ওই স্ত্রীলোকটি কি চায়? অফিসার জানতে চাইল।
পিয়ের যেন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। যে ছোট মেয়েটিকে সে উদ্ধার করেছে তাকে দেখে তার বড়ই আনন্দ হল।
সে অস্ফুট গলায় বলল, ও কি চায়? ও আমার মেয়েটিকে নিয়ে এসেছে; এইমাত্র তাকে আমি আগুনের হাত থেকে বাঁচিয়েছি।…বিদায়! এই উদ্দেশ্যহীন, মিথ্যা কথাটা কেমন করে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল তা বুঝতে না পেরে সে বিজয়ীর দৃঢ় পদক্ষেপে ফরাসি সৈন্যদের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে চলল।
লুঠতরাজ থামাবার জন্য এবং বিশেষ করে যারা এই অগ্নিকাণ্ডের নায়ক-জনসাধারণের মতে তাদের বেশির ভাগই সেদিন এসেছিল ঊধ্বতন ফরাসি অফিসারদের ভিতর থেকেই তাদের ধরবার জন্য দুরোসনেলের হুকুমে মস্কোর বিভিন্ন রাস্তায় যেসব প্রহরীদল পাঠানো হয়েছিল, এই ফরাসি প্রহরীদল তাদেরই একটি। অনেক রাস্তায় ঘুরে ঘুরে প্রহরীদল সন্দেহক্রমে আরো পাঁচজন রুশকে গ্রেপ্তার করল : একটি ছোট দোকানদার, দুটি ছাত্র, একজন চাষী ও একজন গৃহ-ভৃত্য; তাছাড়া কিছু লুঠেরাও ছিল। কিন্তু এইসব নানা ধরনের সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের মধ্যে পিয়েরকেই ধরে নেওয়া হয়েছিল সবার চাইতে সন্দেহভাজন বলে। সেই রাতে তাদের সকলকে যখন নিয়ে আসা হল জুবভ প্রাচীরের উপরে অবস্থিত সেই বড় বাড়িটাতে যেটাকে রক্ষীনিবাস রূপে ব্যবহার করা হয়েছিল। তখন কড়া পাহারায় পিয়েরকে রাখা হল সকলের থেকে আলাদা করে।
১২. জটিল সংঘাত
দ্বাদশ পর্ব – অধ্যায়-১
সেইসময় পিটার্সবুর্গের উপরমহলে ফরাসি রুমায়ন্তসেভ, জারপন্থী মারিয়া ফীদরভনা ও অন্যদের দলের মধ্যে একটা জটিল সংঘাত ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, আর দরবার মহলের অলস মানুষদের গুনগুনানিতে সেটা চাপা পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু পিটার্সবুর্গের শান্ত, বিলাসবহুল জীবন কেবলমাত্র বাস্তব জীবনের অপচ্ছায়া ও চিন্তা নিয়েই ব্যস্ত : সে জীবন তার পুরনো পথ ধরেই চলেছে; ফলে রুশ জনগণের বিপদ ও কঠিন অবস্থার কথা। তাদের বোঝানো খুবই শক্ত। সেখানে চলেছে সেই একই অভ্যর্থনা-সভা ও বলনাচের আসর, ফরাসি থিয়েটার, রাজদরকারকে ঘিরে সেই স্বার্থ, চাকরি ও ষড়যন্ত্রের খেলা। কেবলমাত্র একেবারে উচ্চতম মহলে বাস্তব অবস্থার অসুবিধাগুলি স্মরণ করবার চেষ্টা হচ্ছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে দু সম্রাজ্ঞীর ভিন্ন ভিন্ন। ব্যবহারের নানা গল্প সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। সম্রাজ্ঞী মারিয়ার একমাত্র চিন্তা তার পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা নানা দাঁতব্য ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ; সে নির্দেশ দিয়েছে, ঐসব প্রতিষ্ঠানকে