.
অধ্যায়-৩৩
৩ সেপ্টেম্বর অনেক দেরিতে পিয়েরের ঘুম ভাঙল। মাথাটা ধরে আছে, পোশাক না ছেড়েই যে বিছানায় শুয়েছিল সেটা বড়ই অস্বস্তিকর লাগছে, আগের দিন একটা লজ্জাজনক কাজ করার অস্পষ্ট চেতনা মনের মধ্যে বাসা বেঁধে আছে। সেই লজ্জাজনক কাজটা ক্যাপ্টেন রাম্বেলের সঙ্গে গতকালের আলোচনা।
ঘড়িতে এগারোটা বাজে, কিন্তু বাইরেটা বেশ অন্ধকার মনে হচ্ছে। পিয়ের উঠে চোখ মুছল; কুঁদোতো খোদাই-করা যে পিস্তলটা গেরাসিম লেখার টেবিলে রেখে গেছে সেটা চোখে পড়তেই পিয়েরের মনে পড়ে গেল সে কোথায় আছে, আর সেইদিনই তার ভাগ্যে কি আছে।
আমার কি অনেক দেরি হয়ে যায় নি? সে ভাবল। হয়তো সে দুপুরের আগে মস্কোতে ঢুকবে না।
ভবিষ্যতের চিন্তায় মাথা না ঘামিয়ে সে তাড়াতাড়ি কাজে লেগে গেল।
পোশাক ঠিক করে পিস্তলটা নিয়ে বেরিয়ে যাবে, এমন সময় এই প্রথম তার মনে হল যে এভাবে পিস্তলটা হাতে নিয়ে রাজপথ ধরে সে চলতে পারে না। এতবড় একটা পিস্তলকে কোটের নিচে লুকিয়ে রাখাও শক্ত। সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে এটাকে বেল্টের নিচে অথবা বগলের নিচে লুকিয়ে রেখেও চলা সম্ভব নয়। তাছাড়া এটা থেকে গুলি ছোঁড়া হয়ে গেছে, নতুন করে গুলি ভরার আর সময় হয়ে ওঠেনি। ঠিক আছে, ছুরিতেই কাজ চলবে, নিজের মনেই বলল, যদিও পরিকল্পনা করার সময় সে একাধিকবার স্থির করেছে যে ১৮০৯ সালে একটা ছুরি নিয়ে নেপোলিয়নকে হত্যা করার চেষ্টা করেই ছাত্রটি মস্তবড় ভুল করেছিল। তবু পিয়ের তাড়াতাড়িতে পিস্তলের সঙ্গে সবুজ খাপে ভরা একটা খাজ-কাটা ভোতা ছুরিও সঙ্গে নিল। পিস্তলের সঙ্গে ছুরিটাও সে কিনেছিল সুখারেভ বাজার থেকে। সেটাকে ওয়েস্টকোটের নিচে লুকিয়ে রাখল।
কোটের উপর একটা কটিবন্ধ বেঁধে টুপিটাকে কপালের উপর টেনে দিয়ে কোনোরকম শব্দ না করে ক্যাপ্টেনকে এড়িয়ে বারান্দাটা পার হয়ে পিয়ের রাস্তায় পা দিল।
আগের সন্ধ্যায় যে অগ্নিকাণ্ডকে সে উদাসীন চোখে তাকিয়ে দেখেছে আজ রাতে সেটা অনেক বড় হয়ে উঠেছে। মস্কোর বিভিন্ন স্থান আগুনে পুড়েছে। নদীর ওপারে ক্যারেজ রোর দালানগুলো, বাজার ও পোয়, মভা নদীর উপরকার বজরা আর দরগমিলভ সেতুর পার্শ্বস্থ কাঠের গোলা–সব জ্বলছে।
পিয়ের গলিপথ ধরে পোয় গেল, সেখান থেকে গেল আর্বাতে অবস্থিত সেন্ট নিকলাস গির্জায়; অনেক আগেই সে স্থির করেছে ওখানেই কাজটা সমাধা করা উচিত। অধিকাংশ বাড়িরই ফটকে তালা, খড়খড়ি তোলা। রাজপথ ও গলি জনশূন্য। মাঝে মাঝে কিছু রুশকে দেখতে পেল; তাদের মুখে উৎকণ্ঠা ও ভয়। কিছু ফরাসি সৈন্য রাস্তার মাঝখান দিয়ে এমনভাবে চলেছে যেন এটা শহর নয়, সেনা-শিবির। রুশ ও ফরাসি সকলেই পিয়েরকে দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছে। তার উচ্চতা ও মজবুত চেহারা ছাড়াও তার মুখে ও সারা দেহে এমন একটা বিচিত্র যন্ত্রণার ভাব ফুটে উঠেছে যে রুশরা তার দিকে তাকিয়ে ভাবছে সে কোন জাতের মানুষ। ফরাসিরা অবাক চোখে তাকে দেখছে কারণ অন্য রুশরা যেখানে ফরাসিদের দেখছে ভয় ও কৌতূহলের সঙ্গে, সেখানে পিয়ের তাদের একেবারেই আমল দিচ্ছে না। একটা বাড়ির ফটকে তিনজন ফরাসি রুশদের কি যেন বুঝিয়ে বলছে, কিন্তু তারা কিছুই বুঝতে পারছে না দেখে ফরাসিরা পিয়েরকে থামিয়ে জানতে চাইলে সে ফরাসি জানে কি না।
