হে প্রভু, দয়া কর! ডিয়েকন বলল।
ওদিকে চলে যান, ওরা সেখানেই আছে। নিশ্চয় সে। সে তো অনবরত হা-হুঁতাশ করছে আর কাঁদছে। স্ত্রীলোকটি বলতে লাগল। নিশ্চয় সেই হবে। এই যে, এদিকে!
কিন্তু তার কথা পিয়েরের কানে গেল না। কয়েক পা দূরে যে কাণ্ডটা ঘটছে কয়েক সেকেন্ড ধরে সেটাই সে দেখছে। সেই আর্মেনীয় পরিবার ও দুটি ফরাসি সৈনিককেই সে দেখছে। সৈনিকদের একজন ছোটখাট, চটপটে, পরনের নীল কোটটা কোমরের কাছে দড়ি দিয়ে বাঁধা, মাথায় রাত-টুপি, খালি পা। অপর জনের চেহারাটাই বিশেষ করে পিয়েরের নজরে পড়েছে; লোকটি লম্বা, লিকলিকে, গোল কাঁধ, ভালো চুল, ধীর গতি, আর মুখে একটা বোকা-বোকা ভাব। পরনে মেয়েদের ঢিলে পশমি ঘাঘরা, নীল ট্রাউজার ও বড়, ছেঁড়া চটের বুট। খালি পা, ছোটখাট, নীলকোট পরা ফরাসিটি আর্মেনীয়দের কাছে গিয়ে কি যেন বলেই বুড়ো মানুষটির পা চেপে ধরল, আর সেও সঙ্গে সঙ্গে বুট জোড়া খুলতে শুরু করল। পশমি ঘাঘরাপরা অপর ফরাসিটি সুন্দরী আর্মেনীয় মেয়েটির সামনে দাঁড়িয়ে দু হাত পকেটে ঢুকিয়ে নীরব ও নিশ্চলভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ বাচ্চাকে সেই স্ত্রীলোকটির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে পিয়ের বলল, এই যে, মেয়েটিকে নাও? ওর বাপ মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিও! ক্রন্দনরতা মেয়েটিকে মাটিতে নামিয়ে রেখে পিয়ের আবার সেই ফরাসি সৈনিক ও আর্মেনীয় পরিবারের দিকে ফিরে তাকাল।
বুড়ো লোকটি ইতিমধ্যেই খালি পা হয়ে বসে আছে। ছোটখাট ফরাসিটি দ্বিতীয় বুটটা হাতিয়ে নিয়ে দুটো বুটে ঠোকাঠুকি করছে। বুড়ো লোকটি কান্না-ভাঙা গলায় কি যেন বলছে, কিন্তু পিয়ের একনজর সেদিকে তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল; তার সমস্ত মনোযোগ তখন পশমী ঘাঘরাপরা ফরাসিটির উপর নিবদ্ধ; সে তখন ঈষৎ দুলতে দুলতে যুবতীটির আরো কাছে এগিয়ে গেছে। পকেট থেকে হাত দুটি বের করে মেয়েটির গলা চেপে ধরেছে।
আর্মেনীয় সুন্দরীটি তখনো নিশ্চল হয়ে একই ভঙ্গিতে বসে আছে; চোখের দীর্ঘ পাতা দুটি নেমে এসেছে; যেন সৈনিকটি তাকে নিয়ে কি করছে তা সে দেখছেও না, বুঝছেও না।
পিয়ের তাদের কাছে ছুটে যেতেই পশমী ঘাঘরাপরা লম্বা লুঠেরাটা আর্মেনীয় যুবতীর গলার নেকলেস ধরে টান দিয়েছে, আর যুবতীটি গলাটা চেপে ধরে তারস্বরে চিৎকার করছে।
ঘাড় ধরে সৈনিকটিকে একপাশে ঠেলে দিয়ে পিয়ের কর্কশ গলায় বলে উঠল, মেয়েটিকে ছেড়ে দাও!
সৈনিকটি মাটিতে পড়েই উঠে দৌড়ে পালিয়ে গেল। কিন্তু তার বন্ধুটি বুটজোড়া ফেলে দিয়ে তলোয়ার বের করে রুদ্র মূর্তিতে পিয়েরের দিকে এগিয়ে গেল।
চিৎকার করে বলল, এদিকে তাকাও, একটিও বাজে কথা নয়!
