মস্কোতে শেষের কয়েকটা দিন রস্তভ পরিবারে এমন হট্টগোল ও ভয়ের আবহাওয়া চলল যে সোনিয়ার মনের বিষণ্ণ চিন্তাগুলো চাপা পড়ে গেল। নানা কাজকর্মের মধ্যে ডুবে থাকতে পেরে সে খুশিই হল। কিন্তু যখন সে তাদের বাড়িতে প্রিন্স আন্দ্রুর উপস্থিতির কথা শুনল তখন এই সানন্দ অনুভূতি তাকে পেয়ে বসল যে নিকলাসের কাছ থেকে তার দূরে সরে যাওয়াটা ঈশ্বরের অভিপ্রেতনয়। সে জানত, নাতাশা প্রিন্স আন্দ্রু ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসে না, তার ভালোবাসায় কখনো ইতি ঘটেনি। সে জানত, এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে পুনরায় একত্র হলে আবার তারা পরস্পরের প্রেমে পড়বে, আর সে অবস্থায় নিকলাস আর প্রিন্সেস মারিকে বিয়ে করতে পারবে না, কারণ সেটা সামাজিক বিধিতে নিষিদ্ধ। শেষের কয়েকটা দিন এবং তাদের যাত্রার প্রথম কয়েকটা দিন এই চিন্তায়ই সোনিয়া উল্লসিত হয়ে উঠল যে স্বয়ং বিধাতা তার ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছে।
পথে রস্তভ পরিবার একটি পুরো দিনের জন্য প্রথম যাত্রাবিরতি করল ত্রয়ৎসা মঠে।
মঠের অতিথিশালায় তিনটে বড় ঘর তাদের ছেড়ে দেওয়া হল; তার একটাতে প্রিন্স আন্দ্রুকে থাকতে দেওয়া হল। আহত লোকটির অবস্থা সেদিন অনেকটা ভাল; নাতাশা তার কাছেই বসেছিল। পাশের ঘরে কাউন্ট ও কাউন্টেস সসম্মানে মঠাধিপতির সঙ্গে কথা বলছে; পূর্বপরিচিত মঠের কল্যাণকামী হিসেবেই মঠাধিপতি তাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। প্রিন্স আন্দ্রু ও নাতাশার মধ্যে কি কথাবার্তা হচ্ছে তা জানবার কৌতূহলে সোনিয়াও সেখানে হাজির হয়েছে। দরজার ভিতর দিয়েই সে তাদের কথাবার্তা শুনছিল। দরজা খুলে উত্তেজিতভাবে বেরিয়ে এল নাতাশা। তাকে স্বাগত জানাতে মঠাধিপতি উঠে দাঁড়িয়ে ডান হাতের ঝোলা আস্তিনটা গুটিয়ে নিল; কিন্তু সেদিকে নজর না দিয়ে নাতাশা সোনিয়ার কাছে গিয়ে তার হাতটা ধরল।
কাউন্টেস বলল, নাতাশা, কি চাইছ? এদিকে এস!
আশীর্বাদ লাভের জন্য নাতাশা মঠাধিপতির কাছে এগিয়ে গেল; সে পরামর্শ দিল, ঈশ্বর ও সন্ত প্রভুর কাছে সাহায্য ভিক্ষা কর।
মঠাধিপতি চলে যেতেই নাতাশা বন্ধুর হাত ধরে তাকে নিয়ে খালি ঘরটাতে গেল।
নাতাশা বলল, সোনিয়া, ও কি বাঁচবে? সোনিয়া, আমি কত সুখী, অথচ কত দুঃখী!…সোনিয়া, ছোষ্ট্র পাখিটি, সবই তো যেমনটি ছিল তেমনই আছে। শুধু ও যদি বেঁচে ওঠে! ও তো…না, না, তা হতে পারে না…কারণ….কারণ… নাতাশা কেঁদে উঠল।
সোনিয়া মৃদু গুঞ্জনে বলল, ঠিক! আমি জানতাম! ঈশ্বরকে ধন্যবাদ!
