তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে এড-ডি-কং, ডাক্তার ও চাকররা; গির্জার মতোই এখানেও স্ত্রী ও পুরুষরা আলাদা-আলাদা দাঁড়িয়েছে। সকলেই নীরবে ক্রুশ-চিহ্ন আঁকছে; শুধু শোনা যাচ্ছে গির্জার অনুষ্ঠান, গম্ভীর অনুচ্চ প্রার্থনা, আর দীর্ঘশ্বাস ও পায়ের খসখস শব্দ। আন্না মিখায়লভনা মেঝেটা পেরিয়ে পিয়েরের কাছে গিয়ে তার হাতে একটা মোমবাতি দিল। সেটাকে জ্বালিয়ে সেও মোমবাতি ধরা হাতেই ক্রুশ-চিহ্ন আঁকতে লাগল।
গোলাপি গাল, হাসিখুশি ছোট প্রিন্সেস সোফি তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটি হেসে রুমালে মুখ ঢাকল; কিছুক্ষণ ঢেকে রাখার পরে আবার মুখ তুলে পিয়েরকে দেখে হাসতে লাগল। সে যেন না হেসে তার দিকে তাকাতেই পারছে না, আবার না তাকিয়েও পারছে না; তাই লোভ সংবরণ করবার জন্য নিঃশব্দে একটা স্তম্ভের পাশে সরে গেল। অনুষ্ঠান চলার মাঝপথেই পুরোহিতদের গলা হঠাৎ থেমে গেল, নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি করল, আর যে বুড়ো চাকরটি কাউন্টের হাত ধরে ছিল সে উঠে গিয়ে মহিলাদের কি যেন বলল। আন্না মিখায়লভনা এগিয়ে গিয়ে মুমূর্ষ লোকটির উপরে ঝুঁকে পড়ে মুখ ফিরিয়ে লোরেনকে ইশারায় ডাকল। ফরাসি ডাক্তারটির হাতে মোমবাতি নেই; একটা স্তম্ভের গায়ে হেলান দিয়ে সে সসম্ভম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে; যেন বোঝাতে চাইছে, বিদেশী হলেও এ সব অনুষ্ঠানের গুরুত্ব সে বোঝে এবং তার সমর্থনও করে। এবার সে নিঃশব্দে পা ফেলে রোগীর কাছে এগিয়ে গেল এবং সবুজ লেপের উপর থেকে খালি হাতটা তুলে ধরে তার নাড়িতে হাত রেখে এক মুহূর্ত কি যেন ভাবল। রোগীকে কিছু পানীয় দেওয়া হলো; সকলের মধ্যে একটা উত্তেজনা দেখা গেল; তারপরই সকলে যে যার জায়গায় চলে গেল; আবার অনুষ্ঠান শুরু হল। এই বিরতির সময় পিয়ের লক্ষ্য করল, প্রিন্স ভাসিলি চেয়ারটা ছেড়ে দিয়েও মুমূর্ষ লোকটির কাছে না গিয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে বড় প্রিন্সেসকে সঙ্গে নিয়ে ঘরের সেইদিকটায় চলে গেল যেখানে সিল্কের মশারিতে ঢাকা উঁচু খাটটা রয়েছে। বিছানার কাছ থেকে প্রিন্স ভাসিলি ও বড় প্রিন্সেস দুজনেই পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল এবং অনুষ্ঠান শেষ হবার আগেই পর পর ঘরে ঢুকে নিজ নিজ জায়গায় দাঁড়াল। পিয়ের এই ঘটনাটির প্রতি অন্য সব ঘটনার চাইতে বেশি মনোযোগ দিল না; সে ধরেই নিয়েছে যে এখানে এই সন্ধ্যায় যা কিছু ঘটছে সবই একান্ত প্রয়োজনীয়।
পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণ শেষ হলো; তারা মুমূর্ষ লোকটির শুভ কামনা করল। সে মানুষটি কিন্তু পূর্ববৎই নিজীব ও নিশ্চল হয়ে পড়ে রইল। চারপাশে সকলেই নড়াচড়া শুরু করল; পায়ের শব্দ ও ফিসফিস শব্দ শোনা গেল; সবচাইতে স্পষ্ট শোনা গেল আন্না মিখায়লভনার গলা।
পিয়ের তাকে বলতে শুনল : ওকে অবশ্যই বিছানায় নিয়ে যেতে হবে; এখানে তো অসম্ভব যে…
ডাক্তার বা প্রিন্সেসরা, আর চাকররা রোগীকে এমনভাবে ঘিরে ধরেছে যে পিয়ের এখন আর তার রক্তিমাভ হলুদ মুখ ও সাদা চুল দেখতে পাচ্ছে না, যদিও অন্য সব মুখের দিকে চোখ থাকলেও এতক্ষণ মুহূর্তের জন্য সে ঐ মুখটার উপর থেকে তার দৃষ্টিকে সরায় নি। সকলের সতর্ক চলাফেরা দেখেই সে বুঝে নিল যে তারা মুমূর্ষ লোকটিকে ইনভ্যালিড-চেয়ার থেকে তুলে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছে।
সে শুনতে পেল একটি চাকর সভয়ে ফিসফিস কর বলে উঠল, আমার হাতটা ধর, নইলে তুমি ওঁকে ফেলে দেবে! নিচ থেকে ধর, এখানে! অনেকের গলা শোনা গেল। বাহকদের ঘন ঘন নিঃশ্বাস ও দ্রুততর পায়ের শব্দে বোঝা গেল, যাকে তারা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার ওজনটা তাদের পক্ষে বড় বেশি ভারী।
