হঠাৎ নিজের মনোভাব পাল্টে ফেলে নিকলাস চিৎকার করে উঠল, বোকার ডিম! না ডাকতেই ঘরে ঢুকেছ কেন?
ঘুম-ঘুম গলায় লাভ্রুশকা বলল, শাসনকর্তার কাছ থেকে একজন লোক এসেছে একটি চিঠি নিয়ে।
আচ্ছা, ঠিক আছে ধন্যবাদ। তুমি যেতে পার!
নিকলাস চিঠি দুটো নিল; একটা মার চিঠি, অপরটা সোনিয়ার। হাতের লেখা দেখে চিনতে পেরে প্রথমে সে সোনিয়ার চিঠিটাই খুলল। কয়েক লাইন পড়তেই তার মুখটা ম্লান হয়ে গেল, ভয়ে ও আনন্দে চোখ বড় বড় হয়ে উঠল।
না, এ সম্ভব নয়। সে চেঁচিয়ে বলে উঠল।
বসে থাকতে পারল না, চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়তে পড়তে পায়চারি করতে লাগল। চোখ তুলে তাকাল, আবার পড়ল, আবার, ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দু কাঁধ সোজা করল, হাঁ করে দুহাত টান-টান করল, দুচোখে স্থির দৃষ্টি। ঈশ্বর তার কথা শুনবে এই বিশ্বাস নিয়ে এইমাত্র যা প্রার্থনা করেছে তাই ঘটেছে; কিন্তু নিকলাস এতদূর বিস্মিত হয়েছে যেন এটা অসাধারণ ও প্রত্যাশিত, আর যেহেতু এত তাড়াতাড়ি এটা ঘটেছে যাতে প্রমাণ হয় যে এটা ঈশ্বরের নির্দেশে ঘটেনি, ঘটেছে ঘটনার সাধারণ যোগাযোগের ফলে।
যে বন্ধন নিকলাসকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছিল, যার হাত থেকে মুক্তির কোনো সম্ভাবনাই ছিল না বলে তার ধারণা, সোনিয়ার এই অপ্রত্যাশিত স্বেচ্ছাপ্রণোদিত চিঠি তাকে সেই বন্ধন থেকে মুক্তি দিয়েছে। সে লিখেছে, রস্ত পরিবারের মস্কোর প্রায় সব সম্পত্তির ক্ষতি হওয়ার মতো দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার কথা, নিকলাস যাতে প্রিন্সেস বলকনস্কয়াকে বিয়ে করে সেই মর্মে কাউন্টেসের উপর্যুপরি ঘোষণার কথা এবং ইদানীংকালে নিকলাসের নীরবতা ও উদাসীনতার কথা-এইসব কিছুর ফলেই সে স্থির করেছে সব প্রতিশ্রুতি থেকে মুক্তি দিয়ে সে নিকলাসকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা এনে দেবে।
সে লিখেছে, যে পরিবার আমার প্রতি এত ভালো ব্যবহার করেছে আমিই তার দুঃখ বা বিরোধের কারণ হব, এ চিন্তাও আমার পক্ষে বেদনাদায়ক। যাদের আমি ভালোবাসি তাদের সুখ ছাড়া আমার ভালোবাসার অন্য কোনো লক্ষ্য নেই; সুতরাং নিকলাস, আমার মিনতি নিজেকে তুমি স্বাধীন বলে বিবেচনা করো; স্থির জেনো, যাই ঘটুক না কেন তোমাকে এত ভালোবাসা আর কেউ দিতে পারবে না যা দিয়েছে —
তোমার সোনিয়া।
দুটো চিঠিই এসেছে ত্রয়সা থেকে। কাউন্টেসের চিঠিতে আছে মস্কোতে তাদের শেষের দিনগুলি, তাদের যাত্রা এবং তাদের সমস্ত সম্পত্তি ধ্বংস হওয়ার বিবরণ। চিঠিতে কাউন্টেস আরো জানিয়েছে, আহত অবস্থায় প্রিন্স আন্দ্রু তাদের সঙ্গেই পথ চলেছে; তার অবস্থা খুবই সংকটজনক ছিল, কিন্তু ডাক্তার এখন আশা দিয়েছে। সোনিয়া ও নাতাশাই তার সেবা করেছে।
পরদিন মার চিঠি নিয়ে নিকলাস প্রিন্সেস মারির সঙ্গে দেখা করতে গেল। নাতাশা তার সেবা করেছে এ কথাটার অর্থ কি হতে পারে তা নিয়ে দুজনের কেউই একটা কথাও বলেনি, কিন্তু এই চিঠিটাকে ধন্যবাদ, নিকলাস হঠাই প্রিন্সেসের পরম আত্মীয়ের মতো ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল।
পরদিন প্রিন্সেস মারির ইয়ারোস্লাভল যাত্রার প্রাক্কালে নিকলাস তাকে বিদায় জানাল, আর তার কয়েকদিন পরেই রেজিমেন্টে যোগ দিতে যাত্রা করল।
.
