দরবারের সভাসদদের এই খুশির দুটি কারণ-সম্রাটের জন্মদিনে পাওয়া সংবাদ এবং জয়লাভের ঘটনা। এ যেন একটা সার্থক পরিকল্পনাপ্রসূত বিস্ময়। কুতুজভের প্রতিবেদনে রুশ ক্ষয়-ক্ষতিরও উল্লেখ ছিল; ছিল তুচকভ, ব্যাগ্রেশন ও কুতাসভের নাম। অবশ্য পিটার্সবুর্গ মহলে এই দুঃখজনক ব্যাপারটার একটি মাত্র ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আলোচনা চলতে লাগল : সেটা কুতাসভের মৃত্যু। প্রত্যেকে তাকে চিনত, সম্রাট তাকে পছন্দ করত, সে ছিল বয়সে নবীন ও আকর্ষণীয়। সেদিন প্রত্যেকের মুখে একটি কথাই শোনা গেল :
কী আশ্চর্য যোগাযোগ! ঠিক প্রার্থনা-অনুষ্ঠানের সময়েই। কিন্তু কুতাসভ কী ক্ষতিটাই না করে গেল। কত যে দুঃখ পেয়েছি!
ভবিষ্যদ্বক্তার গর্ব নিয়ে ভাসিলি বলল, কুতুজভ সম্পর্কে আপনাদের আমি কি বলেছিলাম? আমি আগাগোড়াই বলে এসেছি যে এই একমাত্র লোক যে নেপোলিয়নকে পরাস্ত করতে সক্ষম।
কিন্তু পরের দিন সেনাদল থেকে কোনো সংবাদ এল না। জনসাধারণের মনে উদ্বেগ দেখা দিল। উৎকণ্ঠায় সম্রাটের দুঃখ বাড়তে লাগল; দুঃখ বাড়ল সভাসদদেরও।
সম্রাটের অবস্থাটা একবার কল্পনা করুন! তারা বলাবলি করতে লাগল; আর আগের দিনের মতো কুতুজভের প্রশংসায় পঞ্চমুখ না হয়ে সম্রাটের এই উৎকণ্ঠার জন্য তাকেই দোষী করল। প্রিন্স ভাসিলিও সেদিন কুতুজভকে নিয়ে গর্ব প্রকাশ করতে পারল না; প্রধান সেনাপতির প্রসঙ্গ উঠলেই চুপ করে থাকল। সন্ধ্যার দিকে আর একটা ভয়ংকর সংবাদ; এই উৎকণ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হল। সেই ভয়ংকর অসুখেই কাউন্টেস হেলেন বেজুখভা হঠাৎ মারা গেছে। বড় বড় জনসমাবেশে সরকারিভাবে সকলেই বলল যে অ্যানজায়না পেক্টোরিসের আক্রমণেই কাউন্টেস বেজুখভার মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু ঘনিষ্ঠ মহলে বিস্তারিত আলোচনা চলতে লাগল যে স্পেনের রানীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক বিশেষ ফল পাবার জন্য একটি বিশেষ ওষুধ অল্প মাত্রায় খেতে দিয়েছিল; কিন্তু বুড়ো কাউন্ট তাকে সন্দেহ করত বলে এবং স্বামী তার চিঠির কোনো জবাব দিত না বলে (হতভাগ্য, দুশ্চরিত্র পিয়ের) যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে হেলেন হঠাৎ সেই ওষুধটা বেশি মাত্রায় খেয়ে ফেলে এবং তার ফলেই কোনোরকম চিকিৎসার আগেই তীব্র যন্ত্রণায় তার মৃত্যু হয়েছে। আরো বলা হচ্ছে, প্রিন্স ভাসিলি ও বুড়ো কাউন্ট ইতালিয় ডাক্তারটির উপর ক্ষেপে গিয়েছিল, কিন্তু ডাক্তার হতভাগিনী মৃতার এমন সব চিঠি তাদের দেখিয়েছে যে তারা আর এ নিয়ে কোনোরকম উচ্চবাচ্য করেনি।
