নিকলাস সঙ্গে সঙ্গে প্রিন্সেস মারিকে চিনতে পারল; অবগুণ্ঠনের আড়ালে তার রেখাচিত্র দেখে যতটা নয় তার চাইতে বেশি তার উদ্বেগ, ভীরুতা ও করুণার ভাব দেখে। প্রিন্সেস মারি নিজের চিন্তায়ই ডুবে ছিল; গির্জা থেকে যাবার আগে শেষবারের মতো সে ক্রুশ-চিহ্ন আঁকল।
নিকলাস অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকাল। আগে যে মুখ সে দেখেছে সেই একই মুখ, সেই একই পরিশীলিত আত্মিক সাধনার প্রকাশ, কিন্তু এখন সেই মুখ সম্পূর্ণ অন্যভাবে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। সে মুখে দুঃখ, প্রার্থনা ও আশার এক সকরুণ প্রকাশ। নিকলাস নিজের থেকেই তার কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল যে তার দুঃখের কথা সে শুনেছে, আর সর্বান্তঃকরণে তার সহানুভূতি জানাচ্ছে। তার কণ্ঠস্বর শোনার সঙ্গে সঙ্গেই প্রিন্সেস মারির মুখে যেন একটা উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠে তার দুঃখ ও আনন্দ দুকেই উজ্জ্বল করে তুলল।
রস্তভ বলল, আপনাকে একটা কথা বলার ছিল প্রিন্সেস। আপনার দাদা প্রিন্স আন্দ্রু নিকলায়েভিচ যদি বেঁচে না থাকত তাহলে সে খবর সঙ্গে সঙ্গে গেজেটে ঘোষণা করা হত, কারণ সে একজন কর্নেল।
তার কথা সম্যক বুঝতে না পারলেও তার মুখের সক্ষেদ সহানুভূতির প্রকাশ লক্ষ্য করে প্রিন্সেস মারি রশুভের দিকে তাকাল।
নিকলাস বলতে লাগল, এমন অনেক ঘটনার কথা আমি জানি যেখানে বোমার একটা টুকরোর আঘাত (গেজেটে বলা হয়েছে গোলা) হয় সঙ্গে সঙ্গে মারাত্মক হয়েছে, অথবা খুবই তুচ্ছ হয়েছে। আমরা তো ভালটাই আশা করব; আমি নিশ্চিত জানি…।
প্রিন্সেস মারি তার কথায় বাধা দিল।
ওঃ, সে যে কী ভয়ংকর… আবেগের আতিশয্যে সে কথা শেষ করতে পারল না; সাবলীল ভঙ্গিতে মাথাটা নিচু করে পরে সকৃতজ্ঞ চোখে তার দিকে তাকিয়ে প্রিন্সেস মারি মাসির সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় নিকলাস বাইরে বের হল না; ঘোড়া-ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হিসেবপত্র মেটাবার জন্য ঘরেই থাকল। সেকাজ যখন শেষ হয় তখন যতটা রাত হয়েছে তাতে না বাইরে যাওয়া চলে, না ঘুমতে যাওয়া চলে; অনেকক্ষণ পর্যন্ত ঘরময় পায়চারি করতে করতে সে নিজের জীবনের কথাই ভাবতে লাগল; অথচ একাজটা সে কদাচিৎ করে থাকে।
স্মোলেনস্ক প্রদেশে যখন প্রিন্সেস মারিকে দেখেছিল তখন তাকে রস্তভের খুব ভালো লেগেছিল। এখন ভেরোনেঝ-এ দেখা হবার পর তার প্রভাব যে প্রীতিপদ হয়েছে তাই নয়, সেটা বেশ শক্তিশালী হয়েই দেখা দিয়েছে। এখানে তার মধ্যে যে বিশেষ নৈতিক সৌন্দর্য নিকলাস দেখতে পেয়েছে তাতে সে মুগ্ধ হয়েছে। অবশ্য সে এখন যাত্রার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত; তাই তার সঙ্গে পুনরায় দেখা হবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে দুঃখ প্রকাশ করার কথাটা তার মাথায়ই আসেনি। কিন্তু সেদিন গির্জায় তার সাক্ষাৎটা নিকলাসের মনে এত গভীর দাগ কেটেছে যে তার মানসিক শান্তির পক্ষে সেটা বাঞ্ছনীয় নয়। সেই ম্লান, বিষণ্ণ, পরিশীলিত, মুখ, সেই উজ্জ্বল দৃষ্টি, সেই শান্ত শোভন ভঙ্গিমা, আর বিশেষ করে তার সারা অঙ্গে ফুটে ওঠা গভীর বেদনা তাকে উদ্বেলিত ও