ভুরু কুঁচকে সম্রাট থামল।
এইসব কথা শুনে এবং সম্রাটের চোখে দৃঢ় সংকল্পের আভাস দেখে মিচদ-বিদেশী হলেও যে মনে-প্রাণে রুশ-সেই মহামুহূর্তটিকে অনুভব করল যে কথাগুলি তাকে সম্মোহিত করেছে, এবং যে রুশ জাতির প্রতিভূ বলে সে নিজেকে মনে করে তাদের এবং নিজের মনোভাবকে নিম্নোক্ত ভাষায় প্রকাশ করল;
মহাশয়! এই মুহূর্তে ইয়োর ম্যাজেস্টি স্বাক্ষর করলেন জাতির গৌরব ও ইওরোপের মুক্তির দলিলে!
মাথাটা কাত করে সম্রাট তাকে বিদায় দিল।
.
অধ্যায়-৪
আমরা যারা সেইসব দিনগুলিতে বেঁচে ছিলাম না তাদের পক্ষে এটা কল্পনা করা স্বাভাবিক যে অর্ধেক রাশিয়া যখন বিজিত হয়েছে, তার অধিবাসীরা যখন দূর দূর দেশে পালিয়ে যাচ্ছে, পিতৃভূমি রক্ষার জন্য যখন একটার পর একটা বাধ্যতামূলক সেনাদল গড়ে তোলা হচ্ছে, তখন উচ্চতম থেকে নিম্নতম মর্যাদার সমস্ত রুশ অধিবাসী নিজেদের বিসর্জন দিচ্ছে, পিতৃভূমিকে রক্ষা করছে, আর না হয়তো তার পতনে চোখের জল ফেলছে। সে সময়কার কাহিনী ও বিবরণে ব্যতিক্রমবিহীনভাবে শুধুমাত্র রুশদের আত্মত্যাগ, দেশাত্মবোধ, হতাশা, দুঃখ, বীরত্বের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত অবস্থাটা সেরকম ছিল না। আমাদের কাছে সেইরকমই মনে হয় কারণ আমরা শুধু দেখি তঙ্কালীন ঐতিহাসিক স্বার্থ, সমকালীন মানুষের যেসব ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল সেদিকে নজর দেই না। অথচ বাস্তবক্ষেত্রে সেই মুহূর্তের ব্যক্তিগত স্বার্থগুলি সাধারণ স্বার্থকে এত বেশি মাত্রায় ছাড়িয়ে যায় যে তার ফলে সাধারণ স্বার্থগুলিকে আমরা না পারি বুঝতে, না পারি দেখতে। তৎকালীন অধিকাংশ মানুষই ঘটনার সাধারণ অগ্রগতির দিকে দৃষ্টি না দিয়ে তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারাই পরিচালিত হয়েছে, আর তকালে তাদের কার্যকলাপই ছিল সবচাইতে দরকারি।
যারা সাধারণ ঘটনাপ্রবাহকে বুঝতে এবং আত্মত্যাগ ও বীরত্বের সঙ্গে তাতে অংশ নিতে চেষ্টা করল, তারা সবকিছুকেই দেখল উল্টো করে, আর সাধারণের ভালোর জন্য যা কিছু করল সবই অদরকারি ও নির্বোধের কাজ হয়ে দেখা দিল-যেমন পিয়ের ও মমোনভ-এর রেজিমেন্টগুলি রুশ গ্রামগুলিতে লুঠতরাজ চালাল, আর তরুণীরা ঘরে ঘরে যেসব ব্যান্ডেজ তৈরি করল তা কোনোদিন আহতদের কাছে পৌঁছল না, ইত্যাদি। ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর ক্ষেত্রে জ্ঞান বৃক্ষের ফলভক্ষণের উপর যে নিষেধাজ্ঞা প্রচলিত আছে সেটাই বিশেষভাবে প্রযোজ্য। একমাত্র অচেতন কাজকর্মগুলিই ফলপ্রসূ হয়, আর যে মানুষ ঐতিহাসিক ঘটনায় অংশগ্রহণ করে সে কদাপি তার তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে। সে চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়।