সোনিয়াও ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নাতাশাকে চুমো খেল, সান্ত্বনা দিল। ভাবল, শুধু ও যদি বেঁচে ওঠে! দুজনেই কাঁদল, কথা বলল, চোখের জল মুছল, তারপর একসঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রুর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সাবধানে দরজার খুলে নাতাশা ভিতরে তাকাল; সোনিয়া তার পাশে আধখোলা দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
প্রিন্স আন্দ্রু তিনটে বালিশের উপর উঁচু হয়ে শুয়ে আছে। বিবর্ণ মুখখানি শান্ত, চোখ দুটি বন্ধ, নিয়মিত শ্বাসপ্রশ্বাসের লক্ষণ চোখে পড়ছে।
সঙ্গিনীর হাতটা ধরে দরজা থেকে পিছিয়ে এসে সোনিয়া হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ওঃ নাতাশা!
কি হল? কি হল? নাতাশা শুধাল।
ওই যে, ওই যে… সোনিয়া বলল; তার মুখটা শাদা হয়ে গেছে, ঠোঁট কাঁপছে।
আস্তে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে সোনিয়াকে নিয়ে নাতাশা জানালার কাছে গেল; সোনিয়ার কথাগুলি এখনো সে বুঝতে পারেনি।
গম্ভীর, ভয়ার্ত মুখে সোনিয়া বলল, তোমার মনে আছে অস্ত্রাদণুতে বড়দিনের সময়…তোমার জন্য যখন আয়নায় তাকিয়েছিলাম…? তোমার কি মনে আছে আমি কি দেখেছিলাম?
বিস্ফারিত চোখে নাতাশা বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ!
সোনিয়া বলতে লাগল, তোমার মনে আছে? তখন আমি এটাই দেখেছিলাম আর সেকথা তোমাকে, দুনিয়াশাকে, সক্কলকে বলেছিলাম। দেখেছিলাম, সে বিছানায় শুয়ে আছে, চোখ দুটি বন্ধ, একটা গোলাপি লেপ দিয়ে ঢাকা, দুহাত এক করা। তার দৃঢ় বিশ্বাস, এইমাত্র সে যা দেখেছে সেটা আয়নায় দেখা ছবির হুবহু অনুরূপ।
আসলে তখন সে কিছুই দেখেনি, যা প্রথম মাথায় এসেছিল তাই বলে দিয়েছিল; কিন্তু তখন যেটা সে বানিয়ে বলেছিল সেটা অন্য যে-কোনো স্মৃতির মতোই এখন তার কাছে সত্য বলে মনে হচ্ছে।
নাতাশাও চেঁচিয়ে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, গোলাপি রংই ছিল। তারপর চিন্তিতভাবে বলল, কিন্তু এর অর্থ কী?
তার হাতটা চেপে ধরে সোনিয়া বলল, ওঃ, আমি জানি না, সবই কেমন অদ্ভুত।
কয়েক মিনিট পরে প্রিন্স আন্দ্রু ঘণ্টা বাজাতেই নাতাশা তার কাছে চলে গেল, কিন্তু অসম্ভব রকমের উত্তেজিত ও অভিভূত হয়ে সোনিয়া জানালায় দাঁড়িয়েই যা ঘটেছে তার বিস্ময়করতা নিয়ে চিন্তা করতে লাগল।
.
সেদিনই সেনাবাহিনীতে চিঠি পাঠাবার একটা সুযোগ ছিল। কাউন্টেস তাই ছেলেকে চিঠি লিখতে বসেছে।
বোনঝিকে যেতে দেখে চিঠি থেকে চোখ তুলে কাউন্টেস বলল, সোনিয়া, তুমি নিকলাসকে লিখবে না? নরম কাঁপা গলায় কথা বললেও কাউন্টেসের মনের কথা সবই সোনিয়া বুঝতে পারল। ঐ দুটি চোখে প্রকাশ পাচ্ছে মিনতি, কোনোকিছু চাইবার লজ্জা, প্রত্যাখ্যানের ভয়, আর প্রত্যাখ্যাত হলে তীব্র বিদ্বেষের জন্য প্রস্তুতি।
কাউন্টেসের কাছে গিয়ে নতজানু হয়ে সোনিয়া তার হাতে চুমো খেল।