কাজানে সরিয়ে নিতে হবে, আর তাদের জিনিসপত্র বাধাছাদাও হয়ে গেছে। অবশ্য সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথকে যখন জিজ্ঞাসা করা হল তার কি নির্দেশ, তখন স্বভাবসিদ্ধ রুশ দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণায় সে জবাব দিল, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলি সম্পর্কে কোনো নির্দেশ সে দেবে না, কারণ সেটা রাষ্ট্রের ব্যাপার, তবে ব্যক্তিগতভাবে তার কথা হল-সে পিটার্সবুর্গ ছাড়বে একেবারে সকলের শেষে।
২৬শে আগস্ট, ঠিক বরদিনো যুদ্ধের দিনে, আন্না পাভলভনার বাড়িতে একটা সান্ধ্যসম্মিলনীর আয়োজন করা হয়েছে। মহাত্মা সের্গেইয়ের একটি দেবমূর্তি সম্রাটকে পাঠাবার সঙ্গে সঙ্গে মহামান্য বিশপ তাকে যে চিঠিখানি লিখেছে সেটা পাঠ করাই ঐ সম্মিলনীর প্রধান অনুষ্ঠান। বক্তা হিসেবে প্রিন্স ভাসিলির খ্যাতি আছে; চিঠিটা সেই পড়বে। আন্না পাভলভনার সান্ধ্য বৈঠকে এধরনের পাঠের একটা রাজনৈতিক তাৎপর্য সবসময়ই থাকে। সে আশা করছে সেদিন সন্ধ্যায় কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত থাকবে; ফরাসি থিয়েটার দেখার জন্য তাদের লজ্জায় ফেলে তাদের মনে দেশাত্মবোধকে জাগিয়ে তুলতে হবে। ইতিমধ্যেই অনেকে হাজির হয়েছে, কিন্তু যাদের উপস্থিতি সে আশা করছে তারা সকলে এসে না পৌঁছনোয় আন্না পাভলতনা পাঠ শুরু করতে না দিয়ে একটা সাধারণ আলোচনা শুরু করে দিয়েছে।
পিটার্সবুর্গে সেদিনকার বড় খবর কাউন্টেস বেজুখভার অসুখ। কয়েকদিন আগে সে অপ্রত্যাশিতভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে; সাধারণত যেসব বৈঠকের মধ্যমণি হয়ে সে বিরাজ করে সে রকমের বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে সে হাজির হতে পারেনি, কারো সঙ্গে নাকি দেখাও করছে না, এবং পিটার্সবুর্গের যে সব নামী ডাক্তাররা সাধারণত তার চিকিৎসা করে তাদের বদলে জনৈক ইতালিয় ডাক্তার একটা নতুন অসাধারণ পদ্ধতিতে তার চিকিৎসা করছে।
সকলে ভালো করেই জানে যে একই সঙ্গে দু স্বামীকে বিয়ে করার অসুবিধার ফলেই এই মনোহারিণী কাউন্টেসটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে, আর ইতালিয় ডাক্তারটির চিকিৎসাই হচ্ছে সেই অসুবিধা দূর করা; কিন্তু আন্না পাভলভনার সম্মুখে সেকথা বলার, এমন কি সেকথা জানার ভাব দেখাবার সাহসও কারো নেই।
সকলেই বলছে বেচারী কাউন্টেস খুব অসুস্থ। ডাক্তার বলছে তার এনজায়না পেক্টরিস হয়েছে।
এনজায়না? ও, সে যে ভয়ানক অসুখ!
সকলে বলছে, এনজায়নাকে ধন্যবাদ, দু-প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে এবার মিলন ঘটেছে…। মহাখুশির সঙ্গে সকলে এনজায়না কথাটা বারবার উচ্চারণ করতে লাগল।
সকলে বলছে, বুড়ো কাউন্টের অবস্থা শোচনীয়। ডাক্তার যখন বলল যে রোগীর অবস্থা বিপজ্জনক তখন সে শিশুর মতো কেঁদেছে।
