.
অধ্যায়-৫
নিকলাস একটা হাতল-চেয়ারে ঈষৎ ঝুঁকে বসেছে সুন্দরী মহিলার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে; মুখের হাসিটি অক্ষুণ্ণ রেখে মহিলাটির পৌরাণিক যুগসুলভ স্তুতিভাষণে মুখর হয়ে উঠেছে।
আঁটো রাইডিং-ব্রিচেস পরা পা দুটিকে নাচাতে নাচাতে আতরের গন্ধ ছড়িয়ে নিকলাস জানাল, এই ভরোনেঝের একটি মহিলাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার তার বড় সাধ।
কোন মহিলা?
মহিলা মনোরমা, স্বর্গীয়া। চোখ দুটি নীল, মুখখানি প্রবাল ও হস্তিদন্তের মিশ্রণ, আর ডায়ানার দেহসৌষ্ঠব…।
স্বামীটি এগিয়ে এসে বিষণ্ণকণ্ঠে জানতে চাইল, সে কি বিষয়ে কথা বলছে।
আরে, নিকিতা আইভানিচ! সবিনয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিকলাস চেঁচিয়ে বলল; তারপর যেন নিকিতা আইভানিচকে তার ঠাট্টার অংশীদার করার বাসনায়ই তাকে জানাল যে একটি সুন্দরী মহিলাকে নিয়ে সে পালিয়ে যাবে।
দুজনই হেসে উঠল–স্বামী বিষণ্ণভাবে, স্ত্রী খুশিতে। শাসনকর্তার ভালোমানুষ স্ত্রীটি অসম্মতিসূচক দৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে এল।
আন্না ইগনাতয়েভনা তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন নিকলাস। চলে এস। তুমি তো জান, তোমাকে নাম ধরে ডাকবার অধিকার তুমিই আমাকে দিয়েছ।
তা তো বটেই মাসি। কিন্তু তিনিটি কে?
আন্না ইগনাতয়েভনা মালভিসেভা। তার কোন বোনঝিকে তুমি নাকি বাঁচিয়েছ…মনে করতে পার কি?
আমি তো অনেককেই বাঁচিয়েছি! নিকলাস বলল।
তার বোনঝির নাম প্রিন্সেস বলকনস্কয়া। সেও মাসির সঙ্গে ভরোনেঝ এসেছে। ও হো! তোমার মুখটা দেখছি লাল হয়ে উঠেছে। সেকি, তুমি কি তাহলে…
দাঁড়ান! দয়া করে ওভাবে কথা বলবেন না মাসি!
ঠিক আছে ঠিক আছে!…আ, আচ্ছা মানুষ বটে তুমি!
শাসনকর্তার স্ত্রী তাকে একটি লম্বা, মজবুত গড়নের বৃদ্ধা মহিলার কাছে নিয়ে হাজির করল। মহিলাটির মাথায় নীল ওড়না, শহরের গণ্যমান্যদের সঙ্গে সবে তাস খেলা শেষ করেছে। এই মহিলাটিই মালভিসেভা, প্রিন্সেস মারির মাসি; ধনবতী নিঃসন্তান বিধবা, ভরোনেঝেই থাকে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তাস খেলার হিসেব নিকাশ করছিল। যে জেনারেলটি তার কাছ থেকে অনেক টাকা জিতে নিয়েছে তাকে তিরস্কার করতে করতেই সে চোখ তুলে কড়া চোখে তাকাল।
নিকলাসের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, খুব খুশি হলাম বাবা, দয়া করে বাড়িতে এসে দেখা করো।
প্রিন্সেস মারি, তার স্বর্গত পিতা ও প্রিন্স আন্দ্রুর খোঁজখবর নেবার পরে আর একবার নিকলাসকে তার বাড়িতে যাবার আমন্ত্রণ জানিয়ে মহিলাটি তাকে ছেড়ে দিল।
মালভিসেভার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিকলাস আবার নাচে যোগ দিতেই যাচ্ছিল, এমন সময় শাসনকর্তার স্ত্রীটি এসে তার আস্তিনে হাত রেখে বলল যে তার সঙ্গে সে কিছু কথা বলতে চায়; তারপর তাকে নিয়ে বসার ঘরে ঢুকতেই সেখানে অন্য যারা ছিল তারা বেরিয়ে গেল।
মমতাভরা ছোট মুখখানিতে গাম্ভীর্যের ভাব এনে শাসনকর্তার স্ত্রী বলতে শুরু করল, তুমি কি জান বাবা যে সেই হবে তোমার উপযুক্ত পাত্রী : ব্যবস্থা করে ফেলব কি?
