মানবিক ভালোবাসার ক্ষেত্রে ভালোবাসা থেকে ঘৃণায় যাওয়া যায়, কিন্তু ঐশ্বরিক ভালোবাসার পরিবর্তন নেই। না, মৃত্যু বা অন্য কিছুই তাকে ধ্বংস করতে পারে না। সেটাই তো আত্মার মূল ধর্ম। অথচ এ জীবনে কত মানুষকেই না ঘৃণা করেছি? আর যত ভালোবেসেছি ও ঘৃণা করেছি তাকে যত আর কাউকে নয়। সঙ্গে সঙ্গে নাতাশার ছবি স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল তার সামনে। নাতাশার অনুভূতি, তার যন্ত্রণা, তার লজ্জা, তার অনুতাপ সবই সে বুঝতে পারল। এই প্রথম সে বুঝতে পারল নাতাশাকে প্রত্যাখ্যান করার নিষ্ঠুরতা, তার সঙ্গে বিরোধের নিষ্ঠুরতা। যদি আর একটিবার তার সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হত! শুধু একবার, সেই দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে যদি বলতে পারতাম…
পিতি-পিতি-পিতি, তিতি, পিতি-পিতি-পিতি বুম! মাছিটা উড়ছে…আর সহসা তার মন চলে গেল আর এক জগতে-বাস্তব ও বিকারের এক জগতে যেখানে ঘটে চলেছে একটি বিশেষ ঘটনা। সেই জগতে একটা কিছু এখনো গড়ে উঠছে, ভেঙে পড়ছে না, একটা কিছু ক্রমেই বড় হচ্ছে, লাল বৃত্তসহ মোমবাতিটা এখনো জ্বলছে, দরজার কাছে সেই শার্টের মতো ফিনটা পড়ে আছে : কিন্তু এ সবকিছু ছাড়া আরো একটা কিছুর কাঁচ-কাঁচ শব্দ হল, একঝলক তাজা বাতাস ঘরে ঢুকল, আর দরজায় দেখা দিল আর একটি নতুন শাদা স্কিনস্ক। আর যে নাতাশার কথা সে এইমাত্র ভাবছিল তারই বিবর্ণ মুখ ও চকচকে চোখ বসানো এই নতুন ফিন-এর মূর্তিতে।
কল্পনা থেকে সেই মুখটাকে সরিয়ে দেবার চেষ্টায় প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, ওঃ, এই অবিরাম বিকার কী যন্ত্রণাদায়ক! কিন্তু সে মুখ বাস্তব রূপ নিয়ে থেকেই গেল, আরো কাছে এগিয়ে এল। সেই বিচিত্র মুখখানি তার একেবারে সামনে। নিজের বুদ্ধিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় প্রিন্স আন্দ্রু সব শক্তি একত্র করল, একটু সরে গেল, আর সহসা তার কানে কি যেন বেজে উঠল, চোখের উপর নেমে এল আবছায়া, জলে ডুবন্ত মানুষের মতো সে চেতনা হারাল। যখন সম্বিত ফিরে পেল তখন নাতাশা, সেই জীবন্ত নাতাশা যাকে সে সবার চাইতে ভালোবাসতে চেয়েছে তার নবলব্ধ পবিত্র ঐশ্বরিত ভালোবাসা দিয়ে, সেই নাতাশা তার সামনে নতজানু হয়ে আছে। সে বুঝল এ নাতাশা প্রকৃতই জীবন্ত; সে বিস্মিত হল না, বরং সুখী হল। নতজানু হয়ে নিশ্চলভাবে বসে ভয়ার্ত দুটি চোখ তার মুখের উপর রেখে নাতাশা কোনোক্রমে কান্না চেপে রেখেছে। তার মুখ বিবর্ণ, কঠিন। শুধু নিচের দিকটা কাঁপছে।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে প্রিন্স আন্দ্রু হাসল; হাতটা বাড়িয়ে দিল।
তুমি? সে বলল। কী ভাগ্য!
