বেসামরিক বাহিনীর কমান্ডার একজন বৃদ্ধ জেনারেল; নিজের সামরিক খেতাব ও পদমর্যাদায় খুব খুশি। বেশ গুরু-গম্ভীর ভঙ্গিতে সে নিকলাসের কাছ থেকে যুদ্ধের খবরাখবর জেনে নিল। নিকলাসও খোশ মেজাজে ছিল বলে তার এই ব্যবহারে সেও বেশ মজাই পেল।
সেখান থেকে সে গেল শাসনকর্তার কাছে। লোকটি ছোটখাট, সরল, অমায়িক। নিকলাসকে একটা আস্তাবলের খবর দিল, শহরের একজন অশ্বব্যবসায়ী ও শহর থেকে চৌদ্দ মাইল দূরের জনৈক ঘোড়ার মালিক জোতদারের নাম বলে দিল এবং সর্বপ্রকারে তাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিল।
বিদায় দেবার সময় শাসনকর্তা বলল, আপনি কাউন্ট ইলিয়া রস্তভের ছেলে? আমার স্ত্রী আপনার মার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। প্রতি বৃহস্পতিবার আমরা সকলে মিলিত হই-আজই তো বৃহস্পতিবার, কাজেই দয়া করে এসে আমাদের সঙ্গে মিলিত হবেন।
সেখান থেকে ফিরেই ডাক-ঘোড়া ভাড়া করে, স্কোয়াড্রন কোয়ার্টার-মাস্টারকে সঙ্গে নিয়ে নিকলাস চৌদ্দ মাইল দূরের জোতদার ভদ্রলোকের বাড়ির দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
জোতদার ভদ্রলোক অবিবাহিত, প্রাক্তন অশ্বারোহী সৈনিক, অশ্বানুরাগী, ক্রীড়াবিদ; বেশ কিছু একশ বছরের পুরনো ব্র্যান্ডি ও কিছু পুরনো হাঙ্গেরীয় মদের মালিক।
সামান্য কথাবার্তার পরেই নিকলাস ছহাজার রুবল দামে সতেরোটি বাছাই ঘোড়া কিনে ফেলল। আহারাদির পরে একটু বেশি মাত্রায় হাঙ্গেরীয় মদ পেটে ঢেলে নিকলাস বিদায় নিল। এর মধ্যেই লোকটির সঙ্গে তার বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। বিদায়ের আগে পরস্পরকে চুমো খেয়ে নিকলাস সেই শোচনীয় রাস্তায় গাড়ি ছুটিয়ে দিল। কোচয়ানকে বারবার তাগাদা দিতে লাগল যাতে যথাসময়ে শাসনকর্তার মজলিসে পৌঁছনো যায়।
পোশাক ছেড়ে, মাথায় জল ঢেলে, আতর মেখে নিকলাস যখন শাসনকর্তার বাড়িতে পৌঁছল তখন বেশ দেরি হয়ে গেছে; ঢুকতে ঢুকতেই বলল, একেবারে না আসার চাইতে দেরিতে আসাও ভালো।
বলনাচের আসর নয়, নাচের কথা ঘোষণাও করা হয়নি, কিন্তু সকলেই জানে যে ক্যাথারিন পেত্ৰভনা ক্ল্যাভিকর্ডে ভালস ও একোসাস বাজাবে, নাচও হবে; তাই সকলেই সেজন্য তৈরি হয়েই এসেছে।
১৮১২ সালের মফঃস্বলের জীবনযাত্রা যথাপূর্বভাবেই চলেছে; শুধু তফাতের মধ্যে মস্কো থেকে অনেক সম্পন্ন পরিবার সেখানে চলে আসায় জীবনযাত্রা অধিকতর প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে এবং রাশিয়ার অন্য সব জায়গার মতোই একটা বিশেষ রকমের বেপরোয়া যাহা বাহান্ন তাহা তিপ্পান্ন ভাব দেখা দিয়েছে; ফলে সাধারণ কথাবার্তায় আবহাওয়া ও কুশল-বিনিময়ের পরিবর্তে স্থান পেয়েছে মস্কো, সেনাদল ও নেপোলিয়ন।
ভরোনেঝের সেরা মানুষরাই শাসনকর্তার বাড়িতে জমায়েত হয়েছে।
