কোথায় সে? কোথায়? পিয়ের বলল।
বাড়ির পিছন দিককার বাগানটা দেখিয়ে ফরাসিটি জানালা থেকে চেঁচিয়ে বলল, ওখানে! ওখানে! একটু অপেক্ষা কর-আমি নেমে আসছি।
দু-এক মিনিট পরেই কালো চোখ ও গালে তিল একটি ফরাসি সত্যি সত্যি একতলার জানালা দিয়ে লাফিয়ে নেমে এল এবং পিয়েরের কাঁধটা চেপে ধরে বাগানের দিকে ছুটে গেল।
সহকর্মীদের ডেকে বলল, তোমরা সকলেই তাড়াতাড়ি নেমে এস। ক্রমেই গরম বাড়ছে।
বাড়ির পিছনে কাঁকর বিছানো পথে পৌঁছে ফরাসিটি পিয়েরের হাত ধরে টেনে দেখিয়ে দিল, কাকর বিছানো গোলাকার জায়গায় আসনের নিচে গোলাপি পোশাক পরা একটি তিন বছরের মেয়ে শুয়ে আছে।
ওই তোমার শিশু! আরে, এ যে একটা মেয়ে, তাহলে তো আরো ভালো! ফরাসিটি বলল। বিদায় হে। মোটা! আমাদেরও মানুষের মতোই ব্যবহার করতে হয়; কি জান, আমরা সকলেই তো মরণশীল। কথাগুলি বলে লোকটি তার সহকর্মীদের দিকে ছুটে গেল।
আনন্দে রুদ্ধশ্বাস পিয়ের ছুটে গিয়ে ছোট মেয়েটিকে কোলে তুলে নিতে গেল। কিন্তু একজন অপরিচিত মানুষকে দেখে রুগ্ন, গলা ফোলা মেয়েটি চিৎকার করে ছুটতে আরম্ভ করল। পিয়ের অবশ্য তাকে ধরে কোলে তুলে নিল। মেয়েটি বেপরোয়াভাবে চেঁচাতে চেঁচাতে পিয়েরের হাত থেকে ছাড়া পাবার জন্য তাকে আঁচড়াতে-কামড়াতে শুরু করে দিল। কোনো নোংরা জন্তুকে ছোঁবার মতোই পিয়েরের মনে আতঙ্ক ও বিরক্তি দেখা দিল। তবু মেয়েটিকে ছুঁড়ে ফেলে না দিয়ে তাকে নিয়ে বড় বাড়িটার দিকে ছুটে গেল। অবশ্য যেপথে সে এসেছিল এখন সেপথে ফিরে যাওয়া অসম্ভব; দাসী আনিস্কা সঙ্গে নেই; করুণা ও বিরক্তির মিশ্র অনুভূতিতে ক্রন্দনরত ভেজা মেয়েটিকে যথাসম্ভব আদরের সঙ্গে বুকে চেপে ধরে পিয়ের আর একটা পথের খোঁজে বাগানের ভিতর দিয়ে ছুটতে লাগল।
.