নতজানু অবস্থাতেই নাতাশা দ্রুত অথচ সাবধানে তার আরো কাছে এগিয়ে গেল, সযত্নে তার হাতটা টেনে নিল, ঝুঁকে পড়ে আলতো করে ঠোঁট দুটি ছুঁইয়ে হাতের উপর চুমো খেল।
মাথা তুলে তার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, আমাকে ক্ষমা কর! আমাকে ক্ষমা কর!
আমি তোমাকে ভালোবাসি, প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
ক্ষমা…!
কিসের ক্ষমা? প্রিন্স আন্দ্রু শুধাল।
আমি যা করেছি তার জন্য আমাকে ক্ষমা কর! প্রায় অশ্রুত ভাঙা-ভাঙা গলায় নাতাশা বলল; কোনোরকমে ঠোঁট ছুঁইয়ে তার হাতে চুমো খেতে লাগল।
নাতাশার মুখটা তুলে ধরে তার চোখে চোখ রেখে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, তোমাকে আমি আগের চাইতে আরো বেশি ভালোবাসি।
আনন্দের অশ্রুভরা দুটি চোখ তুলে ভীরু দৃষ্টিতে নাতাশা প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকাল। তার শীর্ণ বিবর্ণ মুখ, ফোলা ঠোঁট দুটি বড়ই সাধারণ-দেখলে ভয় করে। কিন্তু প্রিন্স আন্দ্রু তা দেখল না, সে দেখল তার সুন্দর দুটি চকচকে চোখ। পিছন থেকে অনেকের কণ্ঠস্বর দুজনই শুনতে পেল।
খানসামা পিতর জেগে উঠে ডাক্তারকে জাগিয়েছে। পায়ের ব্যথার জন্য তিমোখিন মোটেই ঘুমোয়নি; বেঞ্চির উপর গুটিশুটি মেরে শুয়ে একটা চাদর দিয়ে শরীরটাকে ঢেকে সে অনেকক্ষণ ধরেই সবকিছু দেখছিল।
বিছানা থেকে উঠে ডাক্তার বলল, এটা কি? দয়া করে চলে যান মাদাম।
সেইমুহূর্তে একটি দাসী এসে দরজায় টোকা দিল; মেয়েকে না দেখতে পেয়ে কাউন্টেস তাকে পাঠিয়েছে।
সদ্য ঘুম ভেঙে ওঠা স্বপ্নাচ্ছন্ন রোগীর মতো নাতাশা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল; ঘরে ফিরে নিজের বিছানায় উপুড় হয়ে কাঁদতে লাগল।
.
সেদিন থেকে রস্তভদের অবশিষ্ট ভ্রমণকালে প্রতিটি বিরামস্থলে এবং যেখানেই তারা রাত কাটিয়েছে, নাতাশা কখনো আহত বলকনস্কির কাছছাড়া হয়নি; আর ডাক্তারকেও স্বীকার করতে হয়েছে যে একটি তরুণীর কাছ থেকে এতটা মানসিক দৃঢ়তা অথবা একটি আহত মানুষকে সেবা করবার এতটা নিপুণতা সে আশা করেনি।
পথের মধ্যেই প্রিন্স আন্দ্রু যদি তার মেয়ের হাতের উপরেই মারা যায়–ডাক্তারের কথামতো তা তো সহজেই ঘটতে পারে-কাউন্টেসের কাছে সেটা যত ভয়াবহই মনে হোক না কেন, তবু সে নাতাশাকে বাধা দিতে পারল না। যদিও আহত মানুষটি ও নাতাশার মধ্যে এখন যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছে তাতে সকলেরই মনে হল যে প্রিন্স আন্দ্রু সেরে উঠলে তাদের বিয়ের প্রস্তাবটি নতুন করে তোলা হবে, তবু কেউই মুখে একথা বলল না-নাতাশা ও প্রিন্স আন্দ্রু তো নয়ই : জীবন-মৃত্যুর যে অমীমাংসিত প্রশ্নটি তখন শুধু বলকনস্কির মাথার উপরে নয়, সারা রাশিয়ার উপরেই ঝুলে আছে, সেটাই এখন অন্য সব বিচার-বিবেচনার পথকে রোধ করে দাঁড়িয়েছে।
