পিয়ের মনে মনে স্থির করল, তার অভিভাবিকার সব কথাই মেনে চলবে। তাই তার নির্দেশিত সোফাটার : দিকে এগিয়ে গের। আন্না মিখায়লভনা চলে যাবার পরমুহূর্তেই সে লক্ষ্য করল, ঘরের সবগুলো চোখ তাকেই দেখছে; সে সব চোখে ফুটে উঠেছে কৌতূহল ও সহানুভূতির চাইতেও কিছু বেশি। অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে সকলেই ফিসফিস করে কথা বলছে। সকলে তাকে এমন সম্মান দেখাচ্ছে যা সে এর আগে কখনো পায় নি। একটি বিচিত্র মহিলা আসন থেকে উঠে সেই আসনে তাকে বসতে বলল। পিয়েরের হাত থেকে একটা দস্তানা পড়ে যেতেই একজন এড-ডি-কং এসে সেটা কুড়িয়ে নিয়ে তার হাতে দিল। ডাক্তার নীরব শ্রদ্ধায় তাকে পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াল। পিয়েরও নিঃশব্দে এড-ডি-কংয়ের হাত থেকে দস্তানাটা নিল, এবং হাঁটুর উপর হাত দুটো রেখে মিশরীয় মূর্তির মতো মহিলার দেওয়া আসনেই বসল। মনে মনে স্থির করল, এ সবই ভবিতব্য, যা হবার তাই হচ্ছে; আর যাতে মাথাটা ঘুরে না যায় এবং বোকার মতো কাজ করে না বসে সেই জন্য আজ রাতে সে নিজের ধারণামতো কাজ করবে না, যারা তাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের ইচ্ছার উপরেই নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেবে।
তারপর দুমিনিটও যায় নি এমন সময় প্রিন্স ভাসিলি রাজকীয় ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে ঘরে ঢুকল। বুকে তিনটে তারকা লাগানো লং-কোট পরনে। সকালের তুলনায় অনেকটা শুকনো দেখাচ্ছে; চারদিকে তাকিয়ে সে যখন পিয়েরকে দেখতে পেল, তখন তার চোখ দুটো স্বাভাবিকের চাইতে বড় দেখাল। সে পিয়েরের কাছে এগিয়ে গিয়ে তার হাতটা ধরল (এ কাজ সে কখনো করে না), এবং হাতটা শক্ত কি না বুঝবার জন্য হাতটাকে নিচের দিকে টেনে নিল।
সাহস, সাহস চাই বন্ধু! তিনি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন। খুব ভালো কথা! সে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হল।
কিন্তু পিয়েরের মনে হল জিজ্ঞাসা করে :…কেমন আছেন, কিন্তু ইতস্তত করল; মুমূর্ষ লোকটিকে কাউন্ট বলা উচিত হবে কি না বুঝতে পারল না, আবার বাবা বলতেও লজ্জা করল।
আধ ঘন্টা আগে তাঁর আর একটা আক্রমণ হয়েছে। সাহস বন্ধু, সাহস,…
পিয়েরের মনটা এতই বিচলিত ছিল যে আক্রমণ কথাটা শুনে কিছুর আঘাতের কথাই তার মনে হল। বিব্রতভাবে সে প্রিন্স ভাসিলির দিকে তাকাল; তবে একটু পরেই সে বুঝতে পারল যে আক্রমণ মানে রোগের আক্রমণ। ভাসিলি যেতে যেতে লোরেনকে কি যেন বলে আঙুলে ভর দিয়ে পা টিপে টিপে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। পা টিপে সে ভালো হাঁটতে পারে না, তাই প্রতিটি পদক্ষেপেই তার গোটা শরীরটা কাঁপতে লাগল। বড় প্রিন্সেস তাকে অনুসরণ করল; পুরোহিতরা, ডিয়েকনরা ও কিছু চাকরও দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা দিয়ে ভিতরে কোনো কিছু সরাবার একটা শব্দ শোনা গেল। তার শেষপর্যন্ত আন্না মিখায়লভনা মুখে কর্তব্য-পালনের সেই একই দৃঢ় ভঙ্গি নিয়ে ছুটে বেরিয়ে এল এবং পিয়েরের কাঁধে আস্তে হাত রেখে বলল :
