স্টোন দ্বীপের রাজপ্রাসাদের পাঠকক্ষে সম্রাট সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে দেখা করল। অভিযানের আগে মিচদ কখনো মস্কো দেখেনি, সে রুশ ভাষাও জানে না, তথাপি প্রদগ্ধ মস্কোর আগুনের শিখায় সারা পথ এসে মহামান্য সম্রাটকে মস্কোর ভস্মীভূত হবার কথা জানাতে সে খুবই বিচলিত হয়ে পড়ল। তার বিষণ্ণ মুখ দেখেই সম্রাট শুধাল, আপনি কি কোনো খারাপ সংবাদ এনেছেন কর্নেল?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ নিচু করে মিচদ বলল, খুব খারাপ খবর মহাশয়। মস্কো পরিত্যক্ত হয়েছে।
সম্রাটের মুখ হঠাৎ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল; সে সঙ্গে সঙ্গে শুধাল, তারা কি বিনা যুদ্ধে আমার রাজধানী ছেড়ে এসেছে?
মিচদ সসম্মানে কুতুজভের বাণীটিই তার কাছে প্রকাশ করল : মস্কোতে যুদ্ধ করা ছিল অসম্ভব; সেনাবাহিনী ও মস্কো দুটোকেই হারানো অথবা শুধু মস্কোকে হারানো মাত্র এই দুটি বিকল্পই সামনে ছিল, আর ফিল্ড-মার্শাল দ্বিতীয়টি বেছে নিয়েছে।
মিচদের দিকে না তাকিয়েই সম্রাট নীরবে তার কথা শুনল।
জানতে চাইল, ফরাসিরা কি নগরে প্রবেশ করেছে?
হ্যাঁ মহাশয়, মস্কো এখন ভস্মে পরিণত হয়েছে। আমি যখন মস্কো ছেড়ে আসি তখন সারা নগর জ্বলছে, দৃঢ়কণ্ঠে মিচদ জবাব দিল, কিন্তু তারপরেই সম্রাটের দিকে তাকিয়ে সে কৃতকর্মের জন্য ভীত হয়ে পড়ল।
সম্রাট শ্বাস টানছে দ্রুত, অতি দ্রুত, তার নিচের ঠোঁটটি কাঁপছে, দুটি নীল চোখ সঙ্গে সঙ্গে জলে ভরে উঠেছে।
কিন্তু সে মুহূর্তের ঘটনা। হঠাৎ তার চোখ ভ্রুকুটিকুটিল হয়ে উঠল, যেন এই দুর্বলতা প্রকাশের জন্য নিজেকেই দোষী করছে। মাথা তুলে দৃঢ়স্বরে মিচদকে বলল, যা কিছু ঘটছে তা থেকেই বুঝতে পারছি কর্নেল যে আমাদের প্রভূত ত্যাগ স্বীকার করানোই বিধাতার ইচ্ছা।…সর্বব্যাপারে তাঁর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে আমি প্রস্তুতঃ কিন্তু মিচদ, আমাকে বলুন, তাদের চোখের সামনে যখন আমার প্রাচীন রাজধানী বিনা যুদ্ধে পরিত্যক্ত হল তখন সেনাদলকে আপনি কি অবস্থায় দেখে এলেন? কোনো সাহসের অভাব কি আপনি লক্ষ্য করেছেন?…
মিচদ যখন দেখল যে মহামান্য নৃপতি শান্ত হয়েছে, তখন সেও শান্ত হল, কিন্তু ম্রাটের সোজাসুজি প্রশ্নের যে সোজাসুজি জবাব দেওয়া দরকার তার জন্য তখনই নিজেকে প্রস্তুত করতে পারল না।
সময় কাটাবার জন্য প্রশ্ন করল, মহাশয়, একজন রাজভক্ত সৈনিকের পক্ষে উপযুক্তভাবে খোলাখুলি কথা বলবার অনুমতি কি আমাকে দেবেন?
