পিয়েরকে দেখামাত্রই স্ত্রীলোকটি তার পায়ের উপর উপুড় হয়ে পড়ল।
ভালো মানুষরা, ভালো খৃস্টানরা, আমাকে বাঁচান, আমাকে সাহায্য করুন, প্রিয় বন্ধুরা…যে কেউ আমাদের সাহায্য করুন…চাপা কান্নার ফাঁকে ফাঁকে সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল। আমার মেয়ে…আমার মেয়ে! আমার ছোট যে পড়ে রইল। আগুনে পুড়ে গেল! উঃ! এইজন্যই কি তাকে মানুষ করলাম…উঃ!
নিচু গলায় স্বামী বলল, কেঁদ না মারি নিকলায়েভনা! নিশ্চয় দিদি তাকে নিয়ে গেছে, নইলে সে যাবে কোথায়?
হঠাৎ কান্না থামিয়ে স্ত্রীলোকটি সক্রোধে গর্জে উঠল, রাক্ষস! পাষণ্ড! তোমার তো হৃদয় বলে কিছু নেই, নিজের সন্তানের জন্যও কোনো মমতা নেই। অন্য পুরুষ হলে তাকে আগুনের ভিতর থেকে উদ্ধার করে আনত। কিন্তু এ তো রাক্ষস, মানুষ নয়, বাপও নয়! চাপা কান্নার ফাঁকে সে পিয়েরকে ডেকে বলল, আপনি তো স্যার একজন সম্মানিত লোক। আশেপাশে আগুন লাগল, আমার বাড়ির দিকে ধাওয়া করল, দাসী চেঁচিয়ে উঠল আগুন! আর আমরা জিনিসপত্র গুছাতে গেলাম। যে অবস্থায় ছিলাম সেইভাবেই বেরিয়ে এলাম…এই তো মাত্র সঙ্গে আনতে পেরেছি…দেবমূর্তি, আমার যৌতুকের বিছানা, আর সবই তো গেছে! বাচ্চাদের ধরে নিয়ে এলাম। কিন্তু কাতিকে আনতে পারলাম না! উঃ! হে প্রভু!… আবার সে ফোঁপাতে শুরু করল। আমার বাছা, আমার সোনা! পুড়ে গেল! পুড়ে গেল!
কিন্তু তাকে কোথায় ফেলে এসেছেন? পিয়ের শুধাল।
তার দৃপ্ত মুখ দেখে স্ত্রীলোকটির মনে হল, এ হয়তো তাকে সাহায্য করতে পারে।
পা ধরে চেঁচিয়ে বলল, ওঃ, প্রিয় মহাশয়! আমার রক্ষাকর্তা, আমার বুকটাকে শান্ত করুন!…আনিস্কা, এই মেয়েটা, যা না, ওকে পথটা দেখিয়ে দে! রেগে হাঁ করে দীর্ঘ দাঁতের পাটি বের করে সে চেঁচিয়ে দাসীটিকে বলল।
পিয়ের তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আমাকে রাস্তাটা দেখিয়ে দাও, দেখিয়ে দাও…আমি ঠিক করে দেব।
নোংরা দাসীটি ট্রাংক থেকে নেমে চুল ঠিক করে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে খালি পায়ে পথ দেখিয়ে চলল। পিয়েরের মনে হল, গভীর মূৰ্ছার পরে সে যেন আবার বেঁচে উঠেছে। মাথাটা খাড়া করল, জীবনের আলোয় দুচোখ জ্বলতে লাগল, দ্রুত পায়ে দাসীকে অনুসরণ করে পোয়তে পৌঁছে গেল। কালো ধোয়ার মেঘে সারাটা রাস্তা ঢেকে গেছে। সেই মেঘের ফাঁকে ফাঁকে আগুনের জিহ্বা উঁকি মারছে। অনেক লোক জড় হয়েছে অগ্নিকাণ্ডের সামনে। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে জনৈক ফরাসি জেনারেল চারপাশের লোকজনদের কি যেন বলছে। দাসীকে সঙ্গে নিয়ে পিয়ের জেনারেলের দিকে এগিয়ে গেল, কিন্তু ফরাসি সৈনিকরা তাকে বাধা দিল।
ওদিকে যেতে পারবেন না, একজন বলল।