সহানুভূতিশীল করে তুলেছে। পুরুষ মানুষের মধ্যে উচ্চতর আধ্যাত্মিক জীবনের প্রকাশকে সে সহ্য করতে পারে না (সেইজন্যই প্রিন্স আন্দ্রুকে তার পছন্দ নয়), তাকে সে দার্শনিকতা ও স্বপ্নালুতা বলে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উল্লেখ করে থাকে, কিন্তু সেই একই দুঃখ যখন প্রিন্সেস মারির ক্ষেত্রে তার কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত একটি গোটা আধ্যাত্ম জগৎকে প্রকাশ করে দিল তখন সেটাই এক অনিবার্য আকর্ষণ হয়ে দেখা দিল।
নিজের মনেই বলল, সে এক আশ্চর্য নারী। সত্যিকারের দেবদূত! কেন আজ আমি স্বাধীন নই? সোনিয়াকে নিয়ে এত তাড়াহুড়া করেছিলাম কেন? আপনা থেকেই দুজনের তুলনা জাগল তার মনে : একজনের মধ্যে আধ্যাত্মিকতার তিলমাত্র নেই, আর অপরজনের মধ্যে আছে তার প্রাচ–এই আধ্যাত্মিকতার সম্পদ নিজের মধ্যে নেই বলেই সেটা তার কাছে আরো বেশি মূল্যবান। আজ যদি সে স্বাধীন থাকত তাহলে কি ঘটতে পারত সেই ছবিটাই তার সামনে দেখা দিল। প্রিন্সেসের কাছে সে বিয়ের প্রস্তাব করতে পারত, সেই হতে পারত তার স্ত্রী। কিন্তু না, সে কল্পনাও আজ সে করতে পারে না। সে ভয় পেল, মনের সামনে কোনো স্পষ্ট ছবিই ফোঁটাতে পারল না। অনেকদিন আগেই সোনিয়াকে নিয়ে ভবিষ্য জীবনের একটা ছবি সে দেখেছে; সে ছবি স্পষ্ট ও সরল, কারণ সোনিয়াকে সে ভালো করে চেনে, কিন্তু প্রিন্সেস মারিকে নিয়ে ভবিষ্যতের ছবি দেখা অসম্ভব, কারণ তাকে সে চেনে না, শুধুই ভালোবাসে।
সোনিয়াকে নিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখার মধ্যে একটা মজা আছে, একটা ফুর্তির ব্যাপার আছে, কিন্তু প্রিন্সেস মারিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা সব সময়ই শক্ত, কিছুটা ভীতিপ্রদ।
সে ভাবতে লাগল, আহা কী তার প্রার্থনার ধরন! তার সমস্ত অন্তর যেন সেই প্রার্থনার মধ্যে ডুবে যায়। হ্যাঁ, সেই প্রার্থনাই তো পাহাড় টলাতে পারে; আমার নিশ্চিত বিশ্বাস তার প্রার্থনার উত্তর সে পাবে। হঠাৎ তার মনে হল, আমি যা চাই তার জন্য প্রার্থনা করছি না কেন? আমি কি চাই? স্বাধীন হতে, সোনিয়ার হাত থেকে মুক্তি পেতে…তিনি তো ঠিকই বলেছেন, শাসনকর্তার স্ত্রীর কথাগুলি মনে পড়ে গেল : সোনিয়াকে বিয়ে করলে তার ফলে দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই জুটবে না। গোলমাল, মামণির দুঃখ…সম্পত্তি নিয়ে অসুবিধা…গোলমাল, ভয়ংকর গোলমাল! তাছাড়া তাকে আমি ভালোবাসি না-যেমন ভালোবাসা উচিত। হে ঈশ্বর! এই ভয়ংকর জটিল পরিস্থিতি থেকে আমাকে উদ্ধার কর! সহসা সে প্রার্থনা করতে শুরু করল। হ্যাঁ, প্রার্থনা পাহাড় টলাতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস থাকা চাই, ছেলেবেলায় নাতাশা ও আমি যে প্রার্থনা করতাম তা নয়, বরফ যেন চিনি হয়ে যায়-আর সত্যি তাই হয়েছে কিনা দেখতে আমরা উঠোনে ছুটে যেতাম। না, কোনো তুচ্ছ জিনিসের জন্য এখন আমি প্রার্থনা করছি না। পাইপটা এক কোণে রেখে দুহাত জোড় করে সে দেবমূর্তির সামনে বসল। প্রিন্সেস মারির স্মৃতিতে বিগলিত হয়ে অনেক দিন পরে সে প্রার্থনা করতে লাগল। তার চোখ জলে ভরে উঠল, গলা আটকে গেল, আর তখনই দরজা খুলে লাভ্রুশকা ঘরে ঢুকল কিছু কাগজপত্র নিয়ে।