তৎকালীন রাশিয়ার ঘটনাবলীর সঙ্গে যে মানুষ যত বেশি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েছিল তার তাৎপর্য সে তত কম বুঝেছে। পিটার্সবুর্গে এবং মস্কো থেকে অনেক দূরবর্তী প্রদেশগুলিতে মহিলা ও অসামরিক ইউনিফর্মধারী ভদ্রজনরা রাশিয়া ও তার রাজধানীর জন্য চোখের জল ফেলল, আত্মত্যাগের কথা বলল; কিন্তু যে সেনাবাহিনী মস্কো ছেড়ে চলে গিয়েছিল তারা মস্কো নিয়ে কথাবার্তা বা চিন্তাভাবনা থোরাই করেছিল; মস্কোর অগ্নিদগ্ধ ধ্বংসাবশেষ আবার যখন তাদের দৃষ্টিগোচর হল তখন ফরাসিদের উপর প্রতিশোধ নেবার প্রতিজ্ঞা কেউ নিল না, বরং তারা শুধু ভেবেছিল নিজেদের বেতন, বাসস্থান, মদবিক্রিকারিণী মাত্ৰিস্কা ও অন্য সব অনুরূপ কথা।
যুদ্ধের চাকরিতে লিপ্ত হবার পরে নিকলাস রস্তভও দেশরক্ষার কাজে ঘনিষ্ঠভাবে দীর্ঘদিন ধরে অংশ নিল, কিন্তু তার মনে আত্মত্যাগের কোনো উদ্দেশ্য না থাকায় রাশিয়ার ঘটনাবলীকে সে দেখেছে নৈরাশ্যহীনভাবে, আর তা নিয়ে সে নিজে কোনোরকম মাথাও ঘামায়নি। তার বক্তব্য, মাথা ঘামাবার জন্য তো কুতুজভ ও অন্যরাই রয়েছে।
এইরকম মানসিক অবস্থার মধ্যেই সে জানতে পারল যে তার ডিভিশনের জন্য ঘোড় কিনতে তাকে ভরোনেঝ পাঠানো হবে। খবর পেয়ে যুদ্ধে যোগনো দিতে না পারার জন্য কোনোরকম দুঃখ তো তার হলই না, বরং সে খুব খুশিই হল; আর সেকথা সে গোপনও করল না।
বরদিনোর যুদ্ধের কয়েকদিন আগে প্রয়োজনীয় টাকাপয়সা ও ক্ষমতাপত্র হাতে পেয়ে কয়েকজন হুজারকে আগাম পাঠিয়ে দিয়ে নিজে ডাক-ঘোড়ার সঙ্গে ভরোনেঝ যাত্রা করল।
সেনাদল কর্তৃক অশ্বাদি পশুর খাদ্যসংগ্রহের কার্যকলাপ, খাদ্যবাহী ট্রেনের চলাচল ও হাসপাতালসমাকীর্ণ অঞ্চল থেকে দূরে চলে যেতে পারার কী অপার আনন্দ যে নিকলাস পেল তা শুধু সেই বুঝবে যার নিজের সে অভিজ্ঞতা হয়েছে–অর্থাৎ একাদিক্রমে কয়েকটা মাস যাকে কাটাতে হয়েছে অভিযান ও যুদ্ধের পরিবেশের মধ্যে। সৈন্য, মালগাড়ি ও শিবিরের নোংরা পরিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে সে যখন গ্রামের মধ্যে পৌঁছে গেল, দেখতে পেল চাষী স্ত্রী-পুরুষ, ভদ্র লোকদের পল্লীভবন, মাঠে মাঠে গরু-মোষ চরছে, ডাকঘরে স্টেশন মাস্টাররা ঘুমচ্ছে, তখন তার এত আনন্দ হল যেন এসব বস্তু সে এই প্রথম দেখছে। অনেক সময় পর্যন্ত যা তাকে বিশেষভাবে বিস্মিত ও আনন্দিত করল তা হল–স্বাস্থ্যবতী তরুণীদের পিছনে ডজন-ডজন অফিসার এখানে ঘুরঘুর করছে না; বরং একজন অফিসার পথে যেতে যেতে তাদের সঙ্গে হাসি-তামাশা করায় তারা বেশ খুশিই হচ্ছে।
খুব খুশি মনে রাতের বেলা নিকলাস ভরোনেঝ-এর একটা হোটেলে উঠল, শিবির-জীবনে অনেকদিন যেসব জিনিস পায়নি তার হুকুম দিল, এবং পরদিন পরিষ্কার করে কামিয়ে অনেকদিন পরে পুরো ইউনিফর্ম পরে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে গেল।
