ওঃ, কী ভয়ংকর ক্ষতিই না হবে; তিনি তো একটি মনোহারিণী স্ত্রীর।
ঠিক সেইসময় সেখানে হাজির হয়ে আন্না পাভলভনা বলল, আপনারা বেচারী কাউন্টেসের কথা বলছেন? খবর নিতে আমি লোক পাঠিয়েছিলাম, শুনলাম এখন কিছুটা ভালো। ওঃ, তিনি তো অবশ্যই পৃথিবীর মধ্যে সকলের চাইতে মনোরমা নারী। আমরা ভিন্ন দলের লোক, কিন্তু তাই বলে যে প্রশংসা তার প্রাপ্য তা তো জানাতেই হবে। তার ভাগ্যই খারাপ।
বিখ্যাত ডাক্তারদের না ডেকে একজন হাতুড়ে দিয়ে তার চিকিৎসা করানো হচ্ছে বলে একটি অনভিজ্ঞ যুবক বিস্ময় প্রকাশ করল। আন্না পাভলভনা সঙ্গে সঙ্গে তিক্ত কণ্ঠে বলে উঠল, আপনি হয়তো আমার চাইতে ভালো খবর রাখেন, কিন্তু খুব নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে আমি জেনেছি যে এই ডাক্তারটি খুব জ্ঞানী ও গুণী। তিনি স্পেনের রানীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক।
এইভাবে যুবকটিকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে আন্না পাভলভনা আর একটা দলের কাছে এগিয়ে গেল। সেখানে বিলিবিন অস্ট্রিয়দের নিয়ে কথা বলছে আর একটা রসিকতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
পেত্রপলে বীর উইগেনস্তিন ফরাসিদের কাছ থেকে যেসব অস্ট্রিয় পিটাকা হস্তগত করেছিল সেগুলি ভিয়েনায় পাঠাবার সময় তার সঙ্গে যে কূটনৈতিক চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল তার উল্লেখ করে বিলিবিন বলল, আমি তো মনে করি চিঠির মন্তব্যটি মজাদার।
কী? সেটা কী? আন্না পাভলভনা জানতে চাইল।
নিজের লেখা সেই কূটনৈতিক চিঠির আসল বয়ানটিই সে বলে দিল।
সম্রাট এই অস্ট্রিয় পতাকাগুলি ফেরৎ পাঠাচ্ছেন; বিপথে যাওয়া বন্ধুত্বপূর্ণ পতাকাগুলিকে ভুল পথের উপর পাওয়া গিয়েছিল, কথাগুলি শেষ করার পরে বিলিবিনের কুঞ্চিত ভুরু আবার সমান হয়ে গেল।
চমৎকার! চমৎকার! প্রিন্স ভাসিলি মন্তব্য করল। প্রিন্স হিপোলিৎত অপ্রত্যাশিতভাবে উঁচু গলায় বলল, ওয়ারস যাবার পথ বোধহয়। কথাটার অর্থ বুঝতে না পেরে সকলেই তার দিকে তাকাল। প্রিন্স হিপোলিতও পুলকিত বিস্ময়ে চারদিকে তাকাল। নিজের কথাগুলির অর্থ সে নিজেও ভালো করে জানে না। কূটনৈতিক চাকরি-জীবনে সে অনেকবার লক্ষ্য করেছে যে এই ধরনের আকস্মিক উক্তিকে সকলেই বুদ্ধির পরিচায়ক বলে মনে করে। যাই হোক, এই সময় আন্না পাভলভনা যার জন্য অপেক্ষা করে আছে সেই দেশাত্মবোধহীন লোকটি ঘরে ঢুকল, আর সেও হেসে প্রিন্স হিপোলিৎতের দিকে একটা আঙুল নেড়ে প্রিন্স ভাসিলিকে টেবিলের কাছে ডেকে নিয়ে গেল; তার হাতে দুটো মোমবাতি ও পাণ্ডুলিপিটা দিয়ে পাঠ শুরু করতে বলল। সকলেই নীরব হয়ে গেল।
প্রিন্স ভাসিলি পড়তে লাগল : মহামান্য রাষ্ট্রপ্রধান ও সম্রাট! মা যেভাবে আকুল সন্তানদের কোলে টেনে নেন, আমাদের প্রাচীন রাজধানী, নব জেরুজালেম মস্কোও সেইভাবে বরণ করছে তার খৃস্টকে-তার কথাটাকে সে বিশেষ জোর দিয়ে পড়ল–এবং কুয়াশার আবরণের ভিতর দিয়ে আপনার শাসনকালের উজ্জ্বল গৌরব প্রত্যক্ষ করে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় গেয়ে উঠেছে, হোসান্না; যিনি আসছেন তিনিই ধন্য!