বাহকদের মধ্যে আন্না মিখায়লভনাও একজন; তাদের মাথা ও পিঠের ফাঁক দিয়ে মুহূর্তের জন্য মুমূর্ষ লোকটির উঁচু, মজবুত, খোলা বুক ও ঘাড় এবং কোকড়ানো সাদা চুলে ভরা সিংহসদৃশ মাথাটা পিয়েরের দৃষ্টিগোচর হল। সেই মাথাটি, তার চওড়া ভুরু ও চোয়ালের হাড়, তার সুন্দর, আকর্ষণীয় মুখ, তার নিরুত্তাপ, বিষণ্ণ অথচ মহান ভঙ্গিমা-কোনো কিছুর উপরেই আসন্ন মৃত্যুর ছায়া পড়ে নি। তিন মাস আগে কাউন্ট যখন তাকে পিটার্সবুর্গে ডেকে পাঠিয়েছিল তখন পিয়ের তাকে যেমনটি দেখেছিল সব তেমনই আছে। কিন্তু এখন বাহকদের অসমান পদক্ষেপের ফলে মাথাটি অসহায়ভাবে এপাশ-ওপাশ দুলছে; অর্থহীন দৃষ্টি যেন শূন্যে নিবদ্ধ হয়ে আছে।
উঁচু খাটটার পাশে কয়েক মিনিট হৈ-চৈ চলল; তারপরেই বাহকরা ঘর থেকে চলে গেল। পিয়েরের হাতটা ছুঁয়ে আন্না মিখায়লভনা বলল, এস। তার সঙ্গে পিয়ের বিছানার কাছে গেল। সদ্যসমাপ্ত অনুষ্ঠানের উপযোগী রাজকীয় ভঙ্গিতে রোগীকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। বালিশ দিয়ে মাথাটাকে উঁচু করে রাখা হয়েছে। হাত দুখানিকে সমানভাবে সিল্কের সবুজ লেপটার উপর রেখে দেওয়া হয়েছে। পিয়ের যখন সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তখন কাউন্ট সোজা তার দিকে তাকাল, কিন্তু সে দৃষ্টির ভাষা তো কোনো মরণশীল মানুষের পক্ষে বোধগম্য নয়। হয় সে দৃষ্টি একান্তই অর্থহীন, চোখ আছে বলেই কিছু না কিছু দেখা মাত্র, অথবা সে দৃষ্টি বড় বেশি অর্থবহ। কি করবে বুঝতে না পেরে সে জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে মহিলাটির দিকে তাকাল। আন্না মিখায়লভনা তাড়াতাড়ি রোগীর হাতের দিকে তাকিয়ে এবং নিজের ঠোঁট নেড়ে ইশারায় তাকে বুঝিয়ে দিল যে চুমো খেতে হবে। পিয়ের সাবধানের এমনভাবে গলাটা বাড়াল যাতে লেপটাকে স্পর্শ করতে না হয়; তারপর মহিলার নির্দেশ মতো কাউন্টের চওড়া-হাড়, মাংসল হাতের উপর ঠোঁট চেপে ধরল। কি কাউন্টের হাত, কি তার মুখের একটি পেশী-কিছুই এতটুকু কাঁপল না। এবার কি করতে হবে জানবার জন্য পিয়ের আবার আন্না মিখায়লভনার দিকে তাকাল। মহিলা চোখের ইশারায় বিছানার পাশে একটা চেয়ার দেখিয়ে দিল। পিয়ের অনুগতভাবে চেয়ারে বসে মহিলার দিকে তাকাল, যেন জানতে চাইল সে ঠিক কাজ করেছে কি না। আন্না মিখায়লভ সমর্থনসূচকভাবে ঘাড় নাড়ল। পিয়ের মিশরীয় প্রস্তর-মূর্তির মতো চুপচাপ বসে রইল; যেন তার অগোছালো শক্ত শরীরটা ঘরের অনেকখানি জায়গা জুড়ে থাকায় সে বড়ই বিব্রত বোধ করছে এবং নিজেকে যথাসম্ভব হোট করে রাখতে চেষ্টা করছে। আবার কাউন্টের দিকে তাকাল; বসবার আগে পিয়েরের মুখটা যেখানে ছুঁয়ে ছিল এখনো সেই জায়গাটাতেই কাউন্টের দৃষ্টি নিবদ্ধ। পিতা-পুত্রের মিলনের এই শেষ মুহূর্তগুলির সকরুণ গুরুত্ব সম্পর্কে সে যে সম্পূর্ণ সচেতন, আন্না মিখায়লভনা হাবেভাবেই তা বুঝিয়ে দিল। এইভাবে দুমিনিট কাটল; পিয়েরের মনে হল যেন একটি ঘণ্টা। সহসা মুখের চওড়া পেশী ও রেখাগুলি কাঁপতে লাগল। কাপনটা বাড়তেই লাগল; সুন্দর মুখখানি একদিকে বেঁকে গেল (এই প্রথম পিয়ের বুঝতে পারল তার বাবা মৃত্যুর কত কাছে এসে পড়েছে); আর সেই বিকৃত মুখের ভিতর থেকে একটা অস্পষ্ট, কর্কশ শব্দ বেরিয়ে এল। রুগ্ন লোকটি কি চাইছে বুঝবার জন্য আন্না মিখায়লভনা সাগ্রহে তার চোখের দিকে তাকাল; প্রথমে পিয়েরকে দেখাল, তারপরে কিছু পানীয় দেখাল, ফিসফিস করে প্রিন্স ভাসিলির নাম করল, লেপটা দেখাল। রোগীর চোখে-মুখে অধৈর্য ফুটে উঠল। খাটের মাথার দিকে যে চাকরটি সর্বক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে, রোগী তার দিকে তাকাতে চেষ্টা করল।