ঈশ্বরের করুণা অপরিসীম। তৈললেপন অনুষ্ঠান শুরু হতে চলেছে। চল।
নরম কার্পেটের উপর পা ফেলে পিয়ের দরজার কাছে গেল। সেই বিচিত্র মহিলা, এড-কি-কং ও কয়েকটি চাকরও তার পিছন পিছন এল। পিয়েরের মনে হল, সে ঘরে ঢুকতে এখন যেন আর অনুমতির কোনো দরকারই নেই।
*
অধ্যায়-২৩
অনেকগুলি স্তম্ভ ও খিলানে বিভক্ত এবং দেয়ালে-দেয়ালে পারসিক কার্পেট ঝোলানো এই বড় ঘরটি পিয়েরের খুবই পরিচিত। স্তম্ভগুলির পিছনে ঘরের একটি অংশের একপাশে আছে সিল্কের মশারি-ঢাকা একখানি উঁচু মেহগনি খাট; অপর দিকে মস্ত বড় আলমারির উপর দেবমূর্তিগুলোর সামনে উজ্জ্বল মিখায় লাল আলো জ্বলছে, রুশ গির্জায় সান্ধ্য উপাসনার সময় যেমনটি জ্বলে। আলোকোজ্জ্বল দেবমূর্তিগুলোর নিচে একটা লম্বা ইনভ্যালিড-চেয়ার পাতা রয়েছে, তাতে সদ্য বদলানো কয়েকটি বরফ-সাদা বালিশ। পিয়ের দেখল, ঝকঝকে সবুজ লেপে কোমর পর্যন্ত ঢেকে সেই চেয়ারে বসে আছে তার বাবা কাউন্ট বেজুখভের পরিচিত সমুন্নত দেহ প্রশস্ত কপালের উপর পাকা চুলের রশি সিংহের কেশরের কথা মনে করিয়ে দেয়; সুদর্শন রক্তাভ মুখে অনেক বলীরেখার আল্পনা। মোটা হাত দুখানি লেপের বাইরে রেখে দেবমূর্তিগুলির ঠিক নিচে সে হেলান দিয়ে রয়েছে। তার ডান হাতের পাতায় তর্জনী ও বৃদ্ধার মাঝখানে একটি জ্বলন্ত মোমবাতি রেখে একটি চাকর চেয়ারের পিছন থেকে ঝুঁকে মোমবাতিটিকে ঠিকমতোভাবে ধরে আছে। পুরোহিতরা চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে নিয়ে ধীর গম্ভীরভাবে অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে। ছোট প্রিন্সেস দুটি পিছনে দাঁড়িয়ে, রুমালে চোখ মুছছে, আর তাদের বড় বোন কাতিচে কুটিল, স্থির দৃষ্টিতে দেবমূর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে একটি ভীরু, বিষণ্ণ, ক্ষমাসুন্দর ভাব ফুটিয়ে আন্না মিখায়লভনা দরজাটার কাছে সেই বিচিত্র মহিলার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। প্রিন্স ভাসিলি বাঁ হাতে একটা জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে দরজার সামনে ইনভ্যালিড-চেয়ারটার কাছে একটা ভেলভেট-মোড়া চেয়ারে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর ডান হাতে যতবার কুশ-চিহ্ন আঁকছে ততবারই উপরের দিকে চোখ তুলে কপালটা স্পর্শ করছে। সারা মুখে ফুটে উঠেছে ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণের একটা বিনীত ভাব। যেন সে বলতে চাইছে, এ সব মনোভাব যদি তুমি বুঝতে পার তো তোমারই কপাল মন্দ!