অধ্যায়-৩৪
নানা উঠোন ও গলি দিয়ে ছুটতে ছুটতে ছোট বোঝাটি নিয়ে পিয়ের পোভাস্কয়ের এক কোণে অবস্থিত গ্রুজিনস্কি বাগানে ফিরে এল। প্রথমে সে জায়গাটা চিনতেই পারেনি, কারণ বিভিন্ন বাড়ি থেকে টেনে বের করা মালপত্রে ও লোকজনের ভিড়ের জায়গাটা এখন ভিড়ে ভিড়াক্কার। মালপত্রসহ অনেক রুশ পরিবার ছাড়া বিচিত্র পোশাক পরা কিছু ফরাসি সৈন্যও সেখানে ভিড় করেছে। পিয়ের তাদের দিকে ফিরেও চাইল না। মেয়েটিকে মার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি অন্য কাউকে বাঁচাতে যাবার জন্য সেই সরকারি কর্মচারীর পরিবারটিকেই সে খুঁজতে লাগল। এখনো তার অনেক কিছু করার আছে, আর সেটা তাড়াতাড়িই করতে হবে। আগুনের তাপে ও ছুটে আসার জন্য তার মুখটা লাল হয়ে উঠেছে; এইমুহূর্তে তার মধ্যে যেন ফিরে এসেছে যৌবনের শক্তি, উদ্দীপনা ও সংকল্পের দৃঢ়তা। মেয়েটি এখন শান্ত হয়েছে; ছোট ছোট হাত দিয়ে পিয়েরের কোটটা চেপে ধরে একটা ছোট বন্য পশুর মতো চারদিকে তাকাচ্ছে। পিয়ের মাঝে মাঝে হেসে তার দিকে তাকাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, সেই ভয়ার্ত, রুগ্ন ছোেট মুখখানিতে সে যেন একটা সকরুণ নিষ্পাপ কিছু দেখতে পাচ্ছে।
সরকারি কর্মচারী অথবা তার স্ত্রীকে কোথাও খুঁজে পেল না। বড় বড় পা ফেলে ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে সে সকলেরই মুখটা ভালো করে দেখতে লাগল। আপনা থেকেই একটি জর্জীয় বা আর্মেনীয় পরিবারের দিকে তার নজর গেল। পরিবারে মোট তিনটি মানুষ; একটি অতীব সৌম্যদর্শন প্রাচ্য দেশীয় বৃদ্ধ; পরনে কাপড়ে-ঢাকা ভেড়ার চামড়ার নতুন কোট ও নতুন বুট; অনুরূপ চেহারার একটি বৃদ্ধা ও একটি যুবতী। যুবতীটির কালো বাঁকা ভুরু, লম্বা, সুন্দর, ভাবলেশহীন মুখে অসাধারণ উজ্জ্বলতা। পিয়েরের মনে হল সে যেন প্রাচ্য সৌন্দর্যের পরিপূর্ণতার প্রতিচ্ছবি। খোলা জায়গায় ইতস্তত ছড়ানো জিনিসপত্র ও লোকজনের মাঝখানে দামি সাটিনের জোব্বা ও উজ্জ্বল লিলাক রঙের শাল পরে সে বসে আছে; দেখে মনে হচ্ছে যেন একটি সুন্দর, সতেজ স্পষ্টতই বিদেশী গাছকে এনে বরফের বুকে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে। স্পষ্টতই নিজের রূপ সম্পর্কে সে সচেতন এবং সেজন্য ভীতও বটে। তার মুখটা পিয়েরের বড় ভালো লাগল, বেড়ার পাশ দিয়ে দ্রুত পায়ে যেতে যেতেও বারকয়েক সে তার দিকে ফিরে তাকাল। বেড়ার ধারে পৌঁছেও যাদের খুঁজছে তাদের না পেয়ে সে থেমে চারদিকে তাকাল।
মেয়েটি কোলে থাকায় সকলেরই দৃষ্টি পড়ছে তার উপর। একদল রুশ নরনারী তার চারদিকে ভিড় করে দাঁড়াল।
তারা শুধাল, আপনার কি কেউ হারিয়েছে? আপনি তো একজন ভদ্ৰশ্রেণীর লোক, তাই না? এটি কার মেয়ে?
জবাবে পিয়ের ব্যাপারটা খুলে বলে জানতে চাইল তারা কেউ সেই স্ত্রীলোকটিকে চেনে কি না।
একটি বুড়ো ডিয়েকন বলল, আরে, নিশ্চয় আনফেরভরা হবে। প্রভুর অনেক দয়া, প্রভুর অনেক দয়া!
একটি স্ত্রীলোক বলল, আনফেরভরা? না। তারা তো সকলেই চলে গেছে। এটি নিশ্চয় মারি নিকলায়েভনা অথবা আইভানভনাদের মেয়ে হবে!
একজন গৃহ-ভৃত্য বলল, উনি বলছেন একটি স্ত্রীলোক, কিন্তু মারি নিকলায়েভনা তো একটি মহিলা।
পিয়ের বলল, তোমরা তাকে চেন? শুটকো চেহারা, লম্বা দাঁত।
নিশ্চয় মারি নিকলায়েভনা! ওই নেকড়ের দল যখন ঝাঁপিয়ে পড়ল তখন তারা বাগানের ভিতরে চলে এসেছিল, ফরাসি সৈন্যদের দেখিয়ে স্ত্রীলোকটি বলল।