পিয়ের তখন এত রেগে গেছে যে সে সবকিছু ভুলে গেল, তার শক্তি যেন দশগুণ বেড়ে গেল। খালি পা ফরাসিটির দিকে ধেয়ে গিয়ে সে তলোয়ার তুলবার আগেই একঘুষিতে তাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে ঘুষির পর ঘুষি চালাতে লাগল। ভিড়ের ভিতর থেকে তার সহর্ষ জয়ধ্বনি উঠল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে ফরাসি উহলানদের একটি অশ্বারোহী পাহারা-বাহিনী মোড় ঘুরে সেখানে এসে হাজির হল। উহলানরা জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে পিয়ের ও ফরাসি সৈনিকটিকে ঘিরে দাঁড়াল। তারপর কি হল কিছুই পিয়েরের মনে নেই। শুধু মনে আছে, সে যেন কাকে মারল, আর নিজেও তার হাতে মার খেল, এবং শেষপর্যন্ত তার হাত দুটি বেঁধে ফেলা হল, এবং একদঙ্গল ফরাসি সৈনিক তাকে ঘিরে ধরে তার শরীরটা খুঁজে খুঁজে দেখছে।
লেফটেন্যান্টের কাছে একখানা ছুরি আছে, সর্বপ্রথম এই কথাগুলিই পিয়ের বুঝতে পারল।
অ্যাঁ, একটা অস্ত্র? এই কথা বলে অফিসার খালি পা সৈনিকটির দিকে মুখ ফেরাল; তাকেও পিয়েরের সঙ্গেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঠিক আছে, তোমার যা বক্তব্য তা সামরিক আদালতেই বল। সে পিয়েরের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তুমি ফরাসি বলতে পার?
রক্তবর্ণ চোখ তুলে পিয়ের চারদিকে তাকাল, কোনো জবাব দিল না। তার মুখটা নিশ্চয় ভয়ংকর দেখাচ্ছে কারণ অফিসার ফিসফিস করে কিছু বলতেই আরো চারজন উহলান দল ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে পিয়েরের দু পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল।
পিয়েরের বেশ কিছুটা দূরে থেকে অফিসার আবার শুধাল, তুমি ফরাসি বলতে পার?…দোভাষীকে ডাক।
অসামরিক রুশ পোশাক পরা একটি ছোট-খাট মানুষ সেনাদলের ভিতর থেকে ঘোড়ায় চড়ে সামনে এগিয়ে এল। তার পোশাক ও কথা বলার ভঙ্গি দেখে পিয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাকে চিনতে পারল-লোকটি মস্কোর কোনো দোকানের ফরাসি দোকানদার।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পিয়েরকে লক্ষ্য করে দোভাষী বলল, একে তো দেখে সাধারণ লোক বলে মনে হচ্ছে না।
আরে, একে তো দেখতে অবিকল ঘর জ্বালানিয়া লোকেরই মতো। ওকে জিজ্ঞাসা কর ও কে।
বাজে রুশ ভাষায় লোকটি শুধাল, আপনি কে? বড় কর্তার প্রশ্নের জবাব দিন।
পিয়ের হঠাৎ ফরাসিতেই জবাব দিল, আমি কে তা আপনাকে বলব না। আমি আপনার বন্দি-নিয়ে চলুন।
অফিসার ভ্রুকুটি করে তো-তো করে বলল, ও, ও! বেশ, তাহলে অগ্রসর হও।
উহলানদের ঘিরে একটা ভিড় জমে উঠেছে। পিয়েরের একেবারে কাছে এসে দাঁড়িয়েছে একটি চাষী স্ত্রীলোক, সঙ্গে একটি ছোট মেয়ে। সৈন্যরা সদলে রওনা হলে সে সামনে এগিয়ে গেল।
বলল, ওরা আপনাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বাবা? কিন্তু এই ছোট মেয়েটা, এই ছোট মেয়েটা যদি তার না হয় তাহলে একে নিয়ে আমি কি করব?
