শাসনকর্তার স্ত্রী সকৃতজ্ঞভাবে তার কনুইটা চেপে ধরল।
আমার জ্ঞাতি বোন সোনিয়াকে আপনি জানেন? আমি তাকে ভালোবাসি, বিয়ে করব বলে কথা দিয়েছি, বিয়ে করবও…কাজেই বুঝতেই পারছেন ও বিয়ের কোনো প্রশ্নই… মুখ লাল করে নিকলাস অসংলগ্নভাবে কথাগুলি বলল।
এটা কীরকম দৃষ্টিভঙ্গি বাবা! তুমি তো জান সোনিয়া নিঃসম্বল, আর তুমি নিজেই বলছ যে তোমার বাবার অবস্থা খুবই খারাপ। আর তোমার মা? এ যে হবে তার মৃত্যুর সামিল। এই গেল এক দিক। আর সোনিয়ার জীবনটাই বা কি রকম হবে-যদি তার হৃদয় বলে কোনো পদার্থ থাকে? তোমার মা হতাশায় ভেঙে পড়বে, তোমরা সকলে সর্বস্বান্ত হবে…না বাবা, তোমার ও সোনিয়ার এটা বোঝা উচিত।
নিকলাস চুপ করে রইল। যুক্তিগুলো শুনতে তার ভালো লাগল।
একটু চুপ করে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, যে-কোনো অবস্থাযই এটা অসম্ভব মাসি। তাছাড়া, প্রিন্সেসই কি আমাকে গ্রহণ করবে? আরো কথা, এখন তো তার শোকের সময়। এ সময় কি ওসব কথা ভাবা যায়!
শাসনকর্তার স্ত্রী জবাব দিল, কিন্তু তুমি কি ভাবছ যে আমি এখনই তোমার বিয়ে দিচ্ছি। সব কাজেরই তো একটা সঠিক সময় আছে।
তার হাতটায় চুমো খেয়ে বলল, কী ভাবল ঘটকী আপনি মাসি…
.
অধ্যায়-৬
রস্তভের সঙ্গে দেখা হবার পরে মস্কো পোঁছে প্রিন্সেস মারি দেখল তার ভাইপো এবং তার শিক্ষক সেখানেই আছে, আর প্রিন্স আন্দ্রুর একটা চিঠি পেল যাতে কীভাবে তার মাসি মালভিসের সঙ্গে ভরোনেঝে দেখ করা যাবে সেই নির্দেশ জানানো হয়েছে।
প্রলোভনের সামিল যে অনুভূতি বাবার অসুখের সময় তাকে যন্ত্রণা দিয়েছে, তার মৃত্যুর পর থেকে, বিশেষ করে রস্তভের সঙ্গে দেখা হবার পর থেকে যাত্রার আয়োজন, দাদার জন্য উৎকণ্ঠা, নতুন বাড়িতে সংসার পাতা, নতুন লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা, এবং ভাইপোর লেখাপড়ার দিকে নজর রাখা, প্রভৃতি নানা কাজে সে অনুভূতি যেন চাপাই পড়ে গিয়েছিল। এখন শান্ত পরিবেশে একটি মাস কাটাবার পরে সে আবার নতুন করে বাবাকে হারাবার দুঃখ এবং তার সঙ্গে জড়িত রাশিয়ার সর্বনাশের বেদনা অনুভব করছে। আপনজন বলতে তার তো এখন একমাত্র দাদাই অবশিষ্ট আছে; তাই তার বিপদের আশংকায় সে এখন অনবরত উত্তেজনা ও যন্ত্রণা বোধ করছে। সে যে ভাইপোটির লেখাপড়া ভালোভাবে চালাতে পারছে না তা নিয়েও তার দুশ্চিন্তার অবধি নেই-তথাপি অন্তরের গভীরে সে এখন শান্তি পেয়েছে-রস্তভের সঙ্গে সাক্ষাতের ফলে যেসব ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও বাসনা তার মধ্যে জেগে উঠছিল তাদের স্তব্ধ করে দিতে পারার চেতনা থেকেই সে শান্তির উদ্ভব।