আপনি কি বলতে চাইছেন মাসি? নিকলাস শুধাল।
প্রিন্সেসের সঙ্গে তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দেব। ক্যাথারিন পেত্ৰভনা অবশ্য লিলির কথাই বলছে, কিন্তু আমি বলেছি, না–প্রিন্সেস! ব্যবস্থা করে ফেলি, কি বল? আমি জানি, তোমার মা এজন্য আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে। সত্যি, মেয়েটি খুবই মনোরমা! আর একেবারে সাদাসিধেও নয়।
মোটেই না, নিকলাস সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল। কি বলছে সেটা না বুঝেই বলে উঠল, তবেই কি জানেন মাসি, একজন সৈনিক হিসেবে নিজেকে কারো উপর চাপিয়ে দিতেও চাই না, আবার ফিরিয়ে দিতেও চাই না।
ঠিক আছে; মনে রেখ যে এটা তামাশা নয়!
মোটেই না!
ঠিক, ঠিক, যেন নিজের মনেই শাসনকর্তার স্ত্রী বলল। কিন্তু বাবা, একটা কথা, আর যাই হোক ওই সুন্দরীটির প্রতি তুমি বড় বেশি মনোযোগ দিচ্ছ। সত্যি, স্বামীটির জন্য দুঃখ হয়…
সরল মনে নিকলাস বলল, না, না ওর সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব হয়েছে। তার মাথায় এটা ঢুকল না যে তার কাছে যেটা মজার খেলা, অন্যের কাছে সেটা মজার ব্যাপার নাও হতে পারে।
আহারের সময় হঠাৎ নিকলাসের মনে হল, শাসনকর্তার স্ত্রীকে কী সব বাজে কথা বলে দিলাম। তিনি হয়তো সত্যি সত্যি বিয়ের ব্যবস্থা করে বসবেন…আর সোনিয়া…? বিদায় নেবার সময় শাসনকর্তার স্ত্রী যখন আর একবার হেসে বলল, তাহলে মনে থাকে যেন! তখন নিকলাস তাকে একপাশে ডেকে নিয়ে গেল।
দেখুন, সত্যি কথা বলতে কি মাসি…
কি ব্যাপার বাবা? এস, এখানেই বসা যাক।
সহসা নিকলাসের মনে হল, এই অপরিচিতা নারীটির কাছে তার অত্যন্ত গোপন কথাগুলি (যা সে তার মা, বোন, বা বন্ধুর কাছেও বলেনি,) বলা দরকার। পরবর্তীকালে এই ঘটনাটি মনে পড়লেই সেভাবে নেহাৎ খেয়ালের বশেই সে খোলাখুলিভাবে কথাগুলি বলেছিল : অথচ সেই দিলখোলা মনের উস ও আরো কিছু তুচ্ছ ঘটনা মিলে তার ও তার পরিচারের সকলের উপর একটা প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তার করেছিল।
কি জানেন মাসি, মামণির অনেক দিনের ইচ্ছা যে আমি একটি ধনবতী উত্তরাধিকারিণীকে বিয়ে করি, কিন্তু টাকার জন্য বিয়ে করার ব্যাপারটাই আমার কাছে ঘৃণাই বলে মনে হয়।
আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি, শাসনকর্তার স্ত্রী বলল।
কিন্তু প্রিন্সেস বলকনস্কয়ার ব্যাপারটা আলাদা। সত্য কথাই আপনাকে বলব। প্রথমত, আমি তাকে খুব পছন্দ করি, তার প্রতি আকর্ষণ বোধ করি; তার উপরে এই পরিস্থিতিতে এমন অদ্ভুতভাবে তার সঙ্গে দেখা হবার পরে আমার তো প্রায়ই মনে হয়েছে : এটাই নিয়তি। বিশেষ করে যদি মনে রাখেন যে মামণি অনেকদিন থেকেই এটা ভাবছে; কিন্তু আগে তো কখনো তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি; যেভাবেই হোক না কেন দেখাসাক্ষাটা ঘটে ওঠেনি। যতদিন পর্যন্ত আমার বোনের সঙ্গে তার দাদার বিয়ের কথা ছিল ততদিন অবশ্য তাকে বিয়ে করার কথা ভাবার কোনো প্রশ্নই ছিল না। আর কী আশ্চর্য, নাতাশার বিয়েটা ভেঙে যাওয়া মাত্রই তার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল…আর সবকিছুই…কাজেই বুঝতেই পারছেন…আপনাকে ছাড়া আর কাউকে একথা বলিনি, কোনোদিন বলবও না।