হুজার ইউনিফর্মে সজ্জিত হয়ে চারদিকে আতর ও মদের সুগন্ধ ছড়িয়ে যেমুহূর্তে নিকলাস ঘরে ঢুকল এবং মুখে উচ্চারণ করল একেবারে না আসার চাইতে বিলম্বে আসাও ভালো আর অন্য অনেকের মুখে কথাটার পুনরাবৃত্তি হল, সঙ্গে সঙ্গেই সকলে তাকে ঘিরে ধরল; সকলেরই দৃষ্টি তার উপর। নিকলাসের মন বলল, এখানে এসে যথাযোগ্য স্থানটি সে পেয়েছে–সকলেরই প্রিয়পাত্র হয়েছে : দীর্ঘ কৃসাধনের পরে এ পরিস্থিতি বড়ই মনোরম, একেবারে নেশা ধরিয়ে দেবার মতো। ডাক-ঘাঁটিতে, সরাইখানায়, জোতদারের ঘরে–সর্বত্রই কুমারীরা তাকে দর্শন করে কৃতার্থ হয়েছে; এখানে শাসনকর্তার মজলিসেও বিবাহিত-অবিবাহিত অসংখ্য সুন্দরী তরুণী একটুখানি চোখের চাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছে। প্রথম দিনেই নারী ও বালিকারা তার সঙ্গে হাসি-খেলায় মেতেছে, আর এই সুদর্শন বেপরোয়া হুজার যুবকটিকে কেমন করে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ করা যায় তাই নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে। তাদের মধ্যে শাসনকর্তার স্ত্রীও একজন; সে তো প্রথম থেকেই প্রস্তভকে নিকট আত্মীয় হিসেবে গ্রহণ করে তাকে নিকলাস বলে ডাকতে শুরু করেছে।
সত্যি সত্যি ক্যাথারিন পেত্ৰভনা ভালস ও একোসাস বাজাল এবং নাচও চলল। সে নাচে অংশ নিয়ে নিকলাস তার সাবলীল দেহভঙ্গিতে মফঃস্বল শহরটিকে আরো বেশি মুগ্ধ করে ফেলল। এমন কি নিকলাস নিজেও সে রাতে নিজের নাচ দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেল। এত ভালো তো সে মস্কোতেও কোনো দিন নাচেনি।
সারা সন্ধ্যা নিকলাসের মনোযোগ কেড়ে নিল একটি নীলনয়না, মোটা-সোটা, মনোরমা সুন্দরী; মফঃস্বলের জনৈক পদস্থ অফিসারের স্ত্রী। অপর লোকের সব স্ত্রীরাই যুবকদের জন্য সৃষ্ট হয়েছে-খুশি-খুশি যুবক-মনের এই সরল প্রত্যয়ের বশেই রস্তভ কখনো সেই মহিলাটির সঙ্গ ছাড়ল না, আর তার স্বামীর সঙ্গে এমন ভাব জমিয়ে তুলল যে মুখে না বললেও তারা দুজনেই বুঝতে পেরেছে যে নিকলাস ও এই মহিলাটির মধ্যে ভাবটা বেশ জমবে। স্বামীটি কিন্তু মোটেই এ প্রত্যয়ের অংশীদার হল না; অতীব বিষণ্ণভাবেই সে । রস্তভের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে লাগল। কিন্তু নিকলাসের দিলখোলা ব্যবহার এতই বাঁধ-ভাঙা হয়ে দেখা দিল যে অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে বারকয়েক নিকলাসের হাসি-তামাশায় যোগ দিতে হল। সন্ধ্যার শেষের দিকে অবশ্য স্ত্রীর মুখ যতই রক্তিম ও উচ্ছ্বসিত হতে লাগল, স্বামীটির মুখ ততই বিষণ্ণ ও গম্ভীর হতে থাকল; যেন তাদের দুজনের জন্য একটা নির্দিষ্ট প্রাণ-শক্তির বরাদ্দ আছে, আর তাই স্ত্রীর প্রাণ-শক্তি যত বাড়তে থাকে, স্বামীর প্রাণ-শক্তি ততই হ্রাস পায়।