সম্রাট জবাব দিল, সবসময় আমি তাই চাই কর্নেল। আমার কাছে কিছুই লুকোবেন না, প্রকৃত অবস্থাটা আমি জানতে চাই।
মনে মনে একটা সদুত্তর তৈরি করে ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসি ফুটিয়ে মিচদ বলল, মহাশয়, আমি যখন সেনাদলকে ছেড়ে চলে আসি তখন প্রধানতম ব্যক্তি থেকে নিম্নতম সৈনিকটি পর্যন্ত প্রত্যেককেই দেখেছি এক বেপরোয়া, যন্ত্রণাদীর্ণ আতঙ্কে…
কঠোর ভ্রূভঙ্গিসহকারে সম্রাট তাকে বাধা দিল, সে কি? দুর্ভাগ্য কি আমার রুশ সেনাদলের মনোবলও ভেঙে দেবে?…কখনো না।
নিজের তৈরি-করা কথাগুলি বলার জন্য মিচদ এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল।
সসম্ভ্রমে বলল, মহাশয়, আপনার সরল হৃদয়ের বশে পাছে আপনি সন্ধি করতে সম্মত হন এটাই তাদের একমাত্র ভয়। রুশ জাতির এই প্রতিনিধিটি সগর্বে ঘোষণা করল, যুদ্ধের জন্য এবং তারা যে আপনার প্রতি কত অনুরক্ত, নিজেদের জীবন দিয়ে সেটা প্রমাণ করবার জন্য তাদের বুকের মধ্যে আগুন জ্বলছে…।
আঃ। পরম নিশ্চিন্ত হয়ে দুচোখে মমতার আলো ফুটিয়ে সম্রাট মিচদের কাঁধটা চাপড়ে দিল। আপনি আমাকে বড়ই স্বস্তি দিলেন কর্নেল।
মাথা নিচু করে সম্রাট কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপরেই সোজা হয়ে বসে মিচদকে উদ্দেশ করে রাজকীয় ভঙ্গিতে বলল, বেশ, তাহলে সেনাদলে ফিরে যান; যেখানেই যাবেন সেখানেই আমার সাহসী সৈনিক ও ভালো মানুষ প্রজাদের বলবেন, যখন আর একটি সৈনিকও অবশিষ্ট থাকবে না তখন আমি স্বয়ং আমার প্রিয় অভিজাত সম্প্রদায় ও চাষীদের নেতৃত্ব দেব, আমার সাম্রাজ্যের শেষ শক্তিটুকুকেও কাজে লাগাব। ক্রমাগত উজ্জীবিত হয়ে সম্রাট বলতে লাগল, আমার দেশ যে এখনো আমাকে কী দিতে পারে সে ধারণা শত্রুর নেই। আবেগোচ্ছল সুন্দর চোখ দুটি আকাশের দিকে তুলে বলল, কিন্তু বিধাতার যদি এই বিধান হয় যে আমার পিতৃ পুরুষের সিংহাসনে আমার বংশধররা আর বসবে না, তাহলে আমার যথাসর্বস্ব নিঃশেষ করে দিয়ে এতদূর পর্যন্ত দাড়ি গজিয়ে (বুকের অর্ধেকটা পর্যন্ত দেখাল) আমার দীনতম প্রজার সঙ্গে একসাথে বসে শুধু আলু খাব, তবু আমার দেশের এবং আমার প্রিয় মানুষদের অসম্মানে স্বাক্ষর করব না।
উত্তেজিত কণ্ঠে এই কথাগুলি বলে বুঝি বা নিজ চোখের উদাত অশ্রুকে মিচদের কাছ থেকে লুকোবার জন্যই সম্রাট সহসা মুখটা ঘুরিয়ে ঘরের এক কোণে চলে গেল। কয়েক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে সম্রাট মিচদের কাছে ফিরে গেল এবং তার কনুই-এর নিচে ধরে প্রবল বেগে ঝাঁকুনি দিতে লাগল। সম্রাটের সুদর্শন মুখখানি লাল হয়ে উঠেছে; দৃঢ় সংকল্পে ও ক্রোধে চোখ দুটি জ্বলছে।
কর্নেল মিচদ, আজ যা বললাম সেকথা ভুলে যাবেন না, হয়তো একদিন আনন্দের সঙ্গে কথাগুলি আমরা স্মরণ করতে পারব…হয় নেপোলিয়ন, না হয় আমি, বুকে হাত দিয়ে সম্রাট বলল, দুজন একসঙ্গে আর আমরা রাজত্ব করতে পারি না। তাকে আমি চিনতে পেরেছি; সে আমাকে আর ঠকাতে পারবে না…
