বৃষ্টির পরে রোদ উঠেছে, বাতাসে এক কণা ধুলো নেই। চারদিক ঘেঁয়ায় ঢেকে নেই; শুধু কুণ্ডলি পাকিয়ে পাকিয়ে ধোয়া উঠছে। আগুনের শিখা চোখে পড়ছে না, চারদিকেই শুধু ধোয়ার কুণ্ডুলি উঠছে, যতদূর। পিয়েরের চোখ গেল সারা মস্কো একটা প্রকাণ্ড ভস্মীভূত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে পিয়ের অতিপরিচিত অঞ্চলগুলিকেও চিনতে পারল না। এখানে-ওখানে গির্জাগুলো চোখে পড়ল; সেগুলি পোড়ানো হয়নি। ক্রেমলিনকেও ধ্বংস করা হয়নি। গম্বুজ ও মহান আইভানের ঘণ্টাঘরসমেত ক্রেমলিনের শাদা বাড়িটা চকচক করছে। নব কনভেন্টের গম্বুজগুলি ঝিকমিক করছে, ঘণ্টাগুলি স্পষ্ট শব্দে বাজছে। ঘণ্টা শুনে পিয়েরের মনে পড়ল আজ রবিবার, কুমারী উৎসবের দিন। কিন্তু উৎসব পালন করতে কেউ সেখানে হাজির হয়নি। সর্বত্র কালো কালো ধ্বংসস্তূপ; ছিন্ন বস্ত্র পরিহিত যে দুচারজন ভয়ার্ত রুশকে দেখা যাচ্ছে তারাও ফরাসিদের দেখলেই লুকিয়ে পড়তে চেষ্টা করছে।
