রস্তভের চোখেও এসবই স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ল, যেন সেও তার সারা জন্মের চেনা। রশুভের মনে হল, যে মানুষটি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে তার পরিচিত অন্য সকলের চাইতে স্বতন্ত্র ও ভালো, এমন কি তার নিজের চাইতেও ভালো।
কথাবার্তা যা হল তা খুবই সরল ও সাধারণ। যুদ্ধ নিয়ে কথা হল, আর অন্য সকলেরই মতোই তা নিয়ে নিজেদের দুঃখকে তারা অযথা বাড়িয়ে বলল; তাদের শেষ দেখা, শাসনকর্তার স্ত্রী, নিকলাসের আত্মীয়স্বজন এবং প্রিন্সেস মারির কথা নিয়েও তারা আলোচনা করল।
আলোচনার ফাঁকে একসময় নিকলাস প্রিন্স আন্দ্রুর ছোট্ট ছেলেটির দিকে নজর দিল, তাকে আদর করে জানতে চাইল সে একজন হুজার হতে চায় কিনা। ছেলেটিকে হাঁটুর উপর বসিয়ে তার সঙ্গে খেলা করতে করতে প্রিন্সেস মারির দিকে তাকাল। যে শিশুটিকে সে ভালোবাসে তাকে ভালোবাসার মানুষটির কোলে দেখে প্রিন্সেস মারি সুখী, ভীরু চোখে সেইদিকে তাকিয়ে রইল। নিকলাসও সেটা বুঝতে পেরে খুশিতে লাল হয়ে খেলার ছলে শিশুটিকে চুমো খেতে লাগল।
শোকের সময় চলছে বলে প্রিন্সেস মারি সমাজে বের হয় না, আর নিকলাসও পুনরায় তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়াটা উচিত বলে মনে করছে না; অবশ্য গভর্নরের স্ত্রী তার ঘটকালির কাজ চালিয়েই যাচ্ছে প্রিন্সেস মারির স্তুতি-বাক্যগুলি পৌঁছে দিচ্ছে নিকলাসের কানে, আর তার স্তুতি-বাক্য পৌঁছে দিচ্ছে প্রিন্সেসের কানে, আর নিকলাসকে বার বার বলছে বিয়ের কথা ঘোষণা করতে। সেজন্য মাস-অনুষ্ঠানের আগে বিশপের বাড়িতে দুজনের সাক্ষাতের একটা ব্যবস্থা করল।
রস্তভ শাসনকর্তার স্ত্রীকে বলল সে প্রিন্সেস মারিকে বিয়ের কথা কিছু বলবে না, কিন্তু সেখানে যাবে।
তিলসিটে যেমন সকলে যা ঠিক বলে মনে করেছে তাতে রস্তভ কোনোরকম সন্দেহ প্রকাশ করেনি, এখানেও তেমনই সে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির হাতেই নিজেকে ছেড়ে দিল, যদিও সেই দুর্বার শক্তি যে তাকে কোথায় নিয়ে যাবে তাও সে জানে না। সে জানে, সোনিয়াকে কথা দেবার পরে প্রিন্সেস মারির কাছে মনের কথা প্রকাশ করাটা হবে খুবই নিচ কাজ। সে আরো জানে যে কোনোরকম নিচ কাজ সে কদাপি করবে না। কিন্তু সেই সঙ্গে সে কথাও জানে (অন্তত মনেপ্রাণে অনুভব করে) যে পারিপার্শ্বিক অবস্থার হাতে এবং যারা তাকে চালাচ্ছে তাদের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে সে কোনো অন্যায় করছে না, বরং খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে–জীবনে যত কিছু কাজ করেছে সে সবকিছুর চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