পিয়ের মাথা নেড়ে চলে গেল। চারদিকে যা কিছু ঘটছে তার দিকে না আছে তার কান, না আছে তার দৃষ্টি। নিজের সংকল্পকে মনের মধ্যে বয়ে নিয়ে সে সভয়ে দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে চলল। কিন্তু উদ্দেশ্য সাধন করা তার কপালে নেই। পথে আর কোনো বাধা না পেলেও তার অভিপ্রায় সফল করা যেত না, কারণ দরগমিলভ শহরতলি থেকে ক্রেমলিন যাবার পথে নেপোলিয়ন চার ঘণ্টারও বেশি সময় আগে আৰ্বাত পার হয়ে গেছে; এখন সে অত্যন্ত বিষণ্ণ মনে ক্রেমলিনের রাজকীয় পাঠকক্ষে বসে অগ্নিনির্বাপন ও লুঠতরাজ বন্ধ করা এবং অধিবাসীদের আশ্বস্ত করার ব্যাপারে অবিলম্বে যে সব ব্যবস্থা নেওয়া দরকার তসংক্রান্ত বিস্তারিত ও সঠিক হুকুম জারি করছে। কিন্তু পিয়ের এ সবকিছুই জানে না : নিজের আসন্ন কর্তব্যের মধ্যেই সে ডুবে আছে; তার একমাত্র দুশ্চিন্তা পাছে চরম মুহূর্তে দুর্বলতা এসে তাকে ঘিরে ধরে এবং তার আত্মমর্যাদা হারিয়ে যায়।
কোনো কিছু না শুনলে ও না দেখলেও সহজাত প্রবৃত্তিতেই সে পথ চিনে এগিয়ে চলল; পোভাস্কয়ের গলিপথে যেতে সে কোনোরকম ভুল করল না।
সেই রাস্তা ধরে যত এগোচ্ছে ততই ধোয়া ঘনতর হচ্ছে–আগুনের তাপ পর্যন্ত তার গায়ে লাগছে। মাঝে মাঝে বাড়ির ছাদ থেকে আগুনের লেলিহান জিহ্বা উঠতে দেখা যাচ্ছে। যদিও বুঝতে পারছে যে তার চারদিকে অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে, তবু সে যে অগ্নিকাণ্ডের দিকেই এগিয়ে চলেছে সেটা পিয়ের বুঝতে পারেনি। একদিকে পোভায় আর অন্যদিকে প্রিন্স গ্রুজিনস্কির বাড়ির বাগান সংলগ্ন একটা প্রশস্ত খোলা জায়গার ভিতরকার ফুটপাত ধরে যেতে যেতে হঠাৎ পিয়ের শুনতে পেল খুব কাছেই একটি স্ত্রীলোক অসহায়ভাবে কাঁদছে। স্বপ্নোত্থিতের মতো পিয়ের মাথাটা তুলল।
পথের পাশে ধুলো ঢাকা শুকনো ঘাসের উপর নানারকম গৃহস্থালির জিনিসপত্র স্তূপীকৃত হয়ে আছে : পালকের বিছানা, সামোভার, দেবমূর্তি, ট্রাংক, কত কি। ট্রাংকের পাশে একটি শুকনো চেহারার স্ত্রীলোক মাটিতে বসে আছে; স্ত্রীলোকটি বয়স্কা, উপরের পাটির দাঁতগুলো উঁচু, পড়নে কালো জোব্বা ও টুপি। কি যেন বলতে বলতে চাপা কান্নার আবেগে তার শরীরটা দুলছে। দশ ও বারো বছরের দুটি মেয়ে নোংরা খাটো ফ্রক ও জোব্বা পরে ভয়ার্ত, বিমূঢ় মুখে মার দিকে তাকিয়ে আছে। বছর সাতেকের হোট ছেলেটি অন্য কারও ওভারকোট ও বড় মাপের একটা টুপি পড়ে বুড়ি নার্সের কোলে চড়ে চিৎকার করছে। একটা নোংরা দাসী খালি পায়ে ট্রাংকের উপর বসে আছে। স্ত্রীলোকটির স্বামীর পরনে সহকারী কর্মচারীর পোশাক, বাঁকানো গোঁফ, মাথায় চৌকো টুপি; ভাবলেশহীন মুখে ট্রাংকগুলো সরিয়ে তার ভিতর থেকে পোশাকপত্র টেনে বার করছে।