প্রিন্স ভাসিলি শেষের কথাগুলি উচ্চারণ করল অশ্রুপূর্ণ স্বরে।
বিলিবিন মনোযোগ দিয়ে তার নখগুলি পরীক্ষা করতে লাগল। অন্য অনেককে দেখে মনে হল তারা যেন ভয় পেয়েছে। আন্না পাভলভনা পরবর্তী কথাগুলিকে ফিসফিস করে আগাম বলে দিল : ফ্রান্সের সীমান্ত হতে আগত সাহসী ও উদ্ধত গোলিয়াত…
প্রিন্স ভাসিলি পড়তে লাগল।
ফ্রান্সের সীমান্ত হতে আগত সাহসী ও উদ্ধত গোলিয়াত মৃত্যুবাহী ত্রাস দিয়ে রাশিয়াকে ঢেকে দিক; রুশ ডেভিডের হাতের গুলতিস্বরূপ বিনীত বিশ্বাস সহসা আঘাত করবে তার রক্তপিপাসু গর্বোদ্ধাত শিরে। ঈশ্বরের সেবক এবং প্রাচীনকালে আমাদের দেশের দুর্দিনের ত্রাণকর্তা মহাত্মা সের্গেইর দেবমূর্তিটি ইয়োর ইম্পিরিয়াল ম্যাজেস্টির হাতে অর্পণ করা হল। ঈশ্বরের কাছে আমার এই একান্ত প্রার্থনা, সর্বশক্তিমান যেন এই ন্যায়বান জাতির মাথা উঁচু রাখেন, করুণা করে ইয়োর ম্যাজেস্টির মনোবাসনা পূর্ণ করেন।
কী জোর! কী রচনাভঙ্গি! পাঠক ও লেখক দুয়েরই প্রশংসা-বাক্য উচ্চারিত হতে লাগল।
এই পাঠ শুনে উৎসাহিত হয়ে আন্না পাভলভনার অতিথিরা অনেকক্ষণ ধরে পিতৃভূমির অবস্থা নিয়ে আলোচনা করল এবং কয়েকদিনের মধ্যেই যে যুদ্ধ হবে তার ফলাফল নিয়ে নানারকম অনুমান করতে লাগল।
আন্না পাভলভনা বলল, ঠিক দেখবেন, আগামীকাল ম্রাটের জন্মদিনেই আমরা খবর পাব। আমার মনের পূর্বাভাস কিন্তু অনুকূল!
.
অধ্যায়-২
আন্না পাভলভনার পূর্বাভাস বাস্তবে রূপায়িত হল। পরদিন সম্রাটের জন্মদিন উপলক্ষে প্রাসাদ-গির্জায় যে প্রার্থনা-অনুষ্ঠান ছিল সেখানে প্রিন্স বলকনস্কিকে গির্জার বাইরে ডেকে এনে প্রিন্স কুতুজভের একটা চিঠি দেওয়া হল। যুদ্ধের দিনেই ততারিনভা থেকে কুতুজভ একটা প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। লিখেছে, রুশ সৈন্যরা এক পাও হটে যায়নি, আমাদের চাইতে ফরাসিদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অনেক বেশি, আর পুরো তথ্য সগ্রহ না করেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তাড়াতাড়িতে সে এই চিঠি লিখছে। বোঝাই যাচ্ছে যে জয়লাভ হবেই। সঙ্গে সঙ্গে গির্জা ছেড়ে চলে আসার আগেই সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানানো হল তার সহায়তা ও জয়লাভের জন্য।
আন্না পাভলভনার মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে। সারা সকাল শহরের বুকে একটা সানন্দ উৎসবের হাওয়া বইতে লাগল। সকলেই বিশ্বাস করল যে জয় সম্পূর্ণ হয়েছে, কেউ কেউ নেপোলিয়নের গ্রেপ্তার হওয়া, তার সিংহাসনচ্যুতি এবং ফ্রান্সের নতুন শাসনকর্তা মনোনয়নের কথাও বলতে লাগল।