মেয়েটি বলল, এদিকে আসুন খুড়ো। গলি ধরে নিকুলিন্সকে পাশ কাটিয়ে আমরা চলে যাব।
পিয়ের মুখ ঘুরিয়ে লাফিয়ে দাসীর সঙ্গে ছুটতে লাগল। মেয়েটি ছুটে রাস্তা পার হয়ে বাঁদিকে একটা গলিতে ঢুকল; তিনটে বাড়ি পেরিয়ে ডানদিকের একটা উঠোনে ঢুকল।
এই তো কাছেই, বলে মেয়েটি দৌড়ে উঠোন পার হয়ে কাঠের বেড়ার ফটকটা খুলে ফেলল। সেখানে দাঁড়িয়েই বাড়িটার ছোট কাঠের অংশটা আঙুল দিয়ে দেখাল; সেটা তখন দাউদাউ করে জ্বলছে। একটা দিক ভেঙে পড়েছে, অপর দিকটা জ্বলছে, জানালার ফাঁকে ও ছাদের ভিতর দিয়ে আগুনের শিখা বেরিয়ে আসছে।
বেড়ার ফটক দিয়ে ঢুকতে গিয়ে গরম বাতাস গায়ে লাগতে পিয়ের আপনা থেকেই থেমে গেল।
কোনটা? তোমাদের বাড়ি কোনটা? সে শুধাল।
একটি দিক দেখিয়ে মেয়েটি আর্তনাদ করে বলল, উঃ! ঐ তো, ঐ তো আমাদের বাসা। হায় সোনা, তুমি পুড়ে মরলে! কাতি, সোনা-মানিক আমার! উঃ!
পিয়ের সেদিকটায় ছুটে গেল, কিন্তু আগুনের হল্কার জন্য এগোতে পেরে ঘুরে বড় বাড়িটার সামনের দিকে চলে গেল। সে বাড়ির ছাদের নিচটা শুধু জ্বলছে আর একদল ফরাসি সেখানে ভিড় করেছে। লোকগুলি কি করছে সেটা প্রথমে পিয়ের বুঝতে পারেনি; কিন্তু যখন সে দেখল একজন ফরাসি তোতা তলোয়ার দিয়ে একটি চাষীকে আঘাত করছে আর তার কাছ থেকে একটা শেয়ালের লোমের কোট ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করছে, তখনই সে বুঝল যে সেখানে লুঠতরাজ চলছে; কিন্তু তা নিয়ে ভাববার মতো সময় তার নেই।
দেয়াল ও ছাদ ভেঙে পড়ার শব্দ, আগুনের শিখার হিস-হিস শব্দ, উত্তেজিত জনতার চেঁচামেচি ও আগুনের কুণ্ডলি–সবকিছু মিলিয়ে পিয়েরের মনে একটা উদ্দীপনার সৃষ্টি হল। বাসাটার অন্যদিকে ছুটে গিয়ে ভিতরে ঢুকবার মুখেই মাথার উপরে অনেকের চিৎকার শুনতে পেল, আর তখনই একটা ভারি জিনিস হুড়মুড় করে তার পাশেই এসে পড়ল।
পিয়ের মুখ তুলে দেখল, বড় বাড়িটার জানালায় কয়েকজন ফরাসি দাঁড়িয়ে আছে। তারাই ধাতুর জিনিসপত্র ভর্তি একটা দেরাজ এইমাত্র ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। নিচে দাঁড়ানো অপর কয়েকজন ফরাসি দেরাজটার দিকে এগিয়ে গেল।
পিয়েরকে দেখিয়ে তাদের একজন বলে উঠল, এই লোকটা কি চায়?
পিয়ের চিৎকার করে বলল, ওই বাড়িতে একটি শিশু আছে? তোমরা কি একটি শিশুকে দেখেছ?
কি বলছে লোকটা এগিয়ে চল! কয়েকজন বলল; পাছে পিয়ের দেরাজের কিছু প্লেট ও ব্রোঞ্জের জিনিস চেয়ে বসে এই ভয়ে একটি সৈনিক সদর্পে তার দিকে এগিয়ে এল।
উপর থেকে একজন ফরাসি চেঁচিয়ে বলল, একটি শিশু বাগানে কার যেন কান্না শুনেছি। এ লোকটি নিশ্চয় সেই বাচ্চাটাকেই খুঁজছে। যাই হোক না কেন, তোমাকে তো মানুষের মতো আচরণ করতে হবে…