তিনটি দুঃখজনক ঘটনা নিয়েই সর্বত্র আলোচনা চলতে লাগল : সম্রাট কোনো সংবাদ পাচ্ছে না, কুতাসভের মৃত্যু হয়েছে, আর হেলেন শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছে। কুতুজভের প্রতিবেদনের পরবর্তী তৃতীয় দিনে একজন গ্রাম্য ভদ্রলোক মস্কো থেকে এসে পৌঁছলে ফরাসিদের কাছে মস্কোর আত্মসমর্পণের খবর শহরময় রটে গেল। অবস্থা ভয়ংকর! সম্রাটের কী অবস্থা! কুতুজভ বিশ্বাসঘাতক; মেয়ের মৃত্যু উপলক্ষে যারাই প্রিন্স ভাসিলির সঙ্গে দেখা করতে আসছে তাদের কাছেই পূর্বেকার কুতুজভের প্রশংসার কথা ভুলে গিয়ে তার সম্পর্কে সে বলতে লাগল, একটি অন্ধ, অকর্মণ্য বৃদ্ধের কাছ থেকে এছাড়া অন্য কিছু আশা করাই অসম্ভব ছিল।
আমি শুধু এই ভেবে অবাক হই যে এরকম একটা লোকের হাতে রাশিয়ার ভাগ্যকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
যতক্ষণ পর্যন্ত সংবাদটা বেসরকারি স্তরে ছিল ততক্ষণ তবু তাকে সন্দেহ করার একটা সম্ভাবনা ছিল; কিন্তু পরদিন কাউন্ট রস্তপচিনের কাছ থেকে এই চিঠি পাওয়া গেল :
প্রিন্স কুতুজভের অ্যাডজুটান্ট আমাকে যে চিঠিটা এনে দিয়েছে তাতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ অফিসাররা যেন সেনাদলকে রিয়াজান রোড ধরে পরিচালিত করেন। তিনি লিখেছেন, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে তিনি মস্কো পরিত্যাগ করে যাচ্ছেন। মহাশয়! কুতুজভের কাজের ফলে রাজধানীর ও আপনার সাম্রাজ্যের ভাগ্য নির্ণীত হয়ে গেল! যে নগর রাশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের কেন্দ্রভূমি, যে নগরে আপনার পিতৃপুরুষের ভস্ম সমাহিত হয়ে আছে, সেই নগর পরিত্যাগের সংবাদ শুনে সারা রাশিয়া শিউরে উঠবে! আমি সেনাবাহিনীকেই অনুসরণ : করব। সবকিছুই সরিয়ে দিয়েছি; এখন পিতৃভূমির ভাগ্যের জন্য অশ্রুজলই আমার একমাত্র সম্বল।
এই চিঠি পেয়ে সম্রাট নিম্নলিখিত আদেশসহ প্রিন্স বলকনস্কিকে কুতুজভের কাছে পাঠাল : প্রিন্স মাইকেল ইলারিয়োনভিচ! ২১শে অগস্টের পরে আপনার কাছ থেকে আর কোনো চিঠি পাইনি, অথচ ১লা সেপ্টেম্বর ইয়ারোস্লাভলের মারফত মস্কোর প্রধান সেনাপতির কাছ থেকে এই দুঃখজনক সংবাদ আমি পেয়েছি যে আপনি সসৈন্যে মস্কো পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই সংবাদের কি প্রতিক্রিয়া আমার উপর হয়েছে তা আপনি নিজেই কল্পনা করতে পারেন; আপনার নীরবতা আমার বিস্ময়কে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। সেনাবাহিনীর বর্তমান পরিস্থিতি এবং যে কারণে এই দুঃখজনক সিদ্ধান্ত নিতে আপনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন সে সম্পর্কে আপনার বক্তব্য শুনবার জন্য অ্যাডজুটান্ট-জেনারেল প্রিন্স বলকনস্কিকে দিয়ে এই চিঠি পাঠালাম।
.
অধ্যায়–৩
মস্কো পরিত্যাগের নদিন পরে সেই ঘটনার সরকারি ঘোষণাপত্র নিয়ে কুতুজভের এক দূত পিটার্সবুর্গে এসে পৌঁছল। ওই ফরাসি দূত মিচদ রুশ ভাষা জানত না; নিজের সম্পর্কে সে বলত, বিদেশী হলেও সে মনে-প্রাণে রুশ।