শাসনকর্তার স্ত্রী পরদিনই মালভিসেভার কাছে গিয়ে হাজির হল এবং মাসির সঙ্গে তার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শেষ করে বলল, যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক বাকদানের কথা ভাবাও যায় না, তবু দুটি যুবক-যুবতাঁকে এমনভাবে কাছাকাছি আনা দরকার যাতে তারা পরস্পরকে বুঝতে পারে। মালভিসেভা সম্মতি জানালে শানসকর্তার স্ত্রী মারির সামনেই রশুভের কথা বলতে শুরু করে দিল; তার প্রশংসা করল, প্রিন্সেস মারির নাম উল্লেখ করামাত্রই যে তার মুখটা লাল হয়ে উঠেছিল সেকথাও বলল। প্রিন্সেস মারির মনে কিন্তু আনন্দের বদলে দেখা দিল বিষাদ-তার মনের শান্তি নষ্ট হল, নতুন করে দেখা দিল বাসনা, সন্দেহ, আত্ম ধিক্কার ও আশা।
রস্তভ আসার আগের দুটি দিন প্রিন্সেস মারি অবিরাম ভাবতে লাগল, সে এলে তার সঙ্গে কীরকম ব্যবহার করবে। একবার ভাবল সে যখন মাসির সঙ্গে দেখা করবে তখন সে নিজে বৈঠকখানায় যাবেই না, কারণ এই শোকের সময় কোনো অতিথির সঙ্গে দেখা করা তার পক্ষে উচিত হবে না; আবার ভাবল, সে মানুষটি তার জন্য যা করেছে তার পরে সেটা তার প্রতি খুবই রূঢ় আচরণ হবে।
কিন্তু রবিবারে গির্জা থেকে আসার পরে পরিচারক যখন বৈঠকখানায় এসে জানাল যে কাউন্ট রস্তভ এসেছে, তখন প্রিন্সেস মোটেই বিচলিত বোধ করল না, শুধু তার গালে লাগল একটু রঙের ছোঁয়া, চোখ দুটি খুশিতে ঝলমল করে উঠল।
রস্তভ ঘরে ঢুকলে প্রিন্সেস একমুহূর্তের জন্য চোখ দুটি নামিয়ে নিল যাতে অতিথি মাসির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পায়; তারপরেই নিকলাস তার দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই সে মাথাটা তুলে চকচকে চোখে তার দিকে তাকাল। মর্যাদা ও কমনীয়তার সঙ্গে মুখে খুশির হাসি ফুটিয়ে সে অর্ধেক উঠে দাঁড়াল, সুন্দর হাতখানি বাড়িয়ে দিল, আর এমন স্বরে কথা বলতে লাগল যাতে এই প্রথম লাগল নারীত্বের প্রথম স্পন্দন। মাদময়জেল বুরিয়ে অবাক বিস্ময়ে প্রিন্সেস মারির দিকে তাকাল। সে নিজে প্রেমকলায় যথেষ্ট পারদর্শিনী, তবু যে পুরুষকে আকর্ষণ করতে চায় তার সঙ্গে দেখা হলে সে নিজেও এর চাইতে ভালোভাবে ব্যাপারটাকে সামাল দিতে পারত না।
হয় কালো রংটা তাকে বিশেষভাবে মানায়, অথবা আমার অজান্তেই সে প্রভূত উন্নতি করে ফেলেছে। মাদময়জেল বুরিয়ে ভাবল।
সেই মুহূর্তে প্রিন্সেস মারির যদি চিন্তা করার ক্ষমতা থাকত তাহলে নিজের এই পরিবর্তন লক্ষ্য করে সে হয়তো মাদময়জেল বুরিয়ে অপেক্ষাও বেশি আশ্চর্য হত। সেই পরিচিত প্রিয় মুখখানিকে চেনামাত্রই একটা নতুন জীবনীশক্তি যেন তাকে পেয়ে বসল, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তাকে কথা বলতে ও কাজ করতে বাধ্য করল। রস্তভ ঘরে ঢুকতেই তার মুখটা সহসা বদলে গেল। যেন একটা খোদাই-করা চিত্রিত লণ্ঠনের আলো হঠাৎ জ্বেলে দেওয়া হল, আর সহসা যা কিছু এতক্ষণ ছিল অন্ধকার, স্কুল ও অর্থহীন, তাই প্রকাশ পেল অপ্রত্যাশিত ও উল্লেখযোগ্য সৌন্দর্যে। যে পবিত্র, আত্মিক ও আন্তরিক বেদনার ভিতর দিয়ে এতকাল সে চলে এসেছে তার যেন এই প্রথম বাইরে প্রকাশ পেল।