প্রিন্সেস মারির সঙ্গে সাক্ষাতের পরে তার বহিরঙ্গ জীবন আগের পথেই চলতে থাকলেও আগে তার যা কিছু ভালো লাগত এখন আর তা ভালো লাগে না; প্রায়ই সে প্রিন্সেসের কথাই ভাবে। কিন্তু আগে আগে যুবতী মহিলাদের সম্পর্কে, এমন কি একসময় অত্যন্ত উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সোনিয়া সম্পর্কেও সে যেভাবে ভাবনা-চিন্তা করত, প্রিন্সেস মারি সম্পর্কে চিন্তাটা ঠিক সেরকম নয়। ঐ সব যুবতীদের সে দেখত যেমন সব সৎ অন্তঃকরণের যুবকরা দেখে থাকে; অর্থাৎ তাদের দেখত সম্ভাবিত স্ত্রীরূপে, কল্পনায় তাদের মানিয়ে নিত বিবাহিত জীবনের পরিবেশের সঙ্গে : শাদা ড্রেসিং-গাউন, চায়ের টেবিলে স্ত্রী, স্ত্রীর গাড়ি, বাচ্চারা, মামণি, বাপি, তাদের সঙ্গে স্ত্রীর সম্পর্ক, ইত্যাদি আর ভবিষ্যতের সেইসব ছবি তাকে আনন্দ দিত। কিন্তু যে প্রিন্সেস মারির সঙ্গে সকলে তার বিয়ে দিতে চেষ্টা করছে তাকে ভবিষ্যৎ বিবাহিত জীবনের ছবির সঙ্গে সে মোটেই জড়াতে পারছে না। সে চেষ্টা করলেও ছবিগুলি হয়ে উঠছে সামঞ্জস্যবিহীন ও মিথ্যা। তা দেখে সে ভয় পায়।
.
অধ্যায়-৭
বরদিনোর যুদ্ধের সংবাদ এবং নিহত ও আহতদের ব্যাপারে আমাদের ক্ষয়-ক্ষতির ভয়াবহ সংবাদ, আর তার চাইতেও ভয়ংকর মস্কো পরিত্যাগের সংবাদ ভারোনেঝে পৌঁছল সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। প্রিন্সেস মারি দাদার আহত হবার সংবাদ জেনেছে গেজেট থেকে; কিন্তু তার সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট খবর জানতে না পেরে প্রিন্স আন্দ্রুর খোঁজে নিজেই যাত্রা করার জন্য তৈরি হয়েছে।
বরদিনোর যুদ্ধ এবং মস্কো পরিত্যাগের খবর শুনে রশুভের মনে হতাশা, ক্রোধ, প্রতিহিংসার বাসনা, অথবা কোনোরকম অনুভূতিই জাগল না; শুধু ভরোনেঝের যা কিছু সবই তার কাছে একঘেয়ে ও বিরক্তিকর হয়ে উঠল; লজ্জা ও অকর্মণ্যতার একটা অস্পষ্ট অনুভূতি তাকে পেয়ে বসল। সব আলোচনাই তার কাছে আন্তরিকতাবিহীন বলে মনে হতে লাগল; কেমন করে সবকিছুর বিচার করবে তাও সে জানে না; তার মনে হল, একমাত্র রেজিমেন্টে ফিরে গেলেই সবকিছু আবার তার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠবে। ঘোড়া কেনার ব্যাপারে তাড়াহুড়া শুরু করে দিল, সএবং অকারণেই চাকর ও স্কোয়াড্রন কোয়ার্টার-মাস্টারের উপর রাগারাগি করতে লাগল।
তার যাত্রার কয়েকদিন আগে রুশদের জয়লাভ উপলক্ষে ভজনালয়ে একটা বিশেষ ধন্যবাদজ্ঞাপক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। নিকলাসও সেখানে উপস্থিত ছিল। শাসনকর্তার কিছুটা পিছনে দাঁড়িয়ে সে নানান বিষয়ে চিন্তা করছিল। অনুষ্ঠান শেষ হলে শাসনকর্তার স্ত্রী তাকে ইশারায় ডাকল।
মাথা নেড়ে বিপরীতদিকে দাঁড়ানো মহিলাটিকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, প্রিন্সেসকে দেখেছ?