অধ্যায়-৮
নিকলাসের প্রার্থনার উত্তরে এয়সা থেকে লিখিত সোনিয়ার যে চিঠিটা এসেছে তার গোড়াকার কথাটা এই : কোনো ধনবতী উত্তরাধিকারিণীর সঙ্গে নিকলাসের বিয়ে দেবার চিন্তাটা কাউন্টেসকে ক্রমেই বেশি করে চেপে ধরেছে। সে জানে যে সোনিয়াই সে পথের প্রধান বাধা, আর তাই কাউন্টেসের বাড়িতে সোনিয়ার জীবন ক্রমেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে বোগুচারভোতে প্রিন্সেস মারির সঙ্গে নিকলাসের দেখা হয়েছে এই মর্মে তার চিঠি পাবার পর থেকে অবস্থাটা চরমে উঠেছে। সোনিয়ার প্রতি অসম্মানকর বা নিষ্ঠুর উক্তি করতে পারার কোনো সুযোগই কাউন্টেস ছেড়ে দেয় না।
কিন্তু মস্কো ছেড়ে আসার কয়েকদিন আগে নানান ঘটনায় বিচলিত ও উত্তেজিত হয়ে কাউন্টেস সোনিয়াকে কাছে ডাকল; কোনো রকম বকাবকি না করে এবং দাবি না জানিয়ে সাশ্রুনেত্রে তাকে মিনতি জানাল, এই পরিবার তার জন্য যা কিছু করেছে তার প্রতিদানে সে যেন স্বীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নিকলাসের সঙ্গে বিবাহসম্পর্কিত সব বন্ধন ছিন্ন করে ফেলে।
যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমাকে এই কথা না দিচ্ছ ততক্ষণ আমি শান্তি পাব না।
সোনিয়া হাউহাউ করে কেঁদে উঠল; কাঁদতে কাঁদতেই জবাব দিল যে সে সবকিছু করতে রাজি, সবকিছুর জন্য প্রস্তুত, কিন্তু কোনো কথা দিল না, কি করবে তা নিজেই স্থির করতে পারল না। যে পরিবার তাকে লালন-পালন করে বড় করে তুলেছে তার জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে তো হবেই। অপরের জন্য ত্যাগ স্বীকারই তো সোনিয়ার অভ্যাস। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত যখনই আত্ম ত্যাগের কোনো কাজ সে করেছে তখনই এই সুখের চেতনা তার মনে জেগেছে যে এই কাজের ফলে সে নিজের চোখে এবং অপরের চোখে আরো বড় হয়ে উঠবে, আর তাকে নিকলাসের আরো যোগ্য করে তুলবে; পৃথিবীর অন্য সবকিছুর চাইতে সে যে নিকলাসকে বেশি ভালোবাসে। কিন্তু এখন এরা যে তাকে সেই বস্তুটিকেই বিসর্জন দিতে বলছে যা তার সব আত্ম বিসর্জনের একমাত্র পুরস্কার, তার জীবনের একমাত্র অর্থ। আর এই প্রথম সেই পরিবারটির প্রতি তিক্ততায় তার মন ভরে উঠল যারা তাকে আশ্রয় দিয়েছিল শুধু একদিন অনেক বেশি যন্ত্রণা দেবার জন্য; নাতাশার প্রতিও ঈর্ষা জাগল তার মনে; এই মেয়েটি কোনোদিন কারো জন্য কোনো কিছু ত্যাগ না করেও সকলের ভালোবাসাই পেয়ে এসেছে। আর এই প্রথম সোনিয়া অনুভব করল যে নিকলাসের প্রতি তার পবিত্র, শান্ত ভালোবাসার ভিতর থেকে জেগে উঠেছে এমন একটি উচ্ছ্বসিত আবেগ যা নীতি, পুণ্য ও ধর্মের চেয়েও শক্তিশালী। সেই আবেগের প্রভাবে সোনিয়া কাউন্টেসকে এড়িয়ে চলতে লাগল, স্থির করল যতদিন নিকলাসের সঙ্গে দেখা না হয় ততদিন অপেক্ষা করবে; উদ্দেশ্য তাকে মুক্তি দেওয়া নয়, বরং দেখা হলেই তাকে চিরদিনের মতো নিজের সঙ্গে বেঁধে ফেলা।
